ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ খেলা ]

বসন্তের হাফ সেঞ্চুরি হাঁকালেন নিয়তির নির্ধারিত কিংবদন্তি 

রিয়াজুল ইসলাম শুভ
প্রকাশিত: ১৭:১৮, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪
বসন্তের হাফ সেঞ্চুরি হাঁকালেন নিয়তির নির্ধারিত কিংবদন্তি 
ফটো- ডেইলি বাংলাদেশ

ক্লাব ক্রিকেটে ভালো মানের একজন ক্রিকেটার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন গ্রেইম পন্টিং। অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবলেও খেলেছেন। তার স্ত্রী লোরাইন পন্টিং ছিলেন ভিগোরো নামের একটি দলীয় খেলায় রাজ্য দলের শিরোপাজয়ী খেলোয়াড়। ভিরোগো অস্ট্রেলিয়ার নারীরা খেলে থাকেন, যা মূলত ক্রিকেট এবং টেনিসের সমন্বিত এক রকমের ইভেন্ট। তাদের ঘর আলো করে পৃথিবীতে এসেছিলেন এক কিংবদন্তি। কিশোর বয়সে তার প্রতিভার বিচ্ছুরণে বোঝা গিয়েছিল, ব্যাট হাতে সর্বকালের সেরাদের একজন হয়ে ছাড়বেন। তিনি আর কেউ নন রিকি থমাস পন্টিং। আজ এই ক্রিকেট কিংবদন্তির জন্মদিন। 

তাসমানিয়ার লন্সেসটোনে বড়দিনের মাত্র ছয় দিন আগে ১৯৭৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তিনি। গ্রেইম ও লরেইন পন্টিং দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে সকলের বড় এই কিংবদন্তি ক্রিকেটারের ডাক নাম পান্টার। বিশ্ব ক্রিকেটে সবচেয়ে নান্দনিক ও আবেদনময়ী ব্যাটারদের একজন হিসেবে তিনি ইতিহাসের পাতায় আগেই জায়গা করে নিয়েছেন। স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের পর তিনিই ক্যাঙ্গারুদের সেরা ব্যাটার হিসেবে বিবেচিত হন।

ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত পরিবারে যেহেতু জন্ম, পন্টিংয়ের সেই পথে হাঁটা মোটেও অস্বাভাবিক বিষয় ছিল না। তার মামা গ্রেগ ক্যাম্পবেল অজিদের হয়ে ৪টি টেস্ট ও ১২টি ওয়ানডে খেলেছেন। ১৯৯০ সালের এপ্রিলে এই ডানহাতি পেসার বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলেছিলেন শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

Advertisement

বাবা গ্রেইম ও মামা গ্রেগ ক্যাম্পবেলের উৎসাহে পন্টিংয়ের ক্রিকেটে হাতেখড়ি। ১১ বছর বয়সে ১৯৮৫-৮৬ মৌসুমে মোব্রে অনূর্ধ্ব-১২ দলের হয়ে খেলতে নামেন। ১৯৮৬ সালের জানুয়ারিতে পাঁচ দিনব্যাপী বার্ষিক নর্দান তাসমানিয়া জুনিয়র ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তাক লাগিয়ে দেন। তার প্রতিভা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বুঝতে বিন্দুমাত্র ভুল করেনি ব্যাট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কুকাবুরা। সেই আসরে চারটি সেঞ্চুরি করায় অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত কিশোর পন্টিংয়ের সঙ্গে কুকাবুরা প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি সেরে নেয়। 

ছবি: কৈশোরের ছেড়ে যৌবনে পা রাখা রিকি পন্টিং এ ঘটনার এক মাস পর অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে সপ্তাহব্যাপী প্রতিযোগিতায় তার ব্যাটে ছুটতে থাকে রানের ফোয়ারা। শেষ দিনে জোড়া সেঞ্চুরিতে নিজের অসামান্য দক্ষতা দেখিয়ে সকলের দৃষ্টি মনোযোগ আকর্ষণ করেন। নর্দার্ন তাসমানিয়ান স্কুলস ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রধান টেড রিচার্ডসন তার সাফল্য দেখে বলেই বসেছিলেন, রিকি নিশ্চিতভাবেই ডেভিড বুনের সমমানের খেলোয়াড়। 

ক্রিকেটার না হলে পন্টিং অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবলকেই বেছে নিতেন। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শীতকালে জুনিয়র ফুটবলে নর্থ লনসেস্টনের হয়ে খেলেছেন। কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৭ দলে হয়ে খেলার সময় ডানহাতের বাহু ভেঙে যাওয়ায় সেই স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটে। সেই ভাঙা বাহুতে রড লাগাতে হয়েছিল। যার ফলে তাকে ১৪ সপ্তাহ জন্য বিছানায় কাটাতে হয়। এরপর আর কখনো প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলতে নামেননি। ক্রিকেট হয়ে ওঠে তার ধ্যান-জ্ঞান।

তাসমানিয়ান শেফিল্ড শিল্ড প্রতিযোগিতার খেলাগুলোতে পন্টিং বেশ ভালো পারফর্ম করেন। এ সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারসুলভ মানসিকতা তার মাঝে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। স্কচ ওকবার্ন কলেজে ১৯৯০ সালে গ্রাউন্ডসম্যান হিসেবে কাজ করেছিলেন। 

পরের বছর নর্দান তাসমানিয়ান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন তাকে অ্যাডিলেডের অস্ট্রেলিয়ান ইন্সটিটিউট অব স্পোর্টস ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে পক্ষকালব্যাপী প্রশিক্ষণের জন্য পাঠায়। দুই সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণটির মেয়াদ পড়ে দুই বছর পর্যন্ত চলে। অ্যাকাডেমির তৎকালীন কোচ ও সাবেক অজি ক্রিকেটার রডলি মার্শের চোখে পড়ে যান পন্টিং। তার ভাষ্য ছিল, ১৭ বছর বয়সী রিকি পন্টিংয়ের মতো সেরা ব্যাটসম্যান তিনি আর দেখেননি।

ছবি: ব্যাটিংয়ে দক্ষতা দেখিয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন রিকি পন্টিং ১৯৯২ সালের নভেম্বরে ১৭ বছর ৩৩৭ দিন বয়সে তাসমানিয়ার হয়ে তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল। পন্টিং শেফিল্ড শিল্ডে খেলা সর্বকনিষ্ঠ তাসমানিয়ান ক্রিকেটারের মর্যাদা পান। ব্যাট হাতে সেবারের আসরে মোট ৩৫০ রান সংগ্রহ করেন। এমন দারুণ পারফরম্যান্সে তিনি অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ দলে জায়গা পান। 

জাতীয় দলের দরজা খুলতে অবশ্য আরো সময় লেগেছিল। নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত চার জাতি টুর্নামেন্টে তিনি অস্ট্রেলিয়ার স্কোয়াডে ছিলেন। ১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনি পদার্পণ করেন। একই বছর ডিসেম্বরে শ্রীলংকার সঙ্গে টেস্ট অভিষিক্ত হন। 

পন্টিং ক্যারিয়ারের শুরুর সময়ে শৃঙ্খলাজনিত বিষয়টিকে মোটেও গুরুত্ব দিতেন না। জনসমক্ষে মদ্যপানের দায় স্বীকারও করেছিলেন। নিয়মানুবর্তীতার অভাব ও মাঠের বাইরে ব্যক্তিগত সমস্যায় জড়িয়ে ধারাবাহিক দক্ষতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হন। ১৯৯৯ সালের শুরুর সময়ের পূর্ব পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি চলতে থাকে। 

তবে সময় যতো গড়িয়েছে, ততো বেশি পরিপক্ক হয়ে ওঠেন। ব্যাট হাতে ধারাবাহিক রান তোলার পথে চলতে থাকেন। বাইশ গজে তার ব্যাটিংয়ের ধরণ মুগ্ধতা ছড়াতো। কভার ড্রাইভ এবং পুল শটগুলো ছিল দৃষ্টিনন্দন ও ফলদায়ক। আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও ছিলেন অনবদ্য। তৎকালীন সময়ে জন্টি রোডসের পর তাকেই বিশ্বের সেরা ফিল্ডারের তকমাটা দেওয়া হতো। কিংবদন্তি লেগস্পিনার শেন ওয়ার্নের পাওয়া উইকেটের সিংহভাগেই রয়েছে পন্টিংয়ের অবদান। সাধারণত প্রথম স্লিপে তার হাত জোড়া ছিল বিশ্বস্ত।

ছবি: স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের পর তিনিই ক্যাঙ্গারুদের সেরা ব্যাটসম্যানশচীন টেন্ডুলকার ও বিরাট কোহলির পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৫০ বছর পূর্ণ করা পন্টিং তৃতীয় সর্বোচ্চ ৭১ সেঞ্চুরির মালিক। ১৯৯৯, ২০০৩ এবং ২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপজয়ী দলের অপরিহার্য সদস্য ছিলেন। শেষ দুবার নিজেই ছিলেন অধিনায়ক। ২০০৬ এবং ২০০৯ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিও ক্যাঙ্গারুরা তার নেতৃত্বেই জিতেছিল। অধিনায়ক হিসাবে সবচেয়ে বেশি আইসিসির বৈশ্বিক ইভেন্ট জয়ের রেকর্ড তার নামের পাশে রয়েছে। 

পরিসংখ্যান বলছে, তিনি ৭৭ টেস্টে ৪৮টি জয়সহ সর্বকালের সবচেয়ে সফল টেস্ট অধিনায়কদের একজন। খেলোয়াড় হিসেবে পন্টিং ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার যিনি ১০০টি টেস্ট জয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সবচেয়ে বেশি ২৬২টি ওয়ানডে জয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৬০টিরও বেশি টেস্ট এবং ৩৭০টি ওয়ানডে খেলেছেন এই কিংবদন্তি। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৩২৪ ম্যাচে ২২০টি জয়ের মুখ দেখেন, সাফল্য শতকরা ৬৭.৯১ শতাংশ। 

২০০২ সালে স্টিভ ওয়াহর পর অস্ট্রেলিয়ার ওয়ানডে দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন পন্টিং। পরের বছরই তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ক্রিকেট বিশ্বকাপে দলকে শিরোপা এনে দেন। ২০০৪ সালে স্টিভ ওয়াহ টেস্ট অধিনায়ক থেকে অবসর গ্রহণ করলে অবশ্যম্ভাবী হিসেবে তাকে দলের অধিনায়ক মনোনীত করা হয়। 

তিনি অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক হিসেবে রেকর্ড টানা ২৬টি ম্যাচ অপরাজিত ছিলেন। ২০১১ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে সেই জয়ধারার সমাপ্তি ঘটে। এরপর পন্টিং অধিনায়কত্ব থেকে সরে আসেন।

ছবি: অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি আইসিসির বৈশ্বিক ইভেন্ট জয়ের রেকর্ড পন্টিংয়ের পন্টিংয়ের নেতৃত্বে ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে অ্যাশেজ সিরিজ জয়লাভ করে। ২০০৫-০৬ মৌসুমেও তার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখেন। সাত সেঞ্চুরিসহ প্রায় ৭৮ রান গড়ে ১,৪৮৩ রান করেন। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে সিডনিতে নিজের শততম টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার দুই ইনিংসে যথাক্রমে ১২০ এবং অপরাজিত ১৪৩ রান করেন। 

খেলোয়াড় হিসেবে ইতিহাসের তৃতীয় সর্বাধিক ১৬৮ টেস্টে ৪১ সেঞ্চুরি ও ৬২ হাফসেঞ্চুরিসহ ৫১.৮৫ গড়ে পন্টিংয়ের সংগ্রহ ছিল ১৩,৩৭৮ রান। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি দ্বিতীয় সর্বাধিক। তার উপরে শুধুই শচীন টেন্ডুল্কার। অজিদের হয়ে টেস্টে পন্টিং একটানা ৭৩ ম্যাচে দলনেতা ছিলেন। 

ওয়ানডেতে ৩৭৫ ম্যাচে ৩০ সেঞ্চুরি ও ৮২ হাফ সেঞ্চুরিতে ৪২.০৩ গড়ে ১৩,৭০৪ রান করেছে। ১৭ টি-২০তে দুই হাফ সেঞ্চুরিতে ২৮.৬৪ গড়ে তার সংগ্রহ ৪০১ রান। ২০০৫ সালে ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক টি-২০ ম্যাচে তিনি অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক ছিলেন। 

টেস্ট এবং ওয়ানডে ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক পন্টিংকে ২০১৭ সালে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার জরিপে, ‘ক্রিকেটার অফ দ্য ডিকেড ২০০০’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে তিনি আইসিসি হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হন।

ছবি: অবসর নেয়ার পর পন্টিং কোচ এবং ধারাভাষ্যকার হিসেবে জীবন পার করছেন।অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে তাসমানিয়ান টাইগার্স, বিগ ব্যাশ লিগে হোবার্ট হারিকেন্স এবং ২০০৮ সালে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে কলকাতা নাইট রাইডার্স দলের হয়ে খেলেছেন। কাউন্টি ক্রিকেটের শেষ প্রথম শ্রেণির খেলায় সারে দলের হয়ে নটসের বিপক্ষে তিনি অপরাজিত ১৬৯ রান করেন। এটি ছিল কাউন্টিতে তার ৮২তম প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরি।

ভারতের বিপক্ষে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিসবেনে ভারতের বিপক্ষে খেলেন শেষ ওয়ানডে। একই বছর ২৯ নভেম্বর পন্টিং টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। পার্থে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টের আগের দিন তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন। 
 
অবসর নেয়ার পর  পন্টিং কোচ এবং ধারাভাষ্যকার হিসেবে জীবন পার করছেন। পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের সঙ্গে নিজের মনোভাব ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনায় মুখর হন।
   

ডেইলি-বাংলাদেশ/শুভ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!