হয়তো প্রশ্নটা নাক সিটকানোর মতোই। মনে হতেই পারে, পেলে-ম্যারাডোনার কারিকুরির কাছে কেউ পাত্তা পেয়েছে নাকি? সত্যিটা হচ্ছে শুধু পাত্তাই কেন, তাদের সব মুভমেন্টই ব্যর্থ করেছে এমন তারকাও ছিলেন। রক্ষণভাগের সেই অতন্দ্রপ্রহরীদের নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন।
চলুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক পেলে, ম্যারাডোনা কিংবা ক্রুইফদের মাঠের ফুটবলের বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের।
.png)
দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা ও লোথার ম্যাথাউজ
আর্জেন্টিনার সোনালি সময়ের অর্জন দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। পায়ের জাদুতে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম মহারথী বনে গেছেন। আস্থার জায়গা হয়েছেন বিশ্বব্যাপী কোটি ফুটবলপ্রেমীর।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার হাত ধরেই দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। এর পরের বিশ্বকাপেও দুর্দান্ত পারফর্ম করে আলবিসেলেস্তেদের শিরোপার মঞ্চে তোলেন তিনি। যদিও জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে পরাজয় বরণ করতে হয় ম্যারাডোনার দলকে। হয়তো সেই বিশ্বকাপটিও লাতিন আমেরিকাতেই যেত যদি না ম্যারাডোনাকে দমিয়ে রাখা হতো!
ফুটবলের মাঠে ম্যারাডোনাকে দমিয়ে রাখবে সাধ্য কার? সেই সাধ্য কারো নেই বলেই তো সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে ফাইনালের মঞ্চে নিয়েছেন ম্যারাডোনা। কিন্তু সেখানে যে তার জন্য আগে থেকেই অপেক্ষমাণ ছিলেন জার্মান কিংবদন্তি লোথার ম্যাথাউজ। যিনি ছিলেন ম্যারাডোনার ‘জম’।
ম্যারাডোনা-ম্যাথাউজের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোন পর্যায়ে ছিল সেটি কিবোর্ডের বোতাম চেপে বোঝানা যাবে না। কিন্তু এই সমবয়সী দুই কিংবদন্তি ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালকে এতটাই জমজমাট করে তুলেছিলেন যে, ম্যাচটিকে এখন বলা হয় ‘আল্টিমেট ডার্বি অফ ডেস্ট্রাকশন’।
পরপর দুই বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা-জার্মানির মুখোমুখি হওয়ার পেছনে ম্যারাডোনা ও ম্যাথাউজের অবদান কম ছিল না। কেন থাকবে না? দুজনেরই ছিল হার না মানা মনোভাব, দলের প্রয়োজনে সবকিছুই উজাড় করে দেওয়ার মতো দক্ষতা।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের কথাই ধরা যাক। প্রায় একক নৈপুণ্যে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন ম্যারাডোনা। আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার সেই ‘গোল অফ দ্য সেঞ্চুরি’ নিশ্চয়ই এখনো চোখে ভাসে।
অপরদিকে একইভাবে জার্মানির ফাইনালে ওঠার পিছনেও ছিল লোথার ম্যাথাউজের দুর্বার প্লেমেকিং অ্যাবিলিটি, সাথে নকআউট রাউন্ডে তার উইনিং গোল তো ইতিহাসের পাতায় লেখাই আছে।
প্লে-মেকার হিসেবে খেললেও ফাইনালে কোচ বেকেনবাওয়ার তাকে দায়িত্ব দিলেন ম্যারাডোনাকে ‘মার্ক’ করার। আর সেই দায়িত্ব তিনি এতটাই সূক্ষ্মভাবে পালন করেছিলেন যে ম্যারাডোনা বলেই ফেলেছিলেন, ‘সে মনে হয় আমার সব মুভই জানতো।’
কিন্তু তাতে কি, ম্যারাডোনাকে গোল করতে না দিলেও তার দেওয়া অসাধারণ পাস থেকেই বুরুশাগার গোলে ৩-২ গোলে জয় পায় আলবিসেলেস্তারা।
এর ঠিক চার বছর পর ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে আবারো পরস্পরের মুখোমুখি ম্যারাডোনা। গতবারের ভুলগুলো শুধরে এবার প্রতিশোধ নেয়ার পালা ইউরোপ জায়ান্টদের। লোথার ম্যাথাউজের জার্মানি ছিল দুর্দান্ত ফর্মে। ম্যাথাউজের জয়ের আকাঙ্ক্ষা, আগ্রাসী মনোভাব আর সেই উক্তি- ‘দরকার হলে ডিফেন্স করেই বিশ্বকাপ জিতবো।’ এগুলোই ছিল জার্মানির জন্য আলাদা প্রেরণা।
১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালে শুধুমাত্র ম্যারাডোনার জন্য সুইপার হিসেবে খেলেন ম্যারাডোনা। অসাধারণ পারফরম্যান্সে পুরো ম্যাচ রাখলেন গোলশূন্য অবস্থায়। নিজের অসাধারণ পেনাল্টি নেয়ার ক্ষমতা থাকলেও ম্যাচের শেষ মুহূর্তে বলটা তুলে দিলেন ব্রেহমের হাতে। সেই পেনাল্টিকেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়। এবার ১-০ ব্যবধানে শিরোপা হাতছাড়া হয় আলবিসেলেস্তেদের।
পেলে ও ইউসেবিও
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে পেলে নামটিই যথেষ্ট। তাকে আলাদাভাবে পরিচয় করানোর কিছুই নেই। ব্রাজিলের ব্ল্যাক ডায়মন্ড যে পঞ্চাশ দশকের শেষ থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত রীতিমতো রাজত্ব চালিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে জাতীয় দলকে বসিয়েছেন বিশ্বসেরাদের মসনদে। ঠিক একই সময়ে পেলেকে টেক্কা দিয়েছেন ‘দ্য ব্ল্যাক প্যান্থার’ খ্যাত ফুটবলার ইউসেবিও।

দুই মহাদেশের ফুটবলকে আগেই নিজেদের পায়ের নিচে রাখলেও নিজেদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা শুরুটা হয়েছিল ১৯৬২ ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে। সাম্বা নাচের প্রতিটি পদক্ষেপ নতুনভাবে চেনানো পেলের সান্তোসের মুখোমুখি হয়েছিল গতির অধীশ্বর ইউসেবিওর বেনফিকা। দুজনই ফাইনালে জোড়া গোল করে নিজ ক্লাবকে মহাদেশের সেরা ক্লাবের মুকুট পরিয়েছিলেন।
ঘরের মাঠে হওয়া প্রথম লেগে পেলের জোড়া গোল সান্তোসকে ৩-২ গোলে এগিয়ে রেখেছিলো। ইউরোপের মাটিতে ইউসেবিওর ঝলক দেখার অপেক্ষায় ছিল পুরো বিশ্ব। কিন্তু তাতে কি, ইউসেবিওর দুর্দান্ত গোল ঢাকা পড়ে যায় পেলের হ্যাটট্রিকে। বেনফিকাকে দুই লেগ মিলিয়ে ৮-৪ গোলে হারিয়ে বিজয়ীর বেশেই দেশে ফেরেন পেলে।
১৯৬৬ সালে আবারো মুখোমুখি হন দুই কিংবদন্তি, এবারের ব্যস্ততা জাতীয় দলের রঙিন জার্সিতে। গ্রুপপর্বেই পর্তুগালের মুখোমুখি সেলেসেওরা। তবে এবার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়, গত দুবারের বিশ্বকাপজয়ী সেলেসাওরা ইউসেবিওর পর্তুগালের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে বসে।
ইনজুরিতে ছিটকে গিয়েছিলেন পেলে। সেই সুযোগ বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে পর্তুগাল। ম্যাচটিতে জোড়া গোল করে ব্রাজিলকে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় করে দেন পর্তুগিজদের ‘দ্য কিং’। পেলের বিদায় হলেও ইউসেবিও থেমে থাকেননি, কোয়ার্টার ফাইনালে কোরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৪ গোল করে নিজের স্বরূপ দেখান তিনি। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিতর্কিত ম্যাচে হেরে গেলেও সেই আসরে ৯ গোল করে গোল্ডেন বুট নিজের করে নেন ‘দ্য ব্ল্যাক প্যান্থার’।
ইয়োহান ক্রুইফ ও ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার
গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপিয়ান ফুটবলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছেন ডাচ ‘টোটাল ফুটবল’-এর সবচেয়ে প্রতিভাধর খেলোয়াড় ইয়োহান ক্রুইফ আর জার্মান ‘পাওয়ার ফুটবল’-এর নেতা ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু নেদারল্যান্ডস আর জার্মানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুই দেশে জন্ম নেয়া দুই সেরা ফুটবলারেরও বটে। একজনের রয়েছে ‘ক্রুইফ টার্ন’-এর মতো স্পেশাল স্কিল আবিষ্কার করার ক্ষমতা, আর আরেকজন তো ‘সুইপার পজিশন’কে বিশ্বের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন।
১৯৭৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর শ্রেষ্ঠ লড়াই, যদিও শেষপর্যন্ত বিজয়ের হাসিটা হেসেছিলেন ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারই। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু তাদের খেলোয়াড় ক্যারিয়ারে আটকে ছিল না, রয়েছে ম্যানেজার হিসেবেও অসাধারণ কিছু মুহূর্ত।
একজনের রয়েছে বিশ্বকাপ জেতার গৌরব, অন্যজনের রয়েছে দল নিয়ে টানা ৪বার লিগ শিরোপা জেতার রেকর্ড। একজন তো মাত্র ২ মাসেই উয়েফা কাপ জেতার রেকর্ড গড়েছেন, অপরজনের ঝুলিতে রয়েছে ইউরোপিয়ান কাপ অর্জনের সাফল্য।
বিশ্ব ফুটবল গত শতাব্দীতে এই তিন জুটি মাঠের লড়াইকে ছাপিয়ে যেন হয়ে উঠেছিলেন একে অপরের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। তবে তাদের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্পর্কে কখনো চিড় ধরাতে পারেনি। ফুটবল পায়ে জাদু প্রদর্শনী দেখিয়ে কুড়িয়েছেন সুনাম, বয়ে এনেছেন সম্মান। সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন সুন্দর ফুটবলের বার্তা।