ঢাকা,  সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩

[ খেলা ]

একমাত্র ক্রিকেটার যিনি নোবেল জিতেছেন

আসাদুজ্জামান লিটন
প্রকাশিত: ১৬:৫২, ১৬ আগস্ট ২০২০
একমাত্র ক্রিকেটার যিনি নোবেল জিতেছেন
স্যামুয়েল বেকেট

ক্রিকেটের সঙ্গে সাহিত্যের যোগসূত্র অনেক আগে থেকেই। ১৭০৬ সালে কেমব্রিজে একটি ল্যাটিন কবিতায় প্রথমবারের মতো ক্রিকেট ম্যাচের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্রিকেটারই খ্যাতিমান সাহিত্যিকে পরিণত হয়েছেন যাদের মধ্যে এ এ মিলনে, জে এম ব্যারি, জেফ্রি আর্চার, স্যার আর্থার কোনান ডোয়েল উল্লেখযোগ্য।

গোয়েন্দাভিত্তিক বিখ্যাত উপন্যাস শার্লক হোমসের লেখক হিসেবে স্যার এ কে ডোয়েলকে সকলেই চেনেন। ওপরে বর্ণিত কয়েকজনের মতো অনেক ক্রিকেটারই পরবর্তীতে সাহিত্যে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরেছেন। তবে একজন ক্রিকেটার রয়েছেন যিনি সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে ছাড়িয়ে গেছেন সবাইকে, জিতেছেন নোবেল পুরস্কারও। তার নাম স্যামুয়েল বেকেট।

আইরিশ বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার স্যামুয়েল বেকেট ১৯৬৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর মাধ্যমে ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে অনন্য এই গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। 

কালজয়ী এই সাহিত্যিক ১৯০৬ সালের ১৩ এপ্রিল আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্মগ্রহণ করেন। ক্রিকেটার হিসেবে তিনি ছিলেন বাঁহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ও বাঁহাতি মিডিয়াম ফাস্ট বোলার। 

দলের সঙ্গে বেকেটক্রিকেটার হিসেবে বেকেটের ক্যারিয়ার তেমন লম্বা হয়নি। ডাবলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে সর্বসাকুল্যে দুটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ম্যাচ খেলার সুযোগ পান তিনি। ১৮৯৫ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত দলটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলেছিল। এর মাঝে ১৯২৫-২৬ সালে মাত্র দু’বার ডাবলিনের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন বেকেট। 

ব্যাটসম্যান হিসেবে ২ ম্যাচের চার ইনিংসে ৮.৭৫ গড়ে মাত্র ৩৫ রান করেন বেকেট। তার সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি ছিল ১৮ রানের। অন্যদিকে সমান ম্যাচে ২৩ ওভার বল করলেও কোনো উইকেট পাননি তিনি, রান খরচ করেন ৬৪। ফিল্ডার হিসেবে দু’বার বল মুঠোবন্দি করেছিলেন এই অলরাউন্ডার।

আয়ারল্যান্ডের পোর্টোরা স্কুলে স্যামুয়েল বেকেট তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ক্রিকেটে সাফল্য না পেয়ে ২২ বছর বয়সে প্যারিসে পাড়ি জমান তিনি। এর আগে ডাবলিনের বিখ্যাত ট্রিনিটি কলেজে পড়াশোনা করেন বেকেট, যেখানে তিনি তার আজীবনের বন্ধু আইরিশ লেখক জেমস জয়েসের সঙ্গে পরিচিত হন। দুজনের ভেতর সবচেয়ে বড় মিল ছিল তারা উভয়েই নীরবতা পছন্দ করতেন ও কথা খুবই কম বলতেন। 

তরুণ অবস্থায় বেকেটদুজনই ভাগ্যের সন্ধানে একসঙ্গে প্যারিসে যান। সেখানে জয়েস অনেকটা বেকেটের ‘সারোগেট’ বাবা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জয়েসের মেয়ে লুসিয়ার সঙ্গেও বেকেটের বেশ ভালো বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। তবে একসময় তারা বুঝতে পারেন বিষয়টি দুই পরিবারে অশান্তির সৃষ্টি করবে। তাই বেকেট ঘন ঘন জয়েসের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করেন। 

১৯৩৭ সালে বেকেট তার জীবনসঙ্গিনী হিসেবে সুজান দেচেভাক্স-ডুমেনসিলের সাক্ষাৎ পান। ১৯৬১ সালে দুজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অবিচ্ছেদ্য ছিলেন। 

স্যামুয়েল বেকেট তার সকল সাহিত্যকর্ম ইংরেজি এবং ফরাসী ভাষায় রচনা করেছেন। অবশ্য ফরাসী সাহিত্যিক হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। তার সবচেয়ে বিখ্যাত লেখাগুলোর বেশিরভাগই ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে রচিত। উপন্যাস, ছোট গল্প, কবিতা, নাটক, চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্ট সবজায়গায় তিনি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। 

এই ক্রিকেটারের অধিকাংশ লেখাই ‘থিয়েটার অব দ্য অ্যাবসর্ড’ এর সঙ্গে সম্পর্কিত যেখানে জীবনের বিভিন্ন সময়ে মানুষের হাসি-কান্না, সুখ দুঃখ সব তুলে ধরা হয়েছে। বেকেটের সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি ‘ওয়েটিং ফর গডোট’। ১৯৫৩ সালে প্যারিসের একটি ছোট থিয়েটারে প্রদর্শিত হওয়ার পর এটা শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সেরা নাটক হিসেবে মর্যাদা পায়। 

ভাবুক বেশে স্যামুয়েল বেকেট১৯৬৯ সালে বেকেট যখন নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন তখন তিনি আকস্মিক কিছু সমস্যার সম্মুখীন হন। পরে পুরস্কারের সমুদয় অর্থ বেনামে দান করে দেন এই বিখ্যাত সাহিত্যিক। 

প্যারিসে ১৯৮৯ সালের ২২ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে মারা যান বেকেট। ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক ম্যাগাজিন উইজডেনে তার সম্মানে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফোতে তার নামে আলাদা প্রোফাইল রয়েছে। 

ইতিহাসে অনেক ক্রিকেটারই বড় বড় কীর্তি গড়েছেন। তবে বেকেটের মতো নোবেল জয়ের কীর্তি নেই আর কারোই। যতদিন পৃথিবী থাকবে, ততদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে সাবেক এই আইরিশ ক্রিকেটারকে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএল
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!