ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ স্পটলাইট ]

ডিজিটাল সড়কের কেন এই বেহাল দশা?

মো. সোহেল রানা মো. সোহেল রানা
প্রকাশিত: ১১:৪৫, ৪ অক্টোবর ২০২৬
ডিজিটাল সড়কের কেন এই বেহাল দশা?
সংগৃহীত

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মুখী বনানী–বিমানবন্দর সড়ককে একসময় দেশের প্রথম ডিজিটাল ও সবুজ সড়ক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়কজুড়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই, ডিজিটাল তথ্যবোর্ড, এলইডি স্ক্রিন, সিসিটিভি, আধুনিক যাত্রীছাউনি, সাইকেল লেন, হাঁটার পথ, বাগান ও নাগরিক সেবার নানা সুবিধার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বছর কয়েক পর সেই স্বপ্নের বাস্তব চিত্র নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। কোথায় গেল সেই ডিজিটাল সড়ক?

২০১৬ সালে শুরু হওয়া উদ্যোগটির লক্ষ্য ছিল বনানী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কটিকে আধুনিক, সবুজ ও প্রযুক্তি নির্ভর করে তোলা। তৎকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী সড়কের বিভিন্ন স্থানে ডিজিটাল যাত্রী ছাউনি, এলইডি মনিটর, ওয়াই-ফাই, সিসিটিভি, তথ্যকেন্দ্র এবং আধুনিক নাগরিক সেবার ব্যবস্থা করার কথা ছিল। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) জানিয়েছিল, বনানীর নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে এসব প্রযুক্তি পরিচালনা করা হবে এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে। 

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিমানবন্দর সড়কের সৌন্দর্য বর্ধন কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং বেশ কিছু স্থাপনার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়কের পাশে স্থাপন করা একটি বড় এলইডি টেলিভিশন চালু না হয়েই পড়ে ছিল। টেলিভিশন কেনা ও স্থাপনে প্রায় ৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। এর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্যও অর্থ ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। শুধু বড় স্ক্রিন নয়, ছয় কিলোমিটার সড়কে এলইডি বাতি স্থাপনেও প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি গাছ লাগানো, ফুটপাত, যাত্রীছাউনি, বাগান, বিভাজকসহ বিভিন্ন সৌন্দর্য বর্ধন কাজে আরও বিপুল অর্থ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। 

ডিজিটাল সড়কের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে আধুনিক যাত্রীছাউনি নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তৎকালীন পরিকল্পনায় যাত্রীছাউনিতে টয়লেট, নামাজের স্থান, ব্রেস্টফিডিং কর্নার, মোবাইল চার্জিং, তথ্যসেবা ও অন্যান্য সুবিধা রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নির্মিত কিছু যাত্রীছাউনি প্রত্যাশিতভাবে কাজে আসছে না। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব যাত্রীছাউনি ব্যবহার না হয়ে অন্যান্য কাজে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার কয়েকটি ছাউনির সামনে নিয়মিত বাস থামছে না। 

এখন প্রশ্ন উঠছে—যাত্রীর জন্য তৈরি অবকাঠামো যদি যাত্রীই ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে সেই প্রকল্পের উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হয়েছে?

সড়কের দুই পাশে সবুজায়ন ও সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনায় ছিল ফুলের বাগান, কৃত্রিম ঝরনা, লেক, হাঁটার পথ ও বিশ্রামের বেঞ্চ। তবে সিটি কর্পোরেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু এলাকায় বাগান ও সবুজায়নের স্থাপনা যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না। কোথাও কোথাও বাগান ঝোপঝাড়ে পরিণত হয়েছে এবং স্থাপন করা বেঞ্চও কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। সওজের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়মিত পরিচর্যার জন্য তাদের নিজস্ব লোকবল নেই; প্রয়োজন অনুযায়ী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় কিন্তু সেটা ফলপ্রসূ হচ্ছে না।

ডিজিটাল সড়কের পরিকল্পনায় পুরো সড়ককে সিসিটিভির আওতায় আনা এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে নজরদারির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সড়কের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ আছে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বনানী–এয়ারপোর্ট রুটের বিভিন্ন অংশে রাতে ছিনতাই ও অসামাজিক কার্যক্রমের অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে যে সড়ককে প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরাপদ সড়কের মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে নজরদারি ও আলোক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে সেটিকে সচল রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি এলইডি স্ক্রিন, সিসিটিভি, ওয়াই-ফাই ব্যবস্থা কিংবা ডিজিটাল তথ্যবোর্ড স্থাপন করলেই কোনো সড়ক দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল হয়ে যায় না। নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি—সবই প্রয়োজন। ২০১৬ সালে পরিকল্পনায় পাঁচ বছর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, সেই রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো কতটা কার্যকর ছিল এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এসব স্থাপনার দায়িত্ব কার?

একসময় যে সড়ককে বিদেশি অতিথিদের সামনে বাংলাদেশের আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরার কথা বলা হয়েছিল, কয়েক বছর পর সেই প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনা যদি অচল, অব্যবহৃত কিংবা অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের শিকার হয় তাহলে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

এ বিষয়ে ভিনাইল ওয়ার্ল্ড গ্রুপ এর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। আর ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে যোগাযোগ করলে কেউ কথা বলতে রাজি হননি। 

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, এটা একটা ভালো প্রোজেক্ট ছিল কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এর পরে এর উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। পাশাপাশি অনেক স্থাপনা নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। অনেক স্থাপনার মূল্যবান জিনিস চুরি হয়ে গেছে, এলইডি স্ক্রিনগুলো নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। বিশ্বরোডে তথ্য সংবলিত কিছু স্থাপনা ছিল, মাছের একুরিয়াম ছিল সবই এখন ধ্বংস। যাত্রী ছাউনিগুলো ব্যবহার অনুপযোগী, এগুলো পথশিশু আর নেশাগ্রস্ত লোকদের দখলে চলে যাওয়ার উল্টো সাধারন মানুষ আতংকে থাকে। তবে আসার আলো হচ্ছে এই প্রোজেক্টটি বর্তমান সরকার নতুন করে চালুর উদ্যোগ নিচ্ছেন।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ মহিবুল হক বলেন, একটা প্রোজেক্ট শুরু হলে সেটার পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ দরকার কিন্তু সেটা হয়নি। তাছাড়া উক্ত প্রোজেক্ট এর কিছু কাজ চলমান থাকা অবস্থায় দেশে একটা পরিবর্তন আসলো। এর পরেই আসলো আসল শঙ্কট, স্থাপনা গুলো ধ্বংস করা হল, গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো চুরি হয়ে গেলো। ঠিকাদার কোম্পানিও উধাও হয়ে গেলো।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআর/এসআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!