ঢাকা,  শুক্রবার   ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

[ স্পটলাইট ]

এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫:০৫, ৮ এপ্রিল ২০২৬
এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন?
ফাইল ছবি।

চলতি বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি দুর্বল, কারণ একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন এবং দেশের নিজস্ব পরিস্থিতি বলছে, দেশের প্রস্তুতি এখনও সম্পূর্ণভাবে শক্তিশালী নয়। একদিকে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, দারিদ্র্য হ্রাস ও মানব উন্নয়নের ধারাবাহিক উন্নতি দেশের অর্জনকে দৃঢ় করছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ উত্তরণ প্রক্রিয়াকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। 

সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ, ভূবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর (ইউএন-ওএইচআরএলএলএস) উচ্চ প্রতিনিধির কার্যালয়ের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রস্তুত করা ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ উত্তরণের সব শর্ত পূরণ করলেও ঝুঁকি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ নির্ধারিত তিনটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড— মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক— পূরণ করলেও সামগ্রিক প্রস্তুতি এখনও দুর্বল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাণিজ্য সুবিধা হারানো, রাজস্ব সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। 

বাণিজ্য ও রফতানি খাতের ঝুঁকি:
এলডিসি মর্যাদা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে কিছু বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা ও উন্নয়ন সহায়তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর ফলে রফতানি খাতের, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক সুবিধা কমে গেলে রফতানির ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উত্তরণকে শুধু মর্যাদার বিষয় হিসেবে না দেখে এটি দেশের অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণের একটি বড় মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত হিসেবে নেয়া উচিত। এই ধাপে কাঠামোগত সংস্কার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সমন্বয় অপরিহার্য। অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিল্প ও সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে সমন্বিত নীতিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন:
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার কথা উল্লেখ করে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নেয়ার আবেদন করে। সিডিপি এ আবেদন মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) ঘোষণা করেছে, ২৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। তবে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় সরকার তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। অর্থাৎ, ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণের সময়সীমা নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকারের পক্ষের চিঠিতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রফতানি খাতের চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে এখনই উত্তরণ দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। 

স্বাধীন মূল্যায়ন ও বহুপক্ষীয় পরামর্শ:
গত বছর ব্যবসায়ী মহল ও রফতানিকারকদের উদ্বেগের প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে একটি স্বাধীন মূল্যায়নের অনুরোধ করে। এ মূল্যায়নের অংশ হিসেবে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী এবং জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনটি এলডিসি-নির্দিষ্ট সহায়তা প্রত্যাহারের সম্ভাব্য প্রভাব, অর্থনৈতিক অর্জন ধরে রাখার কৌশল এবং উত্তরণ ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির বিষয়গুলো বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক বহুপক্ষীয় পরামর্শ সভায় প্রতিবেদনের মূল ফলাফল উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ ড. এম এ রাজ্জাক ও ড. ড্যানিয়েল গে। সভায় মন্ত্রী, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ এবং সরকারের নীতিনির্ধারকরা অংশ নেন। 

জাতিসংঘের সহযোগিতা:
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ সময়সীমা পেছানোর উদ্যোগ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছেন আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রাবাব ফাতিমা। পরিকল্পনা কমিশনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, উত্তরণ যেন টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, সে জন্য সংস্থা প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত। 

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশ পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে উত্তরণের মাধ্যমে এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। এতে দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পখাত হঠাৎ কোনো ঝুঁকির মুখে পড়বে না। তিনি আরো বলেন, উত্তরণ প্রক্রিয়া সফল করতে উন্নয়ন সহযোগীদের ধারাবাহিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

বড় চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা:
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য কেবল মর্যাদার বিষয় নয়, এটি নতুন বাস্তবতার সূচনা। বাণিজ্য সুবিধা হ্রাস, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকার সক্ষমতা— এসব নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। 

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এলডিসি উত্তরণের তিনটি সূচকে— মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক— উন্নতি করেছে। ২০১৮ ও ২০২১ সালের পর্যালোচনায় বাংলাদেশ এই তিনটি সূচকেই উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করেছে। ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের অনুমোদন দেয়। এরপর পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় শেষে ২০২৬ সালের নভেম্বরেই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার কথা। 

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে জমা দেওয়া ‘পারফরম্যান্স অব ইকোনমি অ্যান্ড প্রিপারেশনস ফর সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন ফ্রম এলডিসি স্ট্যাটাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনও এই তিনটি সূচকের মানদণ্ড পূরণ করছে এবং উত্তরণের পথেই রয়েছে। একইসঙ্গে এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস)’ বাস্তবায়নের অগ্রগতিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। তবে সেই অগ্রগতির মধ্যেও প্রস্তুতিতে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। 

কেন সময় বাড়ানোর আবেদন:

সরকারের যুক্তি, এলডিসি উত্তরণের জন্য প্রদত্ত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকট— যেমন কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি ও খাদ্য সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি— এই কারণে প্রস্তুতিমূলক সময়ের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও সংকট মোকাবিলায়। 

অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও কম নয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, বিনিয়োগের ধীরগতি এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ— এসব কারণে সরকারকে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে। ফলস্বরূপ কাঠামোগত সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার জন্য পর্যাপ্ত সময় কমে গেছে। 

বাণিজ্য সুবিধা হ্রাস ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা:

এলডিসি মর্যাদা হারালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ কিছু বিশেষ সুবিধা হারাবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত সুবিধা (জিএসপি), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশেষ ও পৃথক আচরণ সুবিধা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহায়তা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণে এসব সুবিধা হারালে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক নীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। 

সরকারের মতে, অতিরিক্ত তিন বছরের সময় পেলে সামষ্টিক অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল করা, কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নেয়া, রফতানি খাতের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাণিজ্য চুক্তি প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদুল হাসান খান বলেন, “এই সময়ের সুযোগ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি বড় সুফল বয়ে আনতে পারে।” 

অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, এলডিসি উত্তরণ একটি সূচকভিত্তিক প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। তাই সময় বাড়ানোর জন্য শক্তিশালী এবং বাস্তবসম্মত যুক্তি থাকা প্রয়োজন। 

সিদ্ধান্ত কী হতে পারে?

সব মিলিয়ে, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য কেবল মর্যাদার বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং নীতিনির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বর্তমান সময়ে সরকার যেমন বলছে— “এখনই ধনী দেশে ওঠার আগ্রহ নেই; প্রস্তুতি জোরদার করেই উত্তরণের পথ মসৃণ করা হবে।” 

বাংলাদেশের জন্য এই সময়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। একদিকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের গর্ব, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাণিজ্যিক ঝুঁকি— এই ভারসাম্য বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের আবেদন গৃহীত হবে কিনা, তা নির্ভর করছে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির মূল্যায়ন এবং পরবর্তী সময়ে সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের ওপর।

ডেইলি-বাংলাদেশ/SA
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!