ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ধর্ম ]

বিদায় হজের ভাষণ ও মর্মবাণী

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫৮, ২৭ জুন ২০২৩
বিদায় হজের ভাষণ ও মর্মবাণী
অলংকরণ: ডেইলি বাংলাদেশ

হজ মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। হজের প্রত্যেকটি বিধিবিধান ঐক্যের বার্তাই দিয়ে থাকে। রাসূল (সা.) জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল বিদায় হজ পালন করা। তা ছিল নবী করিম (সা.) এর জীবদ্দশায় মুসলমানদের সবচেয়ে বড় সমাবেশ। এর চেয়ে বড় কোনো আয়োজন ইতোপূর্বে হয়নি। প্রিয় নবী (সা.) ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে প্রিয় সহচরদের সামনে ভাষণ দিয়েছিলেন। যা বিদায় হজের ভাষণ হিসেবে খ্যাত। 

ভাষণে তিনি মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা করেন। তৎকালীন সময়ে নারীরা ছিল বঞ্চিত। নারী অধিকার নিয়েও তিনি আলোচনা করেন। ভাষণে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছিলো উম্মাহর ঐক্যের বিষয়টি। তিনি বলেছিলেন, ‘হে লোকসকল! জেনে রেখো, তোমাদের রব একজন এবং তোমাদের পিতাও একজন। জেনে রেখো, অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং আরবের ওপরও অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর ওপর সাদার এবং সাদার ওপর কালোরও কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি তাকওয়া। আমি কি তোমাদের নিকট পৌঁছিয়েছি? উপস্থিত সাহাবারা বলেন, হ্যাঁ, আল্লাহ রাসূল পৌঁছিয়েছেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নম্বর: ২৩৪৮৯)। 

হজের মাস, আরাফাতের দিন ও মক্কা এসবই পবিত্র। তিনি এগুলোর সঙ্গে মুসলমানের ইজ্জত-আব্রু ও ধন-সম্পদকে তুলনা দিয়ে সম্মান দিতে বলেছেন।  

Advertisement

ঐক্যবদ্ধ শক্তির সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার রহমত থাকে। বিচ্ছিন্নতা পতন ও বিপদ ডেকে আনে। মুসলিম উম্মাহ যতদিন এক ছিল, দুনিয়ার সব শক্তি তাদের সামনে মাথা নত করেছে। রোমান ও পারস্য জাতি ছিল তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু মুসলমানদের সামনে তারা দাঁড়াতে পারেনি। মুসলমানরা ছিল মজলুমের আশ্রয়। শান্তির দূত। শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাকারী। মানুষের জানমাল ও ইজ্জতের হেফাজতকারী। তারপর এলো, যখন মুসলিম উম্মাহ ভুলে বসলো নিজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হলো। ঐক্য ভেঙ্গে গেলো। আল্লাহর রহমত ওঠে যেতে লাগলো। দুনিয়ার অন্যান্য জাতি দ্বারা তারা নির্যাতন ভোগ করতে লাগলো। অথচ ঐক্যবদ্ধ থাকার যে উপকরণ ইসলামে রয়েছে, অন্যকোনো জাতির মাঝে তা নেই। মুসলমানের আল্লাহ এক। কিতাব এক। রাসূল, কিবলা এক। তারপরও তাদের মাঝে কেন এত অনৈক্য? কারণ হচ্ছে তারা ইসলামের কথা বললেও তা মানে না। এখনও যদি মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য ফিরে আসে তাহলে সেই সোনালি অতীত ফিরে আসবে। কিন্তু শয়তানের ফাঁদ থেকে তারা বের হয়ে আসতে পারছে না।

শয়তানের মিশন হচ্ছে, মানব জাতিকে বিভ্রান্ত করে আল্লাহ রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া। তাই সে কৌশলে কাজ করে আসছে। মানুষকে মূর্তিপূজা, শিরক, কুফুরিতে লিপ্ত করে সে সফল হয়েছে। নবী করিম (সা.) এরপর তা অনেকটা সীমিত হয়ে এসেছে। তাই সে মানুষ কুফুরিতে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে হতাশ। তবে দ্বন্ধ-কলহ সৃষ্টি করে মানুষকে বিপথে নেয়ার ব্যাপারে সে হতাশ নয়। তাই এখন সে মুসলমানের ইমান আমলকে নষ্ট করার জন্য মূর্তিপূজা করতে বলে না। সে অশান্তি সৃষ্টি করে। মানুষকে উসকানি দেয়। পরিবেশ উসকে দিয়ে মানুষের মাঝে দ্বীনের ব্যাপারে হতাশা সৃষ্টি করে। আর এভাবেই সে সফল হচ্ছে। রাসূল (সা.) বলেন ‘নিশ্চয় শয়তান নিরাশ হয়েছে যে, মুমিনরা তার ইবাদত করবে না। তবে উসকে দিয়ে বিভ্রান্ত করার ব্যাপারে সে নিরাশ নয়।’ (মুসলিম, হাদিস নম্বর: ২৮১২)।

উসকানি দেওয়ার শাস্তি

মানুষের জীবনে অশান্তি ডেকে আনা, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করার বহু কারণ থাকতে পারে। অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, মানুষের মনকে বিগড়ে দেয়া। তাই নবী করিম (সা.) উম্মতকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এর জন্য যারা দায়ী তাদেরকে সাবধান করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কারো স্ত্রীকে উসকানি দিবে স্বামীর ব্যাপারে বা গোলামকে মনিবের ব্যাপারে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ২০৭৫)। 

হাদিসের দু’ধরনের উদ্দেশ্য হতে পারে। কেউ যদি এই কাজকে হালাল ভেবে করে বা এটাকে কোনো অন্যায়ই মনে না করে তাহলে সে মুসলমানের কাতারে থাকবে না। বেইমান হয়ে যাবে। আর খারাপ মনে করা সত্ত্বেও মনের খায়েশাত মিটানোর জন্য এ কাজ করা হলে সে মুসলমান থাকবে। তবে নববী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে। হাদিসে স্বামী-স্ত্রী বা গোলাম-মনিবের কথা এসেছে। তবে উদ্দেশ্য ব্যাপক। গোষ্ঠীকে  বা দলকে উসকানি দেয়ার বিধানও এরকম। 

তথ্য দিয়ে উসকানি দেয়ার ঘটনা আল্লাহ তায়ালা কোরআনে উল্লেখ করেছেন এবং এটাকে মানুষের মন্দ স্বভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের জন্য নুহের স্ত্রী ও লুতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। ওরা উভয়ে আমার নেককার বান্দাদের মধ্য থেকে দু’জন বান্দার অধীনে ছিল। অতঃপর ওরা তাদের সঙ্গে খিয়ানত করলো। (সূরা: আহতাহরীম, আয়াত নম্বর: ১০)। হজরত ইবনে আব্বাস, ইকরিমা, ও মুজাহিদ (রাহ.) এর মতে, তাদের খেয়ানত ছিল, স্ত্রী হওয়ার কারণে তারা ওই দুই নবীর বিভিন্ন গোপন বিষয় জানতো। যখন কোন লোক হজরত নুহ (আ.) এর ওপর ঈমান আনতো, তার স্ত্রী গিয়ে লোকদেরকে সংবাদ দিয়ে আসতো। তদ্রূপ হজরত লূত (আ.) এর স্ত্রীও বাইরে তথ্য ফাঁস করে অশান্তি সৃষ্টি করতো। তথ্য হচ্ছে আমানতের বিষয়। গোপন না করে ফাঁস করে দেয়া আমানতের খেয়ানত। যা মুনাফিকের আলামত। 

রাসূল (সা.) এর জীবনী আমাদের জন্য আদর্শ। তিনি ছিলেন সব ক্ষেত্রে আদর্শবান একজন ব্যক্তি। তিনি সাহাবাদেরকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন, যেন কেউ কারো ব্যাপারে তার নিকট তথ্য সরবরাহ না করে। কারণ, যার ব্যাপারে অভিযোগ আসবে তার ব্যাপারে মন বিগড়ে যাবে। এখান থেকে উসকানি দেয়ার পথ বন্ধ করার পদ্ধতি শিখা যায়। আমাদের অনেকের অনেক অনুসারী বা কর্মী থাকে। তাদের থেকে বিভিন্ন মানুষের ব্যাপারে তথ্য আসতে থাকে। এতে অনেক সময় সাম্য রক্ষা করে চলা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আমরা যদি রাসূল (সা.) এর এই আদর্শকে মেনে চলি তাহলে অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ থাকতে পারবো।
অনেকে আছে, যারা মানুষের মন বিগড়ে দিয়ে, গোপন তথ্য পাচার করে পরিবেশ উসকে দিয়ে মানসিক শান্তি পায়। এটা রোগ। এর চিকিৎসা হওয়া দরকার। রাসুল (সা.) শুধু মানুষকে উসকানি দিতে নিষেধ করেননি বরং পশুকেও উসকানি দিতে নিষেধ করতেন। 

মীমাংসা করে দেওয়ার ফজিলত

মানুষের কর্তব্য উসকে দেয়া নয় বরং মীমাংসা করে দেয়া। বিশৃঙ্খলা উসকে দেয়া যেমন অনেক বড় অন্যায় তেমনি মীমাংসার মাধ্যমে সমাধান করাও অনেক বড় ফজিলতের বিষয়। হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আমি তোমাদেরকে রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়ে উত্তম বিষয় সম্পর্কে জানাবো না? সাহাবায়ে কেরাম বলেন, অবশ্যই। রাসূল (সা.) বলেন, মানুষের মাঝে ঝগড়া বিবাদ মীমাংসা করে দেয়া নামাজ রোজার চেয়ে উত্তম। কারণ, পরস্পর সম্পর্ক নষ্ট হওয়া মানুষের ধ্বংসের কারণ।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নম্বর: ২৫০৯)। সূরা আনফালে বলা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের পরস্পরের সম্পর্ক সংশোধন করো।’ (আয়াত নম্বর: ১)। সূরা হুজুরাতে বলা হয়েছে, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো। যাতে তোমাদের প্রতি রহম করা হয়।’ (আয়াত নম্বর: ১০)। এর আগের আয়াতে বলা হয়েছে, মুমিনদের দু’দলের মাঝে ঝগড়া হলে তোমরা তাদের মাঝে মীমাংসা করে দাও। এরপর যদি কোনো দল অন্যদলের ওপর চড়াও হয় তাহলে যে চড়াও হবে তোমরা তার বিপক্ষে যুদ্ধ করো যাবত না সে দল আল্লাহর বিধানের দিকে ফিরে আসে।

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের পদ্ধতি

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ ইসলামের সুস্পষ্ট একটি বিধান। মুসলিম উম্মাহর অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা শুধু নিজেদের দ্বীনদারির হেফাজত করবে না। বরং অন্যের দ্বীনদারির হেফাজতের ব্যবস্থা করবে। তাই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধকে ঈমানের অংশ সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবে এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি বাতলে দেয়া হয়নি। সময়, স্থান বুঝে যেখানে যেভাবে করলে ফল পাওয়া যাবে  সেভাবে কাজ করতে হবে। তবে এখানে কিছু মৌলিক মেনে কাজ করতে হবে। অন্যথায় এর দ্বারা পরিবেশকে উসকে দেয়া হবে। তখন কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণের পাল্লা ভারি হয়ে যাবে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এনকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!