মিয়ানমারের প্রদেশ/রিজিওন এবং রাখাইন রাজ্য:
মিয়ানমারের ৭টি প্রদেশ এবং ৭টি প্রশাসনিক বিভাগ/রিজিওন রয়েছে। চিন, কাচিন, কায়ন, কায়াহ, মোন, শান ও রাখাইন হলো প্রদেশ এবং আইয়ারওয়াদী(ইরাওয়াদী), ম্যাগওয়ে, মান্দালে, বাগো, সাগাইং ও টানিনথাকি হলো প্রশাসনিক বিভাগ/রিজিওন।
.png)
রাখাইন রাজ্যের উত্তরে চিন প্রদেশ, ম্যাগওয়ে ও বাগো প্রশাসনিক অঞ্চল পূর্বে ইরাওয়াদী রিজিওন ও বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে বাংলাদেশ। রাখাইন রাজ্য দেখতে অনেকটা টিকটিকির মতো।
১৯৯০ এর আগে রাখাইন আরাকান নামে পরিচিত ছিল। আরাকান বৃটিশ-ভারতের অংশ ছিল। পরে বর্মীরা এটার দখল নেয়। এই আরাকান স্টেট এ বুদ্ধ ধর্মের মানুষ বেশি। মুসলমান রয়েছে বেশ পরিমাণ। এছাড়া স্বল্প হিন্দু ও খৃস্টান রয়েছে। এখানে সশস্ত্র সংগ্রামী আরাকান আর্মি, আরসা ও আরো কিছু সংগঠন রয়েছে। ১৯৯১ ও ২০১৭ সালে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জান্তা ও নির্বাচিত সরকার নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। ফলে ২ বারে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় নেয়।
রাখাইন প্রদেশে বিদেশিদের কর্মকাণ্ড:
চায়না এবং ভারত স্বীয় স্বার্থে রাখাইনে কয়েকটি প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। ভারতের কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। কোলকাতা সমুদ্র বন্দর থেকে সিত্তওয়ে সমুদ্র বন্দর হয়ে সড়ক ও নৌ পথে নাগাল্যান্ড দিয়ে ভারতে প্রবেশ করবে এই রাস্তা। এই পথে ভারত তার সেভেন সিস্টারকে রশদ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করবে। এটা বাংলাদেশ দিয়ে চলাচলে অসুবিধে হলে পুরোদমে খুলে দেওয়া হবে। এছাড়া চায়নিজরা বঙ্গোপসাগর থেকে তেল ও গ্যাস আহরণ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য গ্যাসপাইপ লাইন বসাচ্ছে। দুই দেশেরই ভালো ইনভেস্টমেন্ট হয়েছে।
রাখাইনে বর্তমান অবস্থা:
রাখাইন রাজ্যের পুরোটাই আরাকান আর্মি ( এএ) দখলে নিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে সকল বর্ডার আউট পোস্টে এএ এর সৈন্যরা বসে গেছে। এএ সাধারণত চীনা অস্ত্র ব্যবহার করছে। চীনারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ডুয়েল রোল প্লে করে। মজার ব্যাপার হলো আমেরিকা ওয়াল্ড ফান্ড প্রোগ্রামের মাধ্যমে এএ কে বেশ টাকা দিয়েছে। খুব কমপ্লেক্স মনে হচ্ছে না? জী, সিচুয়েশন কমপ্লেক্স। মিয়ানমারের জান্তা চাচ্ছে যাতে নড়বড়ে হলেও ইয়াংগুনের পাওয়ার যাতে তাদের হাতে থাকে। তবে থ্রি ব্রাদারহুড ও ডেমোক্রেটিক পিপলস অ্যালায়েন্স এবং অন্যান্য বিদ্রোহী গ্রুপ কী করে সেটা দেখার বিষয়। এফএও সহ বেশ কয়েকটি সংগঠন বলছে, রাখাইনে আগামী জুলাই ২৫ এর মধ্যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। চরম খাদ্য সংকটে আছে রাজ্যটি।
বাংলাদেশের জন্য কী কী হুমকি আছে:
পাশ্ববর্তী দেশে গৃহযুদ্ধ হলে নিজ দেশ প্রথমে যে ক্ষতির শিকার হয় তাহলো রিফিউজি সমস্যা। সেটায় আমরা জড়িয়ে পড়েছি। এরপর বিভিন্ন আর্মড গ্রুপের অনুপ্রবেশ। সেটাও আছে। আমাদের অর্থনীতির এই চাপকে সহ্য করার সহনীয়তার ব্যাপার রয়েছে। সেটা আছে কি-না তা পরীক্ষা করা দরকার। সেন্টমার্টিন দ্বীপ রাখাইন হতে মাত্র ৮-৯ কিঃমিঃ দূরে। এর সম্পূর্ণ নিরাপত্তার জন্য নৌবাহিনীর শক্ত অবস্থান নেয়া। কোস্ট গার্ড ও বিজিবি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা প্যাট্রোলিং করবে। প্রত্যেকটি বিওপিকে শক্তিশালী অস্ত্রদ্বারা শক্তিবৃদ্ধি করতে হবে। চট্টগ্রাম এয়ারবেসকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান ও শক্তিবৃদ্ধিকরণ।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আরাকান আর্মি একটা বড় ধরনের অটোনমি চাইছে জান্তার কাছ থেকে। অন্য দেশ বা অঞ্চল আক্রমণের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে দাদাদের কালাদান প্রজেক্ট থেকে তারা ভালো দান মেরে দেবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ উত্তর-পূব ভারতে রশদ বাংলাদেশ দিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা ছোট হয়ে আসছে। আমেরিকার উসকানিতে চাইনিজদের কাছ থেকেও চাঁদা নেবে আরাকান আর্মী।
যেহেতু আরাকান স্বাধীনতা ঘোষণা করেনি সেইহেতু কূটনীতিক হিসাব-নিকাশ মিয়ানমার, চায়না ও সো কলড বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের সাথে করতে হবে। বিওপিগুলোর মাধ্যমে আরাকান আর্মির সাথেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের পলিটিক্যাল উইংয়ের সাথেও একটা যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। আমেরিকার বুদ্ধি নেয়া যেতে পারে। তাদের স্ট্র্যাটেজিটা বুঝতে হবে এবং অনুধাবন করতে হবে। তারপর দেশের জন্য কল্যাণের অংশটুকু কাজে লাগাতে হবে। কালাদান প্রজেক্ট নিয়ে ভারত মাইনক্যার চিপায় আছে। আরো আছে খৃস্টান দেশ সৃষ্টির জ্বালা। তাই তারা রাখাইন রাজ্যের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বাংলাদেশকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
একটা ব্যাপারে আমরা গুলিয়ে ফেলি। কুকিরা খৃস্টান সম্প্রদায়ের লোক। তাদের আরাকান বুদ্ধদের সাথে তেমন সখ্যতা নেই। ওরা ঘুটো করছে ভারতের থ্রি-এম ও নাগাল্যান্ডে। সাথে নিয়েছে মিয়ানমারের চিন প্রদেশকে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে খেলতে গেলে খেলার মাঠ অনেক বড় হয়ে যাবে। শেষে আর দম থাকবি নাকো! রাখাইন রাজ্যের সাথে স্পোরাডিক বর্ডার স্ক্রীরমিশেষ ছাড়া আর কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আমি দেখছি না।
দুর্ভিক্ষের দ্বার প্রান্তে দাঁড়ানো রাজ্যের একটি ৬০-৭০ হাজার সৈন্যদলের বাহিনী বাংলাদেশ আক্রমণ করবে এই ধারণা যারা পোষণ করেন তাদের সাথে তর্ক করাকে আমি সময়ের অপচয় বলে মনে করি।
ইকবাল শাহরিয়ার চৌধুরী
সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪