শব্দদূষণ হ্রাসে পরিবেশ অধিদফতর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিলেও শুধুমাত্র সরকারের পক্ষে একা এই দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। সমাজের প্রতি স্তরের মানুষের তাই সহযোগিতা প্রয়োজন।
১. শব্দ দূষণজনিত স্বাস্থ্য ঝুঁকি
.png)
উচ্চ রক্তচাপ, নাড়ীর গতি বৃদ্ধি, শ্রবণশক্তি হ্রাস, মাত্রাতিক্ত শব্দে পেটের গোলযোগ, এমনকি হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে। সেই সাথে শ্বাসকষ্ট, বুক ধরফর, মাথাব্যথা, অনিদ্রা, মানসিক চাপ, কর্মদক্ষতা হ্রাস, মনোযোগের অক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা হ্রাস সহ নানাবিধ উপসর্গ দৃশ্যমান।
২. শব্দ দূষণ শিশুর স্বাস্থ্যের উপর যে প্রভাব ফেলে
এটা তিন ভাবে ভাগ করা যায়।
প্রথমত শারীরিক:
শ্রবণ ক্ষমতা কমে যাওয়া।
রক্তচাপ বৃদ্ধি
হরমোনাল অসমতা
ঘুমের সমস্যা
কানে ঝিনঝিন শব্দ করা (টিনাইটাস)
দ্বিতীয়ত বুদ্ধিভিত্তিক
কথা বলতে দেরি
কথোপকথন বুঝতে সমস্যা
ভালোমতো মনে রাখতে না পারা পড়ার দক্ষতা কমে যাওয়া
তৃতীয়ত আচরণগত
প্রেস এবং দুশ্চিন্তা
উৎসাহহীনতা
অস্থিরতা
৩. শব্দ দূষণের রোগীদের উপর
যুক্তরাজ্যের এক গবেষণায় দেখা গেছে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চল্লিশ শতাংশ রাতে হাসপাতাল থেকে তৈরি শব্দ দ্বারা ভোগান্তি সম্মুখীন হচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (১৯ শে নভেম্বর ২০১৮ সালে) বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে আইসিইউর রোগীরা সব থেকে বেশি দুর্বল অবস্থায় থাকায় অতিরিক্ত শব্দের জন্য তাদের কষ্ট ব্যাপক। এই কষ্টের পরিমাণকে বলা হয়েছে ১০০ ডেসিবেলের মতো যেটা হেডফোন দিয়ে উচ্চস্বরে গান শোনার সমতুল্য। এত গেল রোগীদের কথা, কিন্তু সেখানে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরাও কিন্তু ভোগান্তির বাইরে নন। অথচ তাদের এই কষ্টের কথা আলাপে আসে না।
করোনারি কেয়ার ইউনিট যেখানে হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়া হয় সেখানে ক্রমাগত মেশিনের শব্দ রোগীর ভালো হয়ে যাওয়াকে বিলম্বিত করে বলে একই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. শব্দ দূষণ এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ার
নিরাময়ে অযোগ্য, জীবন সীমিত রোগে আক্রান্ত যেই মানুষগুলো জীবনের শেষ দিনগুলোতে জীবনযাত্রার মান একটু একটু করে কমে যাচ্ছে তাদের জন্য শব্দ দূষণ আর অন্যান্য শব্দ দূষণের ক্ষতিকারক দিকের থেকে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আবির্ভূত হয়। কারণ এই মানুষগুলো যাদের প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রয়োজন তাদের কিন্তু শুধু শারীরিক স্বাস্থ্য নয়, এর সাথে মানসিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের যত্নের প্রয়োজন। এবার ভাবুন শব্দ দূষণ এই মানুষগুলোর স্বাস্থ্যের চারটি ক্রমবিভাগের উপর এই কি পরিমাণ নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাপী আলোচনার অবকাশ এখনো সীমিত। বৈশ্বিক চালচিত্রে মাত্র ১৪ শতাংশ মানুষ প্যালিয়েটিভ কেয়ার পাচ্ছেন। কাজেই এটা সহজেই অনুমেয় যে এরা সবাই উচ্চ আয়ের দেশবাসী। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রায় ৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং ৭০ হাজারের অধিক শিশুর প্যালিয়েটিভ কেয়ারের সেবার প্রয়োজন। কিন্তু আফসোস, এই সেবা অধিকাংশই ঢাকা কেন্দ্রিক।
৫. আপনার পোষা প্রাণীটির উপর শব্দ দূষণের প্রভাব
গবেষণা বলছে ৮৫ ডেসিবেল বা এর অধিক শব্দ থাকলে আপনার পোষা প্রাণীর শ্রবণ ক্ষমতা নষ্ট হয়, তার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি এবং হৃৎপিণ্ডের গতি বৃদ্ধি পায়, আপনি তাকে কোন ইঙ্গিত দিলে বা আদেশ করলে সেই অনুরূপ আচরণ করতে সে ব্যর্থ হয়।
৬. শব্দ দূষণ এবং বৃক্ষ সমাজ
গবেষণায় দেখা গেছে ৭৫ শতাংশ পাইন গাছের চারা বেশি উৎপন্ন হয়েছে যেখানে প্রকৃতি শব্দ দূষণমুক্ত। উপরন্তু শব্দ দূষণ পাখিদেরকে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল থেকে বিচ্যুত করে বিধায় পাখিদের মাধ্যমে গাছের বীজের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়া ব্যাহত হয়। তবে আশা কথা হলো বৃক্ষায়ণ চালু করলে শব্দ দূষণের হার কমে কারণ গাছের কান্ড পাতা এবং শাখা শব্দ শুষে নেয়। কিন্তু শব্দ দূষণ গাছের বৃদ্ধি এবং নতুন শাখার জন্মকে ব্যাহত করে।
৭. শব্দ দূষণ এবং পাখি
প্রতিবছর নববর্ষে বাজি ফোটানোর কারনে কি পরিমান পাখির মৃত্যু হয় সেটা আমরা জানি, কিন্তু জানার পরেও কতটা আমলে নেই? ইদানিং কেন জানি এ কথা সুস্পষ্ট যে মানুষ ভুলে গেছে এই পৃথিবীটা শুধুমাত্র তার একক বাসস্থল নয়। সাম্যতা এবং সমতা শুধু মানুষের আন্তর সম্পর্কে নয় প্রকৃতির সাথেও এর চর্চার সম্পৃক্ততা শুধুমাত্র ইদানিং কেতাবে আছে গোয়ালে নেই।
৮. বাংলাদেশের শব্দ দূষণ আইন
বিধিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত নটা থেকে ভোর ছটা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেল অতিক্রম করতে পারবে না। বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবেল। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা রয়েছে।
নিজের চোখে আয়না ধরা প্রয়োজন। শব্দ দূষণ প্রতিরোধে আমি কি করছি? অন্তত আমার বাড়ির ছাদ থেকে বা আমার ঘর থেকে উচ্চস্বরে আওয়াজ প্রতিবেশীকে বিপর্যস্ত করছে কি? কে কি করল সেই ভাবনা না ভেবে আমি কি করছি সেই ভাবনাটা ভাবা এখন সময়ের প্রয়োজন। কারণ দিনশেষে, we are not independent we are interdependent.
লেখক: অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া; চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্রাক্টিশনার, ফিনিক্সওয়েলনেস সেন্টার বাংলাদেশ।