বিপদ কখনো বলে কয়ে আসে না। বিশেষ করে প্রকৃতির উপর কারো হাত নেই। সে বড় অবুঝ! যখন দেয় দুহাতে দেয়, যখন কেড়ে নেয় চার হাতে নেয়। বড় দেশ, ছোট দেশ, পূর্ব -পশ্চিম, উত্তর- দক্ষিণ, ক্ষমতাধর, ক্ষমতাহীন কিছুই মানে না প্রকৃতি। ’৭০-এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে যেমন মানেনি, তেমনই মানেনি পর পর কয়েক বছর ধরে ঘটা উপর্যুপরি বন্যায়। ’৭০-এ দেখেছি ঘরের চালের টিন উড়ে গিয়ে করাতের মতো মানুষকে দুই ফালি করে ফেলতে। দেখেছি নদী ভাঙ্গনে ঘর-বাড়ি, গবাদি পশু ডুবে যেতে। এইতো সেদিন সিলেটে ভয়াবহ বন্যায় ছোট্ট শিশুকে ঘরের চালে আশ্রয় নিতে দেখেছি। সে ঘরেরও তিনভাগ জলে ডোবা।
দেখেছি ত্রাণশিবিরে শিশু জন্ম নিতে। খাবার নেই, পানি নেই, আশ্রয় নেই, হাহাকার আর আর্তনাদে বিদীর্ণ আকাশ দেখেছি! কত মানুষের জীবন চলে গেছে নিমিষে। আমেরিকার আঘাত হানা স্যান্ডিতে তছনছ হয়ে গেছে সাজানো ঘরবাড়ি, মানুষের জীবন। যে বাড়িতে থেকে এমন একটি বাড়ি আমার নেই বলে মনে মনে আক্ষেপ করেছি, মাত্র দিন কয়েক পরেই দেখেছি সে বাড়িকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে। সে সময় সমুদ্র তীরে উপুড় হয়ে পড়ে থাকা একটা মৃত শিশুর নিথর দেহ কাঁদিয়েছে সারা বিশ্বকে।
.png)
সম্প্রতি তুরস্ক আর সিরিয়ার ভূমিকম্পে বিষাদাচ্ছন্ন হয়েছে বিশ্ববাসী। চারণ কবিরা গানের সুরে সুরে বলেন, ‘সকালবেলা আমির রে ভাই ফকির সন্ধ্যেবেলা’। অবিশ্বাসী মানুষ শুনে ভাবে, আমির আবার বেলাবেলি ফকির হয় কীভাবে! তারা ভুলে যায় প্রকৃতি বলে একটা শক্তি আছে। তার রোষ ভয়ানক, সে রুষ্ট হলে নিমিষে সব শেষ হয়ে যায়!
সম্প্রতি একটা ছবি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে। অনেকের দুই চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমেছে। দুখানা পাউরুটি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তুরস্কের একজন নাগরিক। যারা দুই দুইটা বহুতল ভবন ছিল, ভূমিকম্পের পর তার কিছুই নেই। মানুষের দেয়া রুটি হাতে নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, চোখ মুছছেন।
এ ঘটনা যে শুধু তার ক্ষেত্রে ঘটেছে এমন নয়। অসংখ্য মানুষের ক্ষেত্রে ঘটেছে। রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন তারা। কে জানতো এমন ভয়াবহ দুর্যোগ তাদের ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছে! তারিখটা ছিল ৬ ফেব্রুয়ারি। ভোররাতে তুরস্কের গাজিয়ানটেপের কাছে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। সে শক সামলে ওঠার আগেই স্থানীয় সময় বেলা দেড়টার দিকে আরো একটি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। তুর্কি দুর্যোগ সংস্থার দেয়া খবর মতে, প্রথম ভূমিকম্পে তুরস্কে ৩৪১৯ জনের বেশি মারা গেছে, আহত হয়েছে ১৫ হাজার মানুষ। ভূমিকম্প আঘাত হানে সিরিয়াতেও। সিরিয়ায় মারা গেছে ১৬০০ জনের বেশি। তাছাড়া পর পর দুটি ভূমিকম্পের পর তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে কয়েকটি শক্তিশালী আফটার শক ও কম্পন আঘাত হেনেছে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান তুরস্ক ও সিরিয়া জুড়ে আড়াই কোটির বেশি মানুষ এই ভূমিকম্পের শিকার হয়েছে। তার মধ্যে ১০ লক্ষেরও বেশি শিশু রয়েছে। যারা প্রকৃতি কী জানে না, ভূমিকম্প কী জানে না, জানে না কেন আজ তাদের এই অবস্থা! শিশুদের অবস্থা খুবই নাজুক।
তুরস্ক আর সিরিয়া দুই দেশের অসংখ্য ভবন ধসে পড়েছে । ভূমিকম্পের পর দিনের আলো ফোটার পর উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধারকাজে ঝাপিয়ে পড়ে। কিন্তু আটকে পড়া মানুষের তুলনায় উদ্ধারকর্মীর সংখ্যা ছিল কম। আটকে পড়া মানুষ তাদের উদ্ধার করার জন্য ডাকাডাকি করেছেন, মোবাইলে মেসেজ, ভিডিও, ভয়েস নোট পাঠিয়েছেন। কেউ কেউ লাইভ করে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন। কিন্তু তাদের সবাইকে উদ্ধার করার বা সাড়া দেয়ার মতো পর্যাপ্ত লোক ছিল না। এমনকি ঠিক কে কোথায় আছেন তাও বোঝা যাচ্ছিল না সহজে। কারণ ভবনগুলি ধসে পড়ে বিরাট ধ্বংসস্ত‚পের সৃষ্টি হয়েছিল চারদিকে।
প্রায় ৬০০০ ভবন ধসে পড়েছে। যে ভবনগুলি ধসে পড়েনি সেগুলোর অনেকটাই রয়েছে ঝুঁকিতে। যে কোন সময় ধসে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পুলিশ এবং উদ্ধারকারীরা এসব ভবনের বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। আফটার শকের ভয়ে অনেকে বাড়ি ঘর ছেড়ে বৃষ্টি ও তুষারপাতের মধ্যে দিন রাত কাটাচ্ছেন। ২৪৪০০ জনের বেশি জরুরি কর্মীকে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে মোতায়েন করা হয়েছে। তারা স্নিফার কুকুর সঙ্গে নিয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষ খুঁজছেন। ডিগার দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে দেখছেন নিচে কি আছে! তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের বাঁচানোর সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বেশ অনেকদিন হয়েও গেছে। এতদিনে ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ থাকলেও বেঁচে আছেন বলে মনে হয় না। একে শীত মৌসুম। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেলে উদ্ধার অভিযান বাধাগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যে সিরিয়ার উদ্ধার অভিযানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তুরস্ক থেকে জাতিসংঘের জরুরি সাহায্য পাঠানোর পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টি এবং বিদ্যুৎ না থাকায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে । তুরস্কের ওসমানিয়া শহরের অবস্থা ভয়াবহ। ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে এটি একটি।
তুরস্ক ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা। ১৯৯৯ সালে দেশটির উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। মাঝে মাঝেই তুরস্কে ভূমিকম্পের খবর পাওয়া যায়। এটা ঠিক যে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা যায় না। তারপরও ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস, সতর্কীকরণ বার্তা, নিরাপদ শেলটারের ব্যবস্থা তুরস্কে আছে কিনা, থাকলে পর্যাপ্ত কিনা আমাদের জানা নেই। বিশেষ করে ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধারকাজে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে কিনা, থাকলে তা যথেষ্ট কিনা তাও জানি না। তবে এটুকু জানি, যে এলাকা বা যে দেশ ভূমিকম্পপ্রবণ বলে চিহ্নিত সেখানে অবশ্যই আগাম এবং পরবর্তী পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ছে রানা প্লাজা ধসের কথা। সেটা অবশ্য ছিল মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগ। ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করার পরও ভবনের মালিক মাসুদ রানা জোর করে শ্রমিকদের দিয়ে গার্মেন্টসে কাজ করাচ্ছিলেন। ওই ভবনে ছয়টি গার্মেন্টস ছিল। রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর উদ্ধারকাজের জন্য অন্য জিনিসপত্র তো দূরের কথা, একটা টর্চ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন ছিল স্বয়ংক্রিয় মই, এয়ার কমপ্রেসর, কাটার, ইলেকট্রিক হ্যামার, মেগাফোন, সার্চ ক্যামেরা, এক্সক্যাভেটরসহ আরো অনেক কিছু। এর কোনোটিই পাওয়া যায়নি জরুরি মুহূর্তে। অথচ প্রতিবছর উদ্ধারকাজে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনের সময় বাস্তবে তার দেখা মেলে না। রানা প্লাজা ধসের সময় স্থানীয় লোকজন, অঘোরচন্দ্র স্কুলসহ আশেপাশের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানি এবং এনাম মেডিকেল যে ভূমিকা রেখেছিল তা ইতিহাসে লিখে রাখার মতো।
নিজ দেশ হোক অথবা অন্য দেশ, সব দেশের মানুষ সমান। আশরাফুল মখলুকাত। সবাই যেমন শান্তিতে বাঁচতে চায়, তেমন শান্তিতে মরতেও চায়। কেউই চায় না অপঘাতে মরতে। সবাই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চায়। সে বাংলাদেশের মানুষই হোক, আর তুরস্ক সিরিয়ার মানুষই হোক। কাজেই সে দেশের সরকারেরও উচিত মানুষের নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা।
তুরস্কের সাংবাদিকরা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কিছু কিছু সহযোগিতা পৌঁছেও গেছে। আরো সহযোগিতা পৌঁছাবে। কারণ অতীতেও দেখা গেছে, সবার বিপদে সবাই এগিয়ে আসে। কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। তবে বেদনার কথা এটাই, যে মানুষগুলো চলে গেছেন তারা আর ফিরবেন না! মানুষের যে ক্ষতি হয়েছে কিঞ্চিৎ সাহায্য দিয়ে তার সামান্যতম অংশও পূরণ হবে না। তবুও মানুষ যেন ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক থাকে এটাই আমাদের চাওয়া। সে আমার দেশ হোক বা অন্য কোন দেশ।