* টানা অস্থিরতার পরও স্বাভাবিক অবস্থায় পোশাক খাত
* বিভিন্ন কারণে বন্ধ ৬০টিরও বেশি কারখানা
* শিগগিরই উৎপাদনে ফেরার আশা উদ্যোক্তাদের
* ৪০ লাখের কর্মসংস্থানকে নিরাপদ রাখা জরুরি
নানা দাবিতে গত ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের পর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে পোশাক কারখানা। তবে বিভিন্ন কারণে বন্ধ রয়েছে ৬০টিরও বেশি কারখানা। বন্ধ কারখানা শিগগিরই উৎপাদনে ফিরবে বলে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা আশা করছেন।
.png)
সোমবার সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকায় তৈরি পোশাক শ্রমিকরা যথাসময়ে নিজেদের কর্মস্থলে প্রবেশ করে কাজে যোগদান করায় কর্মমুখর হয়ে ওঠে কারখানার পরিবেশ। উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ায় মালিকরাও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কারখানাগুলোতে উৎপাদন শুরু হওয়ায় উদ্যোক্তারা আশা করছেন তারা তাদের রফতানির শিপমেন্ট দ্রুত সমযের মধ্যে দিতে পারবেন। তবে দাবি আদায়ে মালিক পক্ষের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় এখনো ৬০টি কারখানা বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, শ্রমিক নেতারা বলছেন, ক্ষমতার পালাবদলে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, ঝুট ব্যবসা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। কারখানাগুলোয় নেতৃত্বের পালাবদল ও শ্রমিক সংগঠনের কমিটিগুলোয় নিজেদের কর্তৃত্ব নিতে পেছন থেকে ইন্ধন দিয়ে শিল্পকে অস্থির করার পাঁয়তারা চলছে। চলমান আন্দোলনে সাধারণ শ্রমিকের অংশগ্রহণ খুবই কম। অনেককে ভয়ভীতি দেখিয়ে আন্দোলনে যুক্ত হতে বাধ্য করা হয়েছিল। আন্দোলন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী শ্রমিকদের বেশিরভাগই ছিল বহিরাগত।
তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, জিরানী, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা মেট্রোপলিটন ও চট্টগ্রামে মোট পোশাক কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১৪৪। এর মধ্যে খোলা কারখানা ২ হাজার ৯০টি। সাময়িক বন্ধ কারখানা ৬০টি।
বিজিএমইএর পরিচালক ও গাজীপুরের লক্ষ্মীপুরায় অবস্থিত স্পেরো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, গাজীপুরে বিজিএমইএর সক্রিয় কারখানা রয়েছে ৮৭৬টি। এর মধ্যে সোমবার সব কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চলমান ছিল। কোনো কারখানা বন্ধ ছিল না। তবে গাজীপুরের পার্শ্ববর্তী আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় সক্রিয় ৪০৭টি কারখানার মধ্যে বেশ কয়েকটি বন্ধ ছিল।
বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার সকাল থেকে শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, সাভার এবং আশুলিয়ার অধিকাংশ গার্মেন্টের শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশুলিয়ার নরসিংহপুর হা-মীম গ্রুপ, নিট এশিয়া, শারমিন গ্রুপ, সরকার মার্কেট এলাকার নেক্সট কালেকশন, বান্দুডিজাইন, বাগবাড়ির ডেবনিয়ার, জামগড়ার দি-রোজ, পলমল, ছয়তলার এনভয়, নিশ্চিন্তপুরের অনন্ত গার্মেন্টসসহ অধিকাংশ কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন।
এদিকে অব্যাহত শ্রমিক অসন্তোষের জেরে বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ১৩ (১) ধারায় ৬০টি কারখানা বন্ধ রেখেছে মালিকপক্ষ। এছাড়া কারখানায় প্রবেশের পর কাজ না করায় আরো দুটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া বাকি সব পোশাক কারখানায় পুরোদমে উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছেন।
ইউরো আর্থ অ্যাপ্যারেল লিমিটেডের শ্রমিক মোহাম্মদ শুভ বলেন, কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকরা প্রবেশ করে বিভিন্ন দাবিতে কাজ বন্ধ করে বসে থাকেন। শ্রমিকরা মূলত সমস্যা সমাধান করতে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করছেন। আবার কয়েকটিতে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হলেও অগ্রগতি হচ্ছে না।
বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি অরবিন্দ বিন্দু বেপারী বলেন, শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারায় বন্ধ রয়েছে বেশকিছু কারখানা। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় কারখানাগুলোতে সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তাই বন্ধ কারখানাগুলো অবিলম্বে খুলে দিতে আমরা মালিকপক্ষ ও বিজিএমইএ’র কাছে অনুরোধ করেছি।
তিনি আরো বলেন, কারখানা বন্ধ রাখা কোনো সমাধান নয়। খুলে দিয়ে মালিকপক্ষের উচিত শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা। এছাড়া কারখানা বন্ধ থাকা নিয়ে নতুন করে যাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয় সেজন্য দ্রুত বন্ধ কারখানাগুলো খুলে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মো. সারোয়ার আলম বলেন, শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। শ্রম আইনের ১৩ (১) ধারায় বেশ কয়েকটি কারখানা বন্ধ রয়েছে। যেগুলো গত ১৫ দিনে বিভিন্ন সময় বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া আরও দুটি কারখানায় সাধারণ ছুটি রয়েছে। আমরা বন্ধ কারখানাগুলো খুলে দেওয়ার জন্য বিজিএমইএ ও মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছি। চলতি সপ্তাগের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের অবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশা করেন।
এছাড়া যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তায় বিভিন্ন কারখানার সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি যৌথ বাহিনীর টহল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।
আওয়াজ ফাউন্ডেশনের অর্থ সম্পাদক এবং সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের ভাইস চেয়ারম্যান খাদিজা আক্তার বলেন, বিভিন্ন কারণে সোমবার প্রায় ৬০টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। বর্তমানে কারখানাগুলোতে কোনো অস্থিরতা নেই। অধিকাংশ কারখানায় স্বাভাবিকভাবে কাজ চলছে। কয়েকটি কারখানায় শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবিতে মিছিল করেছে। আশার কথা হচ্ছে এসব কারখানায় কোনো বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন জানান, শ্রীপুর এলাকার কোনো কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি। তবে দুটি কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেছেন এবং বিকালে মালিকপক্ষের সঙ্গে বসে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করেছেন।
দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প খাত। এ খাতের হাত ধরেই দেশের অর্থনীতিতে এসেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোয় প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সামনের সারিতে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ৩০টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশকে ধরা হয়। এ সাফল্যের পেছনে, তথা এ বদলে যাওয়া বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে পোশাক শিল্প। এ খাত শুধু জাতীয় অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করেনি, একই সঙ্গে নিশ্চিত করেছে অগণিত মানুষের কর্মসংস্থান। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি অন্তত ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এ খাত। নারীর ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখছে খাতটি। এজন্য এই খাত নিরাপদ রাখা জরুরি।
এদিকে সোমবার গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীতে বকেয়া বেতনের দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন পোশাক শ্রমিকরা। সকাল সাড়ে ৯টায় গাজীপুরের টঙ্গী পশ্চিম থানার আওতাধীন এরশাদ নগর এশিয়া পেট্রোল পাম্পের সামনের মহাসড়ক অবরোধ করেন টঙ্গীর খাঁ পাড়া এলাকায় সিজন্স ড্রেসেস লিমিটেডের শ্রমিকরা। এর ফলে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বন্ধ হয়ে আছে সড়কের উভয় পাশের যান চলাচল। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী মানুষ। গাড়ি না পেয়ে হেঁটেই গন্তব্যস্থলের দিকে যান অনেকে।
সড়ক অবরোধ করা গার্মেন্টস শ্রমিকরা বলছেন, তিন মাস ধরে গার্মেন্টসের মালিকপক্ষ বেতন দিচ্ছে না। বাকি রয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের ওভারটাইমের টাকা, তিন বছরের ছুটির টাকাও। বারবার আশ্বাস দিয়েও তারা শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেককেই অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে।
এক গার্মেন্টস শ্রমিক বলেন, বেতন দিয়ে দেওয়া হবে- এমন আশ্বাসে আমাদের তিন মাস ধরে ঘোরানো হচ্ছে। চলতি মাসসহ মোট চার মাসের বেতনের টাকা বাকি পড়েছে। এর আগের দুই মাসে ওভারটাইমের টাকা পরিশোধ করা হয়নি। আমরা চাই প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে যেন শ্রমিকদের বেতনের টাকা পরিশোধ করা হয়। আগের বকেয়াও পরিশোধ করতে হবে।
এ বিষয়ে গাজীপুর শিল্প পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোশাররফ হোসেন বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। সড়ক অবরোধের ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষজন। দেড় ঘণ্টার বেশি সময় অবরোধ থাকায় সড়কের উভয় পাশের যানজট কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়েছে।
এর আগে রোববার সিজন্স ড্রেসেস লিমিটেড, প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও মণ্ডল গার্মেন্টস লিমিটেডের শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। টঙ্গীর সাতাইশ বাগানবাড়ি এলাকায় অবস্থিত প্রিন্স জ্যাকার্ড সোয়েটার লিমিটেড কারখানার প্রায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিক তাদের আগস্ট মাসের বেতনের দাবিতে কর্মবিরতি পালন করছেন।
এছাড়াও টঙ্গীর চেরাগআলী স্কুইব রোড এলাকায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেন। এ ছাড়া হাজিরা বোনাসের দাবিতে বাঘের বাজার এলাকায় মণ্ডল গার্মেন্টস লিমিটেডের পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে মাওনা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ হলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।