শ্বাসরুদ্ধকর দীর্ঘ আট ঘণ্টা যুদ্ধের বর্ণনা
সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকানের বামবারি শহরে শত্রুপক্ষ ইউপিসির ঘাঁটিতে দীর্ঘ আট ঘণ্টা শ্বাসরুদ্ধকর যুদ্ধ চালিয়ে অপারেশন বেকপা-২ সফলভাবে সম্পন্ন করে বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্স (ব্যানএসএফ)।
ব্যানএসএফ-৩ কে আক্রমণাত্মক অভিযানের নির্দেশনা প্রাপ্তি সাপেক্ষে, ট্যকটিক্যাল কমান্ডার বিএ-৭৬০১ মেজর মোস্তফা আনোয়ারুল আজীজ, ওএসপি, এসজিপি বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্স কোম্পানিকে অভিযানের আদেশ দেন। কমান্ডার অভিযানের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে তিনি দুইটি দল নির্ধারণ করেন। যার একটি তিনি নিজে এবং অপরটি বিএ-৮৬৪০ ক্যাপ্টেন তৌকির আহমেদ এর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। 
অপারেশন বেকপা-২ সম্পর্কে জানতে ক্যাপ্টেন তৌকিরের সঙ্গে কথা হয় ডেইলি বাংলাদেশের এই প্রতিবেদকের। সফল এই অপারেশন সম্পর্কে প্রথমে তিনি কথা বলতে নারাজ ছিলেন। পরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দুঃসাহসিক দৃষ্টান্ত স্থাপনা, সক্ষমতা ও ভাবমূর্তি উজ্জ্বলের লক্ষ্যে বলতে শুরু করেন তিনি।
বর্ণনায় বেকপা-২ অপারেশন
অভিযান দলটি ১৭ জানুয়ারি স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় দুইটি এপিসি, একটি এপিসি রিকোভারি, একটি এপিসি অ্যাম্বুলেন্স, ২টি এলএভি ও ২টি ফাইটিং পিকআপ নিয়ে বামবারির মিনুস্কা ক্যাম্প থেকে ৩ কিলোমটিার দূরে টার্গেট এলাকায় (মিক্সড ব্রিগেড) যাত্রা শুরু করে।
টার্গেট এলাকায় পৌঁছামাত্রই সুপ্রশিক্ষিত ইউপিসি এর সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্সের ওপর বিপুল পরিমাণ এমজি, আরপিজি, গ্রেনেড ও ক্ষুদাস্ত্রে উপর্যুপরি ফায়ার শুরু করে।

শত্রুর প্রবল চাপের মুখে ন্যূনতম বিচলিত না হয়ে ক্যাপ্টেন তৌকির আহমেদ ও তার নেতৃত্বাধীন দল টার্গেটকে ফায়ার করতে করতে শত্রুর শক্ত ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হয়।
এক পর্যায়ে বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্সের অপ্রতিরোধ্য আক্রমণে ইউপিসি-র সশস্ত্র বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।
ক্যাপ্টেন তৌকির আহমেদ জানান, অভিযানের সময়ে স্নাইপার বহনকারী পাকিস্তান এভিয়েশন একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার পর্যবেক্ষণ ও ফায়ার সহায়তা দিয়েছিল। কিন্তু সেটি অভিযানের ৩০ মিনিটের মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হয়ে অপারেশন এলাকা থেকে ক্যাম্পে জরুরি অবতরণ করে।
প্রথম পর্ব পড়ুন> দুঃসাহসিক অপারেশন বেকপা-২
পরে ক্যাপ্টেন তৌকির আহমেদ ড্রোন এর মাধ্যমে আকাশ থেকে পর্যবেক্ষণ জারি রাখে, যা অভিযানের মাত্রাকে তরান্বিত করে। ফলে অভিযানে দলটি সঠিক সময়ে শত্রুর সঠিক অবস্থানে আঘাত হানতে সক্ষম হয়।

তিনি জানান, ওই সময় সন্ত্রাসীরা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়লে ব্যানএসএফ এর কমান্ডোরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে শত্রুর অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। যেখানে শত্রুর ফায়ার ও নিজস্ব ক্রস ফায়ার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
ক্যাপ্টেন তৌকির আহমেদ বলেন, সে সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সাধারণ জনগণ ও ইউপিসি বাহিনীকে আলাদা করা। তাদের ঘায়েল করা। যেটি অত্যন্ত জটিল কাজ ছিল।
মিক্সড ব্রিগেড যখন নির্ভীক কমান্ডোদের দখলে ঠিক তখনই ক্যাপ্টেন তৌকির আহমেদ ড্রোন এর মাধ্যমে পালিয়ে থাকা ইউপিসির সদস্যদের ওই এলাকার মসজিদে জড় হতে দেখেন।
সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি তিনি ট্যাকটিকাল কমান্ডার মেজর মোস্তফা আনোয়ারুল আজীজকে জানান। অপারেশন কমান্ডারের অনুমতি সাপেক্ষে ট্যাকটিকাল কমান্ডার নতুন লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু নতুন লক্ষ্যবস্তুটির চারদিকে অসংখ্য ইটের বাড়ি থাকায় অভিযান পরিচালনা দুরূহ হয়ে পড়ে বলে জানান ক্যাপ্টেন তৌকির। তিনি বলেন, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শত্রুপক্ষ তাদের চতুর্মুখী অবস্থানকে আরো শক্ত করতে থাকে। এই পরিস্থিতিতে অভিযানের গতি আরো তরান্বিত করতে কমান্ডারের আদেশক্রমে ৬০ মি.মি মর্টারের ৬টি গোলা ফায়ার করে ইউপিসি বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
দীর্ঘ ৮ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর সম্পূর্ণ এলাকা বাংলাদেশ স্পেশাল ফোর্সের নিয়ন্ত্রণে আসে। অভিযানের সময় সব আহত ও নিহত যোদ্ধাদের ইউপিসি বাহিনী বহন করে নিয়ে যায়, যা ইউএভি থেকে পরিলক্ষিত হয়।
অভিযান চলাকালীন সময়ে ১০০ জনেরও অধিক বন্দী সংকটাপন্ন জনগণকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ইউপিসি বাহিনীর বারুদাগার ধ্বংস হয় ও ৪ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে এফএসআই এর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এছাড়া, ব্যানএসএফ-৩ দলটি প্রবল সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে ইউপিসি বাহিনীর বিপুল পরিমাণ আরপিহি গোলা, অস্ত্র, ইউনিফর্ম, মোবাইল, ফোনসহ তাদের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র উদ্ধার করে; যা পরবর্তীতে অভিযানের আলামত হিসেবে টাস্কফোর্স বামবারির কাছে হস্তান্তর করে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসএম আজাদ এর নেতৃত্বে থাকা দলটি একের পর এক সফল অভিযানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে চলেছে।
উল্লেখ্য, বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পেশাগত দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, আর্ত মানবতার সেবায় রাখা অবদান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত প্রশংসনীয়; যা দেশ ও দেশের সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিকে আরো গৌরবোজ্জ্বল করে।
ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই