ঊর্ধ্বমুখী গরুর মাংসের বাজারও। এটি বিক্রি হচ্ছে ৭৮০ টাকায়; যা কয়েকদিন আগেও বিক্রি হয়েছে ৭৫০ টাকা। সবজিও হাতের নাগালের বাইরে। কেজি প্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ৭৭০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
অথচ মার্চের মাঝামাঝিতে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ২৯টি খাদ্যপণ্যের দাম বেঁধে দিয়েছিল সরকার। সেই হিসেবে ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ ১৪৫ টাকা ৭৮ পয়সা। উৎপাদক পর্যায়ে এর দাম ১৫১ টাকা ৮১ পয়সা, পাইকারি পর্যায়ে হবে ১৬২ টাকা ৬৯ পয়সা এবং খুচরা পর্যায়ে ১৭৫ টাকা ৩০ পয়সা। সেখানে একটি ডিমের খুচরা দাম নির্ধারণ করা হয় ১০ টাকা ৪৯ পয়সা। কিন্তু বর্তমনে সেই দামের কোনো চিহ্ন নেই বাজারে। শুধু ডিম আর মুরগিই নয়, অন্য অনেক পণ্যের অবস্থাও একই রকম।
.png)
কেন দাম বাড়তি তা জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট পাইকার ও ব্যবসায়ীর বলছেন, চাহিদার তুলনায় যোগান কম। এই জন্যই দাম বাড়ছে। আবার গরমে মুরগি মরতে শুরু করায় অনেক ছোট ছোট খামারা মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন।
আবার দাম বৃদ্ধিতে বড় করপোরেট কোম্পানিগগুলোর প্রতি অভিযোগ তুলে তারা বলেন, বর্তমানে বাজারে যে মুরগি ও ডিম পাওয়া যাচ্ছে তা সবই তাদের। তারাই একচেটিয়া দাম নির্ধারণ করে দাম বৃদ্ধি করছে।
এ অবস্থার প্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীরা আরো বলছেন, গত বছরের মার্চেও ব্রয়লার মুরগির দাম ৩৫০ টাকায় পৌঁছেছিল। তাই এখন থেকেই এই খাতে সরকাররে বিশেষ নজর দিতে হবে। নইলে এবার শুধু মুরগি নয়, ডিমের দামও আবারো আকাশ ছুঁতে পারে।
আজকের বাজার পরিস্থিতি-
রাজধানীর রায়ের বাজার, মধুবাজার ও মোহাম্মদপুর কাঁচা বাজারসহ পাড়া-মহাল্লার দোকান ঘুরে দেখা যায়, ফার্মের বাদামি রঙের ডিমের বিক্রি হচ্ছে ডজন প্রতি ১৪৫ টাকা, সাদা ডিম ১৪০ টাকা। একদিন আগেও বাদামি ডিম বিক্রি হয়েছে ১২৫ টাকায় এবং সাদা ডিম ১২০ টাকায়। আর প্রতি ডজন হাঁসের ডিম ২০০ টাকা ও দেশি মুরগির ডিম ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
লন্ড্রি ব্যবসায়ী হাফিজ জানান, তার বাড়ির ১০০ গজের মধ্যে থাকা দোকানগুলোতে একেক দামে ডিম বিক্রি হচ্ছে। কেউ ১৪০ টাকা ডজনে কেউ আবার ১৪৫-১৫০ টাকায় বিক্রি করছে। যা একদিন আগেও এর চেয়ে ১০ টাকা কম ছিল।
খুচরা বিক্রেতারা বলেন, পাইকারি বাজারে চাহিদা অনুসারে ডিম নেই। তাই পাইকারি বাজারেই দাম বেড়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই সেই ঢেউ এসে লেগেছে খুচরা বাজারে।
একই অবস্থা মুরগির বাজারেও। বেশ কিছুদিন ধরে ধারববাহিক ভাবে দাম বাড়ছেই। সোনালি মুরগির দাম প্রতি কেজি ৪০০ টাকা পেরিয়েছে, এখন বাজার ভেদে বিক্রি হচ্ছে ৪০০-৪১০ টাকায়। অথচ রোজার মধ্যেও সোনালি মুরগির দাম কেজি প্রতি ৩৫০ টাকার আশপাশে ছিল।
গত সপ্তাহে যে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ২১০-২২০ টাকায়, আজ বাজারে তার দাম ২৪০-২৪৫ টাকায়। লেয়ার মুরগির দাম গত সপ্তাহে ছিল ৩৩০-৩৫০ টাকা কেজি, যার বেড়ে ৩৬০ টাকায় পৌঁছেছে।
অথচ চলতি বছরের মার্চে সরকার পাইকারি পর্যায়ে ব্রয়লার মুরগির দাম ঠিক করে দিয়েছিল ১৬১ টাকা ৬৯ পয়সা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মূলত রাজধানীর কাপ্তান বাজার থেকেই জাতভেদে মুরগির দাম নির্ধারণ হয়। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় কম মুরগি থাকায় দাম উঠা-নামা করে। সেক্ষেত্রে দেখা যায় রাতের শুরুতে একদাম আবার শেষ রাতে দাম বেড়ে দাঁড়ায় আরেক দাম।
কাপ্তান বাজারের মুরগি পট্টির ব্যবসায়ী কাজী বুরহান বলেন, সব বড় বড় ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানের দখলে পাইকারি বাজার। এখানে কোনো ছোট খামারির মুরগি নেই। তারা যেই দাম ঠিক করে দিচ্ছে, সেই দামেই আমরা বিক্রি করছি। এখানে আমদের কোনো হাত নেই। বাজারে মুরগি কম থাকায় শেষ রাতে দাম বেড়ে যাচ্ছে। তবে সরবরাহ যদি বেশি থাকে অর্থাৎ প্রতি রাতে যদি মুরগি বোঝাই ৩০০ ট্রাক আসে, তাহলে দাম ঠিক থাকে।
তিনি বলেন, গত কয়েকদিন ধরে মুরগি কম আসছে, ফলে, মুরগির দাম বেশি হয়ে যাচ্ছে।
কাপ্তান বাজারের ডিম পট্টির ব্যবসায়ী বাদশা মিয়া বলেন, মুরগির দাম নির্ধারণের মতো ডিমেরে দাম নির্ধারণেও আমাদের হাত নেই। যারা ডিম দিয়ে যায়, তারাই দাম ঠিক করে দেয়। সেই দাম থেকে আমরা বিক্রি শুরু করি।
এক ব্যবসায়ী বললেন, গত বছর ডিমের দাম সর্বোচ্চ উঠেছিল ডজন প্রতি ১৭০-১৮০ টাকায়। এবার আবারো তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
এ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ পল্ট্রি শিল্প সমিতির সভাপতি সুমন হাওলাদার জানান, সরকার এদিকে মনোযোগ না দিলে এই দাম কোথায় ঠেকবে তার কোনো ঠিক নেই। ছোট খামারিরা যদি আবার কাজ শুরু করতে না পারে তাহলে সামনে আরো খারাপ অবস্থা হবে বাজারে। বড় ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করে দাম ঠিক করবে, এতে দাম শুধু বাড়বেই।
বেশি দামেই পেঁয়াজ ও আলু বিক্রি
ভারত রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। তার পরও দেশে পেঁয়াজের দাম তেমন কমেনি। পাইকারিতে একটু কমলেও আগের মতোই খুচরা বিক্রি হচ্ছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, আগের মতোই পাইকারিতে ৫৫-৬০ টাকা কেজি। সেই পেঁয়াজই বিভিন্ন বাজারে ৬৫-৭০ টাকা কেজি। মধু বাজারের খুচরা বিক্রেতা রফিক বলেন, পেঁয়াজের কেজি ৬৫-৭০ টাকা। তবে ভালোটার দাম একটু বেশি, ৭৫ টাকা কেজি।
অন্য খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, কমবে না পেঁয়াজের দাম। কারণ মৌসুম শেষ। বেপারিরা আস্তে আস্তে ছাড়বেন বাজারে।
সপ্তাহের ব্যবধানে আলুর দামও কমেনি। তবে বাড়েওনি। বর্তমানে ৫০-৫৫ টাকা কেজি। তবে আদা-রসুন কেজি প্রতি ১০-২০ টাকা বেড়ে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ২২০-২৩০ টাকা। যা আগের সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ২০০-২২০ টাকা। রসুনের দামও কেজি প্রতি ২০- ৩০ টাকা বেড়ে ২৩০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আগের সপ্তাহে ১৮০-২০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
ধান উঠলেও বেশি দাম চালের
দেশের বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধান উঠতে শুরু করেছে। তার পরও চালের দাম কমছে না। আগের মতোই প্রতি কেজি নাজিরশাইল মানভেদে ৭০-৮০ টাকা, মিনিকেট ৭২-৭৫, আটাশ চাল ৫৫-৬০ ও মোটা চাল ৪৮-৫২ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। পোলাওয়ের প্যাকেট চাল ১৭০-১৮০ টাকা কেজি ও বস্তার পোলাওয়ের চাল ১৪০-১৪৫ টাকা কেজি।
কমেনি ডাল-ছোলা ও ভোজ্য তেলের দাম
বিভিন্ন বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬৭ টাকা ও পাঁচ লিটার ৮১০-৮১৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আগের মতো ছোলাও ১১০ টাকা কেজি, বেসন ১২০, খোলা চিনি ১৪০, প্যাকেট চিনি ১৪৫, দুই কেজি আটা ১১০-১৩০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। মসলার দামও কমেনি।
৬০-৭০ টাকার নিচে মিলছে না সবজি
দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে কম দামে বিক্রি হলেও রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বেশি দামেই ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে সবজি। বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে বেগুন ৫০-৮০ টাকা। টমেটোর কেজি ৪০-৫০ টাকা, করলা ৬০-৭০, ঢ্যাঁড়স ৪০, শিম ৪০, পেঁপে ৪০-৫০, মিষ্টিকুমড়া ৩০-৪০, শসা ৪০-৬০, ঝিঙে ও ধুন্দুল ৬০, সজনে ডাঁটা ৮০-১২০, পটোল ৫০-৬০, গাজর ৫০, কাঁচামরিচ ১২০-১৪০, বরবটি ৫০ টাকা কেজি।
মাছের দরও বেড়েছে
টাউনহল বাজারের আবু তাহেরসহ অন্য বিক্রেতারা জানান, রুই ও কাতল ৩৫০-৫৫০ টাকা কেজি, চিংড়ি ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০, পাবদা ৫০০-৭০০, পাঙাশ ২০০, তেলাপিয়া ২৫০, শিং ও মাগুর ৪০০-৬০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।