শনিবার (২০ জুন) পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছে।
বহুল প্রতীক্ষিত উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছে ইরানের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডের পথে রয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসীম মুনির।
.png)
ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে দেশটির প্রতিনিধি দলটি এরই মধ্যে সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছে।
রোববার (২১ জুন) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এসব তথ্য জানায়।
এবারের বৈঠকে মূল আলোচনার টেবিলে স্থান পেতে যাচ্ছে যেসব বিষয়
দুই দেশের মধ্যে এই সরাসরি বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হলে, উভয় পক্ষের বহুল আলোচিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এটিই হবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার প্রথম আনুষ্ঠানিক মুখোমুখি আলোচনা। তবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল বিষয় এবারের বৈঠকে মূল আলোচনার টেবিলে স্থান পেতে যাচ্ছে।
আলজাজিরা জানায়, মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অংশ নেবেন পাকিস্তান ও কাতারের প্রতিনিধিরাও। দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখনো কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পর তা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকায় এই শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়েও নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিতে সুইজারল্যান্ড যাচ্ছেন ইরানি প্রতিনিধিরা
এদিকে বৈশ্বিক রাজনীতি ও বাণিজ্যের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে শনিবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান।
দেশটির সামরিক কমান্ডের কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এটি তেহরানের পক্ষ থেকে প্রথম পদক্ষেপ এবং এই আঞ্চলিক আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, তিনি শিগগিরই সুইজারল্যান্ডে ইরানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নিতে যেতে পারেন। ১৪ দফা চুক্তির ভিত্তিতে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ভ্যান্স। তবে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার স্পর্শকাতর বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু জানাননি।
লেবানন পরিস্থিতি
চলতি বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে উঠে আসতে পারে লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি। ইরান এর আগে বারবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েরলের সামরিক অভিযান ও বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই আলোচনাকে কোনোভাবেই এগিয়ে নিতে আগ্রহী নয়।
তেহরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের প্রতিনিধিদলের প্রধান অগ্রাধিকার হলো লেবানন প্রশ্ন। এই জ্বলন্ত ইস্যুতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হলে তারা আলোচনার পরবর্তী ধাপগুলো শুরু হয়েছে বলে মনে করছে না।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা
শনিবার (২০ জুন) ইরানের সামরিক নেতৃত্ব আকস্মিক ঘোষণা দেয় যে লেবানন পরিস্থিতির কারণে তারা বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। সম্প্রতি এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত কঠোরভাবে ইরানের এই নতুন দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং প্রণালির ওপর তেহরানের একক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।
সুইজারল্যান্ডে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকে চূড়ান্ত সমঝোতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরানের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা না হলে যুক্তরাষ্ট্র ওই কৌশলগত নৌপথে বিশেষ টোল বা ফি আরোপের বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল বজায় রাখার বিষয়টি বিশ্ব মধ্যস্থতাকারীদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।
পারমাণবিক কর্মসূচি
চলমান এই প্রাথমিক আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হলে পরবর্তী ধাপে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুইজারল্যান্ড যাত্রার আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, তিনি আশা করছেন এই সপ্তাহান্তের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পারমাণবিক ইস্যুতে কিছুটা হলেও ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হবে।
এর আগে প্রাথমিক সমঝোতার আওতায় ইরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। তবে দেশটির উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিদ্যমান মজুদ নিয়ে আসলে কী করা হবে, সে সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল। সেই সময়সীমা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদানের মজুদ ও তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিদ্ধান্তই অতীতে দুই পক্ষের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম বড় বাধা ছিল। তাই এই স্পর্শকাতর ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে একটি টেকসই সমঝোতা অর্জন করা মোটেও সহজ হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।