এরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে ঘোষণা করেন, “অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমি জানাচ্ছি যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের মিত্রদের নিয়ে লেবাননসহ সব অঞ্চলে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে এবং এটি এখনই কার্যকর হবে।” তিনি এই দূরদর্শী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে উভয় দেশের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে বিরোধ নিরসনের চূড়ান্ত আলোচনার জন্য ১০ এপ্রিল (শুক্রবার) উভয় দেশের প্রতিনিধিদলকে ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানান। শরিফ আশা প্রকাশ করেন যে, ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফল হবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করার আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান রাতভর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।
.png)
পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা
যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আজ রাতে পুরো সভ্যতা মারা যাবে, যা আর ফিরে আসবে না।” তবে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একমত হয়েছে মূলত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের দক্ষ কূটনীতির কারণে।
ইসলামাবাদ মার্চ মাসের শেষ থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ছিল। ২৯ মার্চ তারা তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠক করে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় দুই পক্ষই সম্মানজনক প্রস্থানের পথ খুঁজছিল—এমন সময় পাকিস্তান নেপথ্য আলোচনার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফার প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দেয় এবং ইরানের জবাব ওয়াশিংটনকে জানায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেন ইসলামাবাদকে বিশ্বাস করে
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সফল হতে হলে উভয় পক্ষের আস্থা অপরিহার্য। আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পর্কের কারণে ইরান তাদের আর বিশ্বাস করতে পারছে না। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান—যা আরাগচির ‘প্রিয় ভাই’ সম্বোধনেই স্পষ্ট।
এ ছাড়া ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা ইরানের আস্থা অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও গত এক বছরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। ইসলামাবাদ ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিয়েছে, যা গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। ট্রাম্প আসিম মুনিরকে ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলে অভিহিত করেছেন। মুনিরের সঙ্গে মার্কিন ও ইরানি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের গভীর যোগাযোগ থাকায় পাকিস্তান এই আলোচনায় বাড়তি সুবিধা পেয়েছে।
পাকিস্তানের কেন এ যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন
পাকিস্তানের এই আগ্রহ শুধু ভূরাজনৈতিক নয়, বরং জীবন-মরণের প্রশ্ন। দেশটির অধিকাংশ তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। এ ছাড়া বহু পাকিস্তানি মধ্যপ্রাচ্যের দেশে কর্মরত থেকে রেমিট্যান্স পাঠান। যুদ্ধ এবং ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় শাহবাজ সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়।
বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট, আফগানিস্তানের সঙ্গে বিরোধ, ভারতের সঙ্গে উত্তপ্ত সম্পর্ক—এর মধ্যে প্রতিবেশী ইরানের অস্থিরতা পাকিস্তানের জন্য মোটেও সুখকর নয়। দেশের অভ্যন্তরেও স্থিতিশীলতার সংকট রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবরে পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয় এবং কয়েকজন প্রাণ হারান।
কেন এখনই উদ্যাপনের সময় আসেনি
দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি এখনো অত্যন্ত নড়বড়ে। আলোচনা যদি ভেস্তে যায়, তাহলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দুই পক্ষের যেকোনো একটি ইসলামাবাদকে দায়ী করতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, পাকিস্তান এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার মতো শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক শক্তি নয়। যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে পাকিস্তান উভয়সংকটে পড়বে—যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকলে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়বে, আর ইরানকে সমর্থন দিলে ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় বন্ধুদের হারাবে।
তবে বর্তমানে এই সফল মধ্যস্থতা পাকিস্তানের কূটনীতির জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।