নেয়ার ইস্ট সাউথ এশিয়া সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোচেস সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেছেন, সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের এত দ্রুত সফল হওয়ার মূল কারণ আসাদের সেনাবাহিনীর মনোবল হারানো ও নেতৃত্বের অভাব।
২০১৪ সাল থেকে ইরান ও রাশিয়ার সেনারা মূলত আসাদের সেনাদের পাশে রক্ষাকবজ হয়ে ছিল। সিরিয়ার সেনাবাহিনীর খুঁটির জোর ছিল মূলত তারাই। ২০১১ সাল থেকে সিরিয়ায় যে গৃহযুদ্ধ চলছিল, তার নেতৃত্বে ছিল ইরান। এ ছাড়া রাশিয়ার বিমান বাহিনীরও সেখানে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়েছে।
.png)
অধ্যাপক ডেভিড ডেস রোচেস বলেন, রাশিয়া যখন বিমান বাহিনী সরিয়ে নিল এবং ইরানের যোদ্ধারাও নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়ল, তখন স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল, নেতৃত্বহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ল আসাদের সেনাবাহিনী। বাশার আল আসাদের দুর্গ ভেঙে ফেলতে বিদ্রোহীরা এই সুযোগ কাজে লাগাবেন, এটাই তো স্বাভাবিক।
সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা প্রতিরোধ কর্মসূচির সিনিয়র ফেলো ও পরিচালক চার্লস লিস্টার বলেছেন, সিরিয়ার ওপর থেকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মনোযোগ সরে গেছে। সিরিয়াকেন্দ্রীক আরববিশ্বের কূটনীতিও শেষ হয়ে গেছে। বিশ্বের অন্যান্য চ্যালেঞ্জগুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তাদের কাছে। আর এই সব কিছুর সুযোগে বিদ্রোহীরা শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ পেয়েছে সিরিয়ায়।
ফরেন পলিসি সাময়িকীতে লেখা এক প্রবন্ধে তিনি আরো বলেছেন, সিরিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আর মাথা ঘামাতে চায় না বলেই মনে হচ্ছে। তারা সিরিয়ার দায়িত্ব আরব বিশ্বের আঞ্চলিক নেতাদের হাতেই ছেড়ে দিতে আগ্রহী।
চার্লস লিস্টারের কথার প্রতিধ্বণি শোনা গেল স্বয়ং ট্রাম্পের মুখেও। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত এই প্রেসিডেন্ট গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, সিরিয়া একটি বিশৃঙ্খল রাষ্ট্র। তারা আমাদের বন্ধু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে কিছু করার নেই। যুদ্ধটা আমাদের নয়। তাদের খেলা তারাই খেলুক। আমরা এতে জড়িত হব না।
যদিও সিরিয়ায় এখনো অন্তত ৯০০ মার্কিন সেনা রয়েছে। তারা সিরিয়ার উত্তর পূর্বাঞ্চলে আইএস যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সিরিয়ার কুর্দি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে যুদ্ধ করছে। কিন্তু ট্রাম্পের গতকালের মন্তব্য প্রকৃতপক্ষে সিরিয়ায় মার্কিন উপস্থিতির বিপক্ষেই যায়।
ট্রাম্প অবশ্য তার প্রথম মেয়াদের প্রেসিডেন্টের সময়ে, ২০১৮ সালে বলেছিলেন, তিনি সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে চান। কারণ সেখানে আইএস যোদ্ধাদের উপস্থিতি আর নেই বললেই চলে।
সিরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই একটি ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির লাভার ওপর ছিল। যেকোনো সময় বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল সেই লাভার জ্বালামুখ। কিন্তু স্বৈরশাসক বাশার তা উপলব্ধি করতে পারেননি। তার ধারণা ছিল, তিনি আপন শক্তিতে বলিয়ান আছেন।
বছরের পর বছর ধরে সিরিয়ার অর্থনীতি বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। ২০২০ সালে দেশটিতে ১ মার্কিন ডলার কিনতে ১ হাজার ১৫০ সিরিয়ান পাউন্ড ব্যয় করতে হতো। গত ৪ ডিসেম্বর সেটি বেড়ে ১৭ হাজার ৫০০ সিরিয়ান পাউন্ডে পৌঁছেছে। মূল্যস্ফীতি কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে, তা কল্পনাও করা কঠিন।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সিমাহীন মূল্যস্ফীতি সিরিয়ার মানুষকে ভয়ানকভাবে বিক্ষুব্ধ করেছে। এ ছাড়া মানবিক সঙ্কটও বেড়েছে সিরিয়ায়। জাতিসংঘ বলছে, ৯০ শতাংশেরও বেশি সিরীয় দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ভয়াবহ টান পড়ায় সম্প্রতি জ্বালানি ও খাদ্যের ওপর থেকেও ভর্তুকি তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিল আসাদ সরকার। এতে সাধারণ মানুষ পড়েছে আরো বিপাকে।
রাষ্ট্রীয় এই দেউলিয়াত্ব থেকে আসাদকে উদ্ধার করার জন্য কেউ পাশে ছিল না। ইউক্রেন যুদ্ধ সামলাতে গিয়ে রাশিয়া নিজেই বিপদে আছে। বন্ধু পুতিন তাই আসাদকে খুব বেশি সহায়তা দিতে পারছিলেন না। আবার ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে ইরানও নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার পক্ষেও আসাদের দিকে খুব বেশি নজর দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না।
এই সবকিছু মিলিয়ে একেবারে খাদের কিনারে পৌঁছে গিয়েছিলেন বাশার আল–আসাদ। তার পতন শুধু সময়ের ব্যাপার ছিল মাত্র। ফলে মাত্র ১২ দিনেই তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে আসাদ পরিবারের ৫৪ বছরের দুঃশাসনের দুর্গ।