ফিলিস্তিনের ছোট্ট একটি অবরুদ্ধ ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলায় সন্তান হারিয়ে প্রতি মুহুর্তে ‘হাতের মুঠোয় জীবন’ নিয়ে আতঙ্কে সময় পার করছেন ফিলিস্তিনি মায়েরা। অভুক্ত পেটে, স্বামী-সন্তান আত্মীয়স্বজন হারানোর অব্যক্ত কষ্ট বুকে নিয়ে ইসরায়েলের হামলার মাঝেই দিন পার করছেন অসহায় এই মায়েরা। গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি মায়েরা কি পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তা তাদের না দেখলে বুঝা দায়।
মা দিবস গাজা উপত্যকার ৩৩ বছর বয়সী মা আলা আল-কাতরাভির জন্য একদমই ভিন্ন অনুভূতি। চার সন্তান কারমেল, অর্কিড, কেনান ও ইয়ামিনকে হারিয়ে আলার সঙ্গী হয়েছে কান্না। আরবি সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী আলা যুদ্ধের সময় গত ডিসেম্বরে তার স্বামী মুসা কান্দিল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এর পর স্বামী-সন্তানরা যে বাড়িতে ছিল, সেখানে ইসরায়েলি সৈন্যরা হামলা চালায়। আলার সন্তানরা ফোনে বলেছিল, ‘মা, আমাদের বাঁচাও, এখান থেকে বের করার চেষ্টা করো।’ আলা অসহায় বোধ করছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তারা আমার কাছে সাহায্য চাইছিল; কিন্তু আমি কিছুই করতে পারিনি। যখন তাদের সেই কাতর কণ্ঠস্বর মনে পড়ে, মরে যেতে ইচ্ছে হয়।’ চার সন্তানকে হারিয়ে তখন থেকে কান্নাই সঙ্গী আলার।
.png)
উম মোহাম্মদ সাবিহা মধ্য গাজা থেকে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন রাফাহ শহরে। তিনি বলেন, ইসরায়েলি আগ্রাসনে আমরা যে কঠিন পরিস্থিতিতে বাস করছি, তাতে আমি দুঃখিত একজন মা। আমার মনে আছে, আমাদের বাড়িতে মা দিবস উদযাপনের সুন্দর অনেক স্মৃতি রয়েছে।
তিনি জানান, ওই দিনটিতে তার সন্তানরা উপহার নিয়ে আসত; কিন্তু আজ এক দুঃখের দিন। সন্তানদের বাঁচাতে তারা রাফাতে এসেছেন। আবার এখান থেকেও পালাচ্ছেন।
গত বছরের সাত অক্টোবর থেকে অবরুদ্ধ ভূখণ্ড গাজাতে ইসরায়েলি হামলায় ৩৪ হাজার ৯৭১ জনের মৃত্যু হয়েছে যাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু। মায়ের কোল ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে হাজার হাজার শিশু। এই হামলার ফলে অসংখ্য মা তাদের সন্তানদের হারিয়েছে, আবার হাজারও শিশু মা ও পরিবারকে হারিয়ে অনাথ হয়ে পড়েছে।
৫৫ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি মা হানা আবু জাবাল। যুদ্ধে আট সন্তানের মধ্যে এক শিশু সন্তান হারিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, মায়ের জন্য সন্তান হারানো মানে তার আত্মা হারানো।
জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর তার পরিবার রাফাতে তাঁবুতে থাকতে শুরু করে। তিনি বলেন, আমরা খুব কঠিন পরিস্থিতিতে বাস করছি। পানি নেই, খাবার নেই, কাপড় নেই। এর মধ্যেও আমরা গণহত্যার হুমকির সম্মুখীন হচ্ছি।
ফিলিস্তিনি মায়েদের দুর্দশা ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়। বেশীরভাগ নারীই তাদের প্রিয়জন ছাড়া জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়েছেন। শহরজুড়ে খাদ্য সংকট, দুর্ভিক্ষ। কোথাও কোনো খাবার নেই। মাঝে মাঝে ত্রাণের গাড়ি আসলেও ধারেকাছে ঘেষতে পারছেন না নারীরা। যুদ্ধের মধ্যে এ আরেক যুদ্ধ।
৭০ বছর বয়সী নাজাহ আল-আক্কাদ বলেন, আমার ছেলে আমাকে তিন নাতি-নাতনিসহ রেখে গেছে। ইসরায়েলি হামলায় আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছি এবং এখন আমার তিন নাতি-নাতনি বাকি আছে।
আল-আক্কাদ তার নাতি-নাতনিদের সাথে বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছেন, উল্লেখ করেছেন যে তাদের পানি, ওষুধ এবং খাবার খুঁজে পেতে কি পরিমাণ কষ্ট ও চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।
সেখানে খাবার নেই, পানি নেই। বাজারেও পর্যাপ্ত খাবার নেই, কিছু কিছু দোকানে থাকলেও, আকাশচুম্বী দাম। বিশেষ করে গাজাতে নবজাতকদের দুধের হাহাকার সবচেয়ে বেশি। তাঁবুতে দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম আর রাতের বেলা প্রচণ্ড ঠান্ডা। এ যেনো মায়েদের সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার এক যুদ্ধ।
ফিলিস্তিনি মায়েরা জানেন না কোনোদিন তারা জন্মভিটায় ফিরে যেতে পারবেন কি না। সন্তান হারানো মায়েরা জানেন না কীভাবে নিজেদের সামলাবেন তারা। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি মা কঠিন সময় পার করছেন ধ্বংসস্তূপের মাঝে।