ঢাকা,  শনিবার   ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

গলিতে পা ফেলতেই দালাল

দেলোয়ার হোসেন, জামালপুর
প্রকাশিত: ২২:০৯, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯
গলিতে পা ফেলতেই দালাল
ফাইল ছবি

জামালপুর শহরের পশ্চিম কাচারী পাড়ায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস। জেলার হাজার হাজার যুবক, বৃদ্ধ, ভ্রমণ পিপাসুদের স্বপ্নের বিদেশ যাত্রার প্রথম ধাপ এটি। তবে সেই পাসপোর্ট অফিসে পা ফেললে দালাল চক্রই যেন ভরসা। অফিসে দালালদের দৌরাত্মের পরিমাণ এতই বেড়েছে যে, দালালদের আখড়া বলে হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন ভুক্তভোগীরা। এছাড়া সেই দালালদের দৌরাত্মে সহযোগিতায় নেমেছে অফিসে কর্মরত আনসার সদস্যরা। 

আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ঢোকা মাত্রই শিকার ধরতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দালালরা। পাসপোর্ট করতে আসা লোকদের দেখলে ছুঁ মেরে ধরতে চায় তারা। তাদের নিয়ে চলে দালালদের টানাটানি। পাসপোর্ট করতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে মানুষরা। 

পাসর্পোট অফিসের গলিতে পা ফেলতেই দালালরা ঘিরে ধরে। তারা জানতে চায়, ভাই পাসর্পোট করবেন? নর্মাল না ইমারজেন্সি? এসব কথার উত্তর না দিয়ে গলিতে ঢুকতেই ঘিরে ধরে আরেক দালাল চক্র। তাদের একই প্রশ্ন। অযাচিত এসব প্রশ্নের উত্তর না দিলে কোনো কোনো দালাল বলে উঠে, যেখানেই যান আমাদের ছাড়া কাজ হবে না। আপনি করলে যে কাজ দেরিতে হবে, আমরা করলে সে কাজ দ্রুত হবে। পুলিশ ভেরিফিকেশনেরও দায়িত্ব আমাদের। বিনিময়ে গুনতে হবে অতিরিক্ত টাকা। 

নরমাল পাসপোর্টের জন্য কত দিতে হবে?  উত্তরে দালাল চক্রের সদস্য বাদশা মিয়া বলেন, অফিসের খরচাপাতি মিলিয়ে পাঁচ হাজার দিলেই হবে। সরকারের নির্ধারিত নরমাল পাসর্পোটের ফি তিন হাজার ৪৫০ টাকার কথা বলতেই তিনি বলে উঠেন ছোট মিয়া, বড় মিয়া, সব মিয়াকেই দিতে হবে, এর কমে হবে না। ইমার্জেন্সি পাসর্পোট করতে কত লাগবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নয় হাজার টাকা। অথচ সরকারি ফি ছয় হাজার ৯০০ টাকা। একটু এগিয়ে গেলে অফিসের গেইটে পড়তে হয় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের খপ্পরে। সেখানে পাসর্পোট সেবা প্রার্থীদের নিয়ে চলে টানাহেঁচড়া। প্রতি পাসর্পোটে আনসার সদস্য ১০০ টাকা, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ২০০ টাকা, বায়োমেট্রিক অপারেটর ২০০ টাকা ও সিল স্বাক্ষরে ৫০০ টাকা অফিস খরচ দিতে হয় বলে জানান কয়েকজন দালাল। 

এ দালাল চক্রের মূল হোতা মতি মিয়া। অফিসের সামনেই তার দোকান রয়েছে। দোকানটি এখন ছায়া পাসপোর্ট অফিস। মতি মিয়ার দারস্থ হলে পাসর্পোটের আবেদন ফরম থেকে শুরু করে সব সেবা মেলে। মতি মিয়ার নেটওয়ার্কে রয়েছে আব্দুল্লাহ, বাদশা, রানা, রিপন-১, রিপন-২, শফিকুল, শাহাবুদ্দি, সুমন, রুবেল, আল-আমিন আরমানসহ প্রায় অর্ধশত দালাল। এর আগে মতি মিয়া ঢাকার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের দালাল ছিল। তিনি দালালদের নাটের গুরু সেজে বনে গেছেন কোটিপতি। এর আগে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে মতি মিয়াকে গ্রেফতার করেছিল। জেল থেকে বের হয়ে ফের পুরনো কায়দায় দালাল চক্রের নেটওর্য়াক চালু রেখেছেন তিনি। চক্রটি স্থানীয় বিধায় পাসর্পোট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অসহায়। নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মধ্যে কাটে সবসময়। এরইমধ্যে দালালদের হামলার শিকার হন রফিকুল ইসলাম ও বেলাল হোসেন নামে দুই সহকারী পরিচালক। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছে দালাল চক্রটি। একাধিকবার পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে দালালরা গ্রেফতার হলেও দালাল মুক্ত হয়নি জামালপুর আঞ্চলিক পাসর্পোট অফিস।

শহরের বটতলার আব্দুল আলীম জানান, এখানে দালালদের উৎপাত দীর্ঘদিনের। এ অফিসের কতিপয় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তারা এসব কাজ করছে।

দক্ষিণ কাচারীপাড়ার খালেক জানান, তিনি পাসপোর্ট করতে গিয়ে দালালদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হন। পরে অফিসে অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার পাননি। অফিসটি দালালদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। 

দয়াময়ী রোড়ের মানিক জানান, পাসপোর্ট অফিসের সরাসরি গেলে কর্মকর্তারা নানা টালবাহানা করেন। পাসপোর্ট দিতে দেরি করেন। অথচ যারা দালালের দারস্থ হচ্ছে, তারা কম সময়ের মধ্যেই তাদের পাসপোর্ট হাতে পেয়ে যাচ্ছে।

জামালপুর আঞ্চলিক পাসর্পোট অফিসের সহকারী পরিচালক নাজমুল আহসান হাবীব বলেন, র্দীঘদিন ধরে স্থানীয়রা দালালি কাজে জড়িত। দালাল মুক্ত করতে হলে, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশসহ সবার একযোগে কাজ করতে হবে। অফিসটি নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হলে অবস্থার উত্তরণ ঘটবে বলে আশাবাদী। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ

ডেইলি-বাংলাদেশ/ডটকম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!