ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]
চার শিক্ষার্থীর উদ্যোগ ‘বুনন বাজার’

শীতলপাটি থেকে স্যান্ডেল

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭:৫৩, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শীতলপাটি থেকে স্যান্ডেল
চার শিক্ষার্থীর কাছে শীতলপাটি শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী উপকরণ নয়। তাঁদের উদ্যোগে এটি হয়ে উঠছে নতুন পণ্য তৈরির সম্ভাবনা। পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন ব্যবহার ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেই সেটিকে টিকিয়ে রাখার পথ খুঁজছেন তাঁরা।

ছোটবেলায় টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়িতে মূর্তা বা বেতিগাছের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল অপূর্ব কৃষ্ণ দের। সেই গাছের কাঁচামাল দিয়ে তৈরি শীতলপাটি এবং এর সঙ্গে জড়িত কারিগরদের কাজও কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। তবে ছোটবেলার পরিচিত শীতলপাটি একদিন যে নতুন স্বপ্নের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে, তা হয়তো ভাবেননি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অপূর্ব কৃষ্ণ দে। 

সময়ের সঙ্গে শীতলপাটির ব্যবহার কমে আসায় কারিগরদের আয়েও এর প্রভাব পড়েছে। তখন অপূর্বের মনে প্রশ্ন জাগে, শীতলপাটিকে শুধু মাদুর হিসেবে ব্যবহার না করে যদি নিত্যব্যবহার্য অন্য কোনো পণ্য তৈরি করা যায়, তাহলে কেমন হয়।

Advertisement

সেই ভাবনা থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর উদ্যোগ ‘বুনন বাজার’। দলের সদস্য অপূর্ব কৃষ্ণ দে ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী। তাঁর সঙ্গে আছেন ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের আবির দে, মো. আশিক মিয়া ও চৌধুরী খুবাইব বিন করিম। চার শিক্ষার্থী শীতলপাটিকে নতুনভাবে নকশা করে তৈরি করছেন স্যান্ডেল।

শুরুটা ছিল একটি ধারণা দিয়ে। পরে বিভিন্ন পিচিং ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়ে ধারণাটিকে ধীরে ধীরে বাস্তব ব্যবসার রূপ দিতে থাকেন তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও এ ক্ষেত্রে কাজে এসেছে। 

এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট কোর্সের ব্যবহারিক অংশে তাঁরা ‘বুনন বাজার’ নিয়েই কাজ করেন। ক্রেতার চাহিদা, বাজারের সম্ভাবনা, প্রতিযোগিতা, ব্যবসায়িক মডেল, বিপণন, পরিচালনা, আর্থিক সম্ভাব্যতা ও ঝুঁকি—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনাটি এগিয়ে নেন।

বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পাওয়া মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে ধারণাটিকে আরও পরিণত করেন তাঁরা। এরপর দ্য আর্থ সোসাইটি ও নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় গ্রিন ভয়েস মাস্টার বুটক্যাম্প থেকে এক লাখ টাকা তহবিল পেয়ে শুরু হয় পণ্য তৈরির কাজ।

শীতলপাটিকে স্যান্ডেলে রূপ দেওয়া অবশ্য সহজ ছিল না। প্রথম দিকে বুননের ধরন, আকার, কাটিং, স্ট্র্যাপের অবস্থান এবং সোলের সঙ্গে পাটি যুক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে নানা পরীক্ষা চালাতে হয়েছে। সাধারণ শীতলপাটি ব্যবহার না করে স্যান্ডেল তৈরির উপযোগী করে বিশেষভাবে পাটি তৈরি করেছেন তাঁরা।

সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা করতে হয়েছে শীতলপাটির পরিমাপ, শেপ, ডিজাইন ও সাইজিং নিয়ে। পাটির নিজস্ব বুনন ও টেক্সচার ঠিক রেখে সেটিকে পায়ের আকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলেছে একাধিক ধাপে। প্রথম তৈরি স্যান্ডেলটি চূড়ান্ত হয়নি। 
ব্যবহারিক পরীক্ষা ও ক্রেতাদের মতামতের ভিত্তিতে পরিবর্তন আনতে আনতে বর্তমান নকশায় পৌঁছেছেন চার শিক্ষার্থী।

এখন ‘বুনন বাজারের’ শীতলপাটির স্যান্ডেল বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ টাকায়। পণ্য তৈরির পাশাপাশি বাজার যাচাইয়ের কাজও চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতায় ‘বুনন বাজার’ প্রথম রানারআপ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট ক্লাব আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নিয়েছে সেরা আটে। সেখানে আকিজ রিসোর্সেসের পৃষ্ঠপোষকতায় চার শিক্ষার্থীই পেয়েছেন ইন্টার্নশিপের সুযোগ। বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারেও তাঁদের উদ্যোগ প্রদর্শিত হয়েছে।

এই উদ্যোগের পথে অর্থায়নের পাশাপাশি দ্য আর্থ সোসাইটির মেন্টরশিপ ও ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখন তাঁদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পণ্যের মান ঠিক রেখে উৎপাদন খরচ কমানো, মান আরও উন্নত করা এবং পণ্যকে আরও বেশি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়া।

তবে তাঁদের পরিকল্পনা শুধু স্যান্ডেল তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। শীতলপাটি দিয়ে ব্যাগ, ঘর সাজানোর উপকরণসহ আরও নানা ধরনের পণ্য তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে আরও মানুষকে যুক্ত করে প্রশিক্ষিত কারিগরদের একটি দল গড়ে তোলার পাশাপাশি ক্লাস্টারভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা তৈরির কথাও ভাবছেন তাঁরা।

চার শিক্ষার্থীর কাছে শীতলপাটি শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী উপকরণ নয়। তাঁদের উদ্যোগে এটি হয়ে উঠছে নতুন পণ্য তৈরির সম্ভাবনা। পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন ব্যবহার ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেই সেটিকে টিকিয়ে রাখার পথ খুঁজছেন তাঁরা।

সৌজন্য : পাবলিকিয়ান

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!