ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]
আজ বিশ্ব গন্ডার দিবস

গণ্ডারের চামড়া প্রকৃতির আশ্চর্য প্রতিরক্ষা-কবচ

আবইয়াদ আহনাফ
প্রকাশিত: ১১:০১, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গণ্ডারের চামড়া প্রকৃতির আশ্চর্য প্রতিরক্ষা-কবচ
গণ্ডার সব তৃণভোজী, কিন্তু তাদের খাদ্য তাদের আবাসস্থলের উপর নির্ভর করে: সুমাত্রান এবং জাভান গন্ডার কিছু ফল সহ গ্রীষ্মমন্ডলীয় গাছপালা খায়,যখন কালো গণ্ডারগুলি প্রধানত ব্রাউজার যেগুলি ভেষজ এবং গুল্মগুলি খায়, এবং ভারতীয় গন্ডারগুলি ঘাস এবং জলজ উদ্ভিদ উভয়ই খ

গালাগালি বা অপমানের কথাবার্তা যার গায়ে লাগে না, তার ক্ষেত্রে 'গন্ডারের চামড়া' উপাধিটি দেয়া হয়। গন্ডারের চামড়া যেমন সহজে তির বা বর্শায় বিদ্ধ হয় না, তেমনি কিছু মানুষ কিছুতেই অপমান বোধ করে না বলে সমাজে প্রচলিত আছে। সমাজের এমন অবস্থা তীব্র হলে প্রচলিত কথাটিই সত্যি হবে যে- জঙ্গলের গন্ডারের সংখ্যা কমলেও লোকালয়ে এদের (গন্ডারের চামড়াধারীদের) সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে!

কেন এই উপাধি- কারণ, গন্ডারের চামড়া অনেক মোটা হয়। পুরু হয় দুই ইঞ্চি পর্যন্ত। একসময় বলা হতো, গন্ডারের চামড়া ভেদ করে বন্দুকের গুলিও ঢুকতে পারে না! সে যা–ই হোক, কোনো কোনো মানুষের আচরণের ক্ষেত্রে গন্ডারের চামড়ার সাদ্রশ্যতা আছে বলেই কথাটির প্রয়োগ বা প্রচলন আছে। 

Advertisement

আজ ২২ শে সেপ্টেম্বর, বিশ্ব গন্ডার দিবস (World Rhino Day)। প্রতিবছর এই দিনটি বিশ্ব গন্ডার দিবস রূপে পালন করা হয়। ২০১০ সালে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড সাউথ আফ্রিকা দিনটিকে বিশ্ব গন্ডার দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে প্রতিবছরই এদিন বিশ্বব্যাপী নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী গন্ডার শিকার রোধ, গন্ডার ও গন্ডারের বাসভূমি সংরক্ষণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে এই দিবস পালন করা হয়। ২০১০ সালে প্রথমবার পালন করা হয় বিশ্ব গন্ডার দিবস।

  • দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সেমিনার, আলোচনা, চিত্র প্রদর্শনী, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও গন্ডার সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সব বন্য প্রাণীর মধ্যে গন্ডার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। বিশ্বজুড়ে পাঁচ ধরনের গন্ডার দেখা যায়। এর মধ্যে আফ্রিকায় পাওয়া যায়া সাদা ও কালো গন্ডার, একশৃঙ্গ, জাভা ও সুমাত্রায় প্রজাতির গন্ডার পাওয়া যায় এশিয়ায়। এসব বিপন্ন প্রজাতির গন্ডার বাঁচানোর জন্য এই দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

জানেন নাকি- গণ্ডারের চামড়া এত পুরু কেন? 
গণ্ডারের চামড়া প্রকৃতির এক আশ্চর্য প্রতিরক্ষা-কবচ। গণ্ডার পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী ও প্রাচীন প্রাণী। তার বিশাল দেহের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—অস্বাভাবিক পুরু চামড়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গণ্ডারের চামড়া এত পুরু হওয়ার পেছনে প্রকৃতির কী যুক্তি আছে?

🔹 শিকারির আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা
প্রাচীনকাল থেকে গণ্ডারের প্রধান শত্রু ছিল সিংহ, বাঘের মতো ভয়ংকর শিকারি। তাদের ধারালো দাঁত ও নখের আঘাত প্রতিরোধ করতেই গণ্ডারের চামড়া ধীরে ধীরে পুরু ও শক্ত হয়ে উঠেছে। অনেক জায়গায় এই চামড়ার পুরুত্ব ২–৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

🔹 নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ের সময় সুরক্ষা
গণ্ডাররা এলাকা দখল বা সঙ্গীর জন্য নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষে জড়ায়। সেই সময় শিং ও শরীরের আঘাত থেকে রক্ষা পেতে পুরু চামড়া বড় ভূমিকা নেয়।

🔹 কাঁটাযুক্ত ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চলে চলাফেরার সুবিধা
ঘন জঙ্গল, কাঁটা ও ধারালো ডালপালার মধ্যে চলাফেরা করার সময় শরীর যেন ক্ষতবিক্ষত না হয়—সে জন্যও এই শক্ত চামড়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

🔹 সূর্যের তাপ ও পোকামাকড়ের হাত থেকে সুরক্ষা
গণ্ডারের চামড়া সূর্যের তীব্র তাপ সহ্য করতে পারে এবং মশা, টিক, জোঁকের মতো পোকামাকড়ের কামড়ের প্রভাব তুলনামূলক কম হয়।

🔹 কাদা-মাখা জীবনযাপনের সুবিধা
গণ্ডার কাদায় গা মাখতে ভালোবাসে। এতে শরীর ঠান্ডা থাকে ও পোকামাকড় দূরে থাকে। পুরু চামড়া কাদা ধরে রাখতে সাহায্য করে, যা এক ধরনের প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন হিসেবেও কাজ করে।

গন্ডারের চামড়া সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা
অনেকে মনে করেন গণ্ডারের চামড়া নাকি বুলেটপ্রুফ। বাস্তবে তা নয়। চামড়া খুব পুরু হলেও গুলি ঠেকাতে সক্ষম নয়। তবে গণ্ডারের পুরু চামড়া কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়—এটা লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তন, পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন ও বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ফল।

 

এক সময় আমাদের দেশের ব্যাপক এলাকা জুড়ে গন্ডারের আবাস ছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে ও তাদের আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বৃটিশ শাসনামলেই এই দেশ থেকে গন্ডার বিলুপ্ত হয়।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়, চোরাশিকার এবং নানা কারণে গন্ডারের প্রাণ সংশয় হয়ে থাকে এই কারণে তাদের প্রজাতি ধীরে ধীরে অবলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে তাই তাদের সংরক্ষণ সঠিকভাবে না করলে ভবিষ্যতে হয়তো গন্ডার প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। 

এই কারণেই তাদের সংরক্ষণ করার জন্য মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্ব গন্ডার দিবস নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে পালিত হয়। 

এরই মধ্যে আগের চেয়ে গন্ডারের সংখ্যা এখন অনেকটাই বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই সংরক্ষণ এবং সচেতনতার মাধ্যমে গন্ডার প্রজাতিকে রক্ষা করা যাবে বলেই মনে করা হয়। 

গন্ডার পরিচিতি :

বাংলা নাম গণ্ডার। ইংরেজি: Rhinoceros বা Rhino। এক প্রকার স্তন্যপায়ী প্রাণী। এটি রাইনোসেরোটিডি পরিবারের অন্তর্গত। 

প্রাপ্তিস্থান: পৃথিবীজুড়ে গণ্ডারের মাত্র পাঁচটি প্রজাতি পাওয়া যায়। এর তিনটি প্রজাতি রয়েছে ভারত, নেপাল ও মালয় অঞ্চলে। বাকি দুটি প্রজাতি রয়েছে আফ্রিকায়। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি গণ্ডার আছে আফ্রিকায়।গণ্ডার পাওয়া যায় উত্তর-পূর্ব ভারতে এবং নেপালের তেরাই সংরক্ষিত বনে। এ ছাড়া পাকিস্তান ও মিয়ানমার সীমান্তেও এদের দেখতে পাওয়া যায়। 

একসময় বাংলাদেশে গণ্ডার পাওয়া যেত। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে এটি একটি বিলুপ্ত প্রাণী।  বাংলাদেশের উত্তরে তিস্তা অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তিন প্রজাতির গন্ডারের বসতি।

প্রজাতিসমূহ : গণ্ডারের ৫টি প্রজাতি হচ্ছে-
- ভারতীয় গণ্ডার
- জাভাদেশীয় গণ্ডার
- সুমাত্রার গণ্ডার
- সাদা গণ্ডার
- কালো গণ্ডার

দৈহিক গঠন : গণ্ডার বিশালদেহী। এদের প্রজাতিভেদে আকার-আকৃতিতে পার্থক্য দেখা যায়। আকৃতির দিক থেকে আফ্রিকার সাদা গণ্ডারই বৃহত্তম। অন্যদিকে সবচেয়ে ছোট গণ্ডার প্রজাতি হলো জাভাদেশীয় গণ্ডার।

প্রজনন : প্রজননকালে একাধিক পুরুষ গণ্ডার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এরপর জয়ী গণ্ডার দীর্ঘ প্রেম নিবেদনের পর স্ত্রী গণ্ডারের সঙ্গে মিলিত হয়। ১৫ থেকে ১৮ মাস গর্ভধারণের পর একটি বাচ্চা প্রসব করে। জন্মের সময় বাচ্চার ওজন থাকে ৪০ থেকে ৬৪ কেজি। প্রায় আড়াই থেকে তিন বছরকাল গণ্ডারশাবক তার মায়ের সঙ্গে থাকে।

স্বভাব : এরা অত্যন্ত বদরাগী ও একগুঁয়ে স্বভাবের। এদের দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত কম। তবে এরা তীক্ষ ঘ্রাণ ও শ্রবণশক্তির অধিকারী। আফ্রিকান কালো গণ্ডার অন্য প্রজাতির তুলনায় অপেক্ষাকৃত অধিক ভয়ংকর। এরা সাধারণত এককভাবেই বিচরণ করে। মোটা হলেও ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৫০ মাইল গতিতে ছুটতে পারে।বেশ কিছু গবেষণা থেকে জানা যায় একটি গণ্ডারের স্মরণ কাল এর স্থায়িত্ব হলো ৩ ঘন্টা এর মানে হলো ৩ ঘন্টা পরে এদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা তারা মনে করতে পারে না।

খাদ্য : গণ্ডার সব তৃণভোজী, কিন্তু তাদের খাদ্য তাদের আবাসস্থলের উপর নির্ভর করে: সুমাত্রান এবং জাভান গন্ডার কিছু ফল সহ গ্রীষ্মমন্ডলীয় গাছপালা খায়,যখন কালো গণ্ডারগুলি প্রধানত ব্রাউজার যেগুলি ভেষজ এবং গুল্মগুলি খায়, এবং ভারতীয় গন্ডারগুলি ঘাস এবং জলজ উদ্ভিদ উভয়ই খায়।

জীবনকাল : একটি গণ্ডার ৪৫ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। মানুষের লোভের কারণে বাংলাদেশ থেকে গন্ডার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। 

১৮৭৬ সালে কুমিল্লায় একটি দুইশিঙ্গি গন্ডার গুলি করে মারা হয় এবং ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম থেকে একটি গন্ডার ধরা হয়। যেটি ছিল দুইশিঙ্গি গন্ডার এবং এটি ছিল বাংলাদেশের শেষ জীবিত গন্ডার। এই গন্ডারের নাম ছিল 'বেগম'।

লেখক : আবইয়াদ আহনাফ

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসএমএম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!