৫২ বাজার ৫৩ গলির ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে জরাজীর্ণ অবস্থায় এখনো কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে নর্থব্রুক হল বা লালকুঠি। তবে এখন আর বুড়িগঙ্গা নদী থেকে এটি দেখার সুযোগ নেই। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই ভবনটি গত কয়েক দশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল।
নর্থব্রুক হল বা লালকুঠিকে আবার আদি রূপে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কার কাজও চলছে পুরোদমে। এর মধ্য দিয়ে ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এ স্মারক ফিরে পাচ্ছে আদি রূপ। যেমনটা ছিল ১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের আগমনের সময়। পরবর্তীতে ১৯২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এখানে বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা দেয় ঢাকা পৌরসভা। ঐতিহাসিক এমন বহু ঘটনার সাক্ষী এ চৌহদ্দি।
.png)
রবীন্দ্র গবেষক আহমেদ রফিক তার বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ বইতে ঢাকায় রবীন্দ্রনাথের এই নাগরিক সংবর্ধনার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, শহুরে মানুষে লালকুঠির হল ঘর পরিপূর্ণ ছিল।
বর্ষীয়ান অভিনেতা প্রবীর মিত্র ষাটের দশকে লালকুঠিতে নিয়মিত নাট্যচর্চা করতেন। সেই সময়কার স্মৃতিচারণে বলেন, তখন বিনোদনের তেমন কোনো জায়গা ছিল না। মানুষ এখানে আসত, প্রচণ্ড ভিড় হতো। লালকুঠির মূল ভবনের ডান দিকে বড় একটি মঞ্চে নাটক হতো। সে সময় লালকুঠি ছিল এখনকার বেইলি রোড। আর এখন কী হয় ঐতিহ্যের স্মারক লালকুঠিতে?
পুরান ঢাকার বাসিন্দা রাকিব হাসান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমরা ছোটবেলায় লালকুঠি থেকেই বুড়িগঙ্গা নদী দেখতে পারতাম। এখন আর দেখা যায় না। কারণ সেখানে লঞ্চ টার্মিনাল রয়েছে। পাশাপাশি বহু বৈধ-অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। তবে সরকার সংস্কারের যে উদ্যোগ নিচ্ছে তা খুবই ভালো উদ্যোগ। এটি বাস্তবায়িত হলে ঐতিহ্য রক্ষা হবে, পাশাপাশি লালকুঠি দেখতে অনেক দর্শনার্থী আসবে। পুরান ঢাকাবাসীর জন্যও অবসর কাটানোর একটা জায়গা তৈরি হবে।

রাকিবের মতো ঢাকার ঐকিহ্যকে যারা ভালোবাসেন, তারা সবাই এখন আশায় বুঁকবেধে আছেন খুব শিগগিরই এই ভবনটি খুলে দেওয়া হবে। ভবনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বুড়িগঙ্গার আসল সৌন্দর্য উপভোগ করবেন এই নগরের বাসিন্দারাও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সংস্কারের কাজ শেষে জুন মাসে খুলে দেওয়া হবে সাধারণের জন্য ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভবনটি।
সরজমিনে নর্থব্রুক হল
নর্থব্রুক হল সড়ক ধরে সোজা চলে গেলেই লালকুঠি ঘাট। হাতের বাঁ দিকে ফরাশগঞ্জ ক্লাব। ক্লাবের গেট দিয়ে ঢুকতেই ভেসে আসছে লঞ্চের সাইরেন। চারদিকে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্থাপনার মধ্যে লাল রঙের একটি দালান দেখা যায়। দালানের বাঁ দিকে ফরাশগঞ্জ ক্লাব। ভবনের দুই পাশে রয়েছে ৪টি মিনার, উত্তর-দক্ষিণে রয়েছে সদর দরজা। এক সময় এই ফটক দিয়েই যাওয়া যেত বুড়িগঙ্গার পাড়ে।
যদিও আগের সেই জৌলুস নেই লালকুঠির। গাঢ় লাল রঙও হয়ে গেছে মলিন; ভবনের কিছু কিছু জায়গা ভাঙা। ভেতর-বাইরে খসে পড়ছে পলেস্তারা। তবে দীর্ঘদিন পরে হলেও ভবনটিকে আদি রূপে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
সরজমিন দেখা গেছে, লালকুঠি ভবন সংস্কারে রাতদিন কাজ করছেন ৪০ জন শ্রমিক। তারা ভবনের দেয়াল ঘষা-মাজা করে লাল ও সাদা রং দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ভবনের সংরক্ষণে জড়িতরা বলছেন, ২০ শতকের ষাটের দশকের প্রতি সপ্তাহেই নাটক চলতো এখানে। সেসব এখন অতীত। ঢাকা শহরের বিনোদন ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল এটি। কালের বিবর্তনে ভবনের ভেতরের অনেক অংশ ভেঙে পড়েছিল, কোথাও কোথাও হয়েছিল সংযোজন, জায়গায় জায়গায় খসে পড়েছে পলেস্তরা। তা অপসারণ করে আদি রূপে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
সূত্রে জানা যায়, চারপাশের ঘাট, ব্যবসাকেন্দ্র, দোকানপাট, জঞ্জাল সরিয়ে লালকুঠিকে পুরনো রূপে ফিরিয়ে আনতে চায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। তাই ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্টের (ডিসিএনইউপি) অধীনে সংস্কার কার্যক্রম চলছে।
সম্প্রতি ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, বুড়িগঙ্গা নদী ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে আমাদের ঢাকা। আমরা ঢাকার সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও স্মৃতিস্তম্ভের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চাই। কিন্তু আমরা এই ঐতিহাসিক স্থাপনা থেকে এখন আর বুড়িগঙ্গাকে দেখতে পাই না। দ্রুত লালকুঠি থেকে রূপলাল হাউজ পর্যন্ত অংশের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল সরিয়ে ফেলতে বিআইডব্লিউটিএ’কে অনুরোধ জানিয়েছে নগর প্রশাসন।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, চাইলেই ঐতিহাসিক স্থাপনা ভেঙে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যায়। এতে সাময়িকভাবে হয়তো লাভবানও হওয়া যায়, কিন্তু ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করা যায় না। অথচ ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমেই পাওয়া যায় বিশ্বমর্যাদা, পর্যটনেও বাড়ে আকর্ষণ। তাই অবৈধ স্থাপনা ভেঙে সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পুনরুদ্ধার করতে হবে।
যা থাকছে লালকুঠি ভবনে
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এ প্রকল্পের আওতায় লালকুঠির নর্থব্রুক হলে থাকবে টাউন হল, এক্সিবিশন হল, ব্যাংকুয়েট হল, সেমিনার হল, ফটোশুটের স্থান। এছাড়া টয়লেট, ইউটিলিটি, বর্ধিত আউটডোর স্পেস, কফি শপ ইত্যাদি সুবিধাসহ কমিউনিটি সেন্টারও থাকবে।
জনসন হল অংশে একটি পাবলিক লাইব্রেরি, ডিজিটাল লাইব্রেরি- আর্কাইভ, বুক ক্যাফে, স্যুভেনির সেলস বুথ থাকবে। করিডোর অংশকে ছোট প্রদর্শনী স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হবে। লালকুঠির বহিরাংশে নাগরিক অনুষ্ঠান, উৎসব, মেলা, বিনোদন অনুষ্ঠান, স্কুল ইভেন্ট আয়োজনের ব্যবস্থা থাকবে, বহিরাংশে একটি টি-স্টলও থাকবে।
ডিসিএনইউপি’র প্রকল্প পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, লালকুঠির ঐতিহ্য ফেরাতে গৃহীত প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করছে। সংস্কারের মাধ্যমে ভবনটির পুরনো জৌলুস ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। লাল রঙের পাশাপাশি ভবনের ভেতরে লাইব্রেরি, ডিজিটাল আর্কাইভ, বুক ক্যাফে, লালকুঠির ঐতিহাসিক ছবি প্রদর্শনী গ্যালারিসহ দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হবে। লালকুঠির সামনের দিকে থাকবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব পালনের স্থান ও চা-কফি শপ।
নর্থব্রুক হল থেকে লালকুঠির ইতিহাস
রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রাচীন এবং সৌন্দর্যময় স্থাপত্যিক একটি নিদর্শন এই নর্থব্রুক হল। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেষে ওয়াইজ ঘাটে অবস্থিত এই ভবনটি। ১৪২ বছর আগে ১৮৭৪ সালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে একটি টাউন হল নির্মিত হয়। সেসময় ঢাকার স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিরা গভর্নর জেনারেল নর্থব্রুকের সম্মানে এই ভবনের নাম রাখেন নর্থব্রুক হল। তবে দালানটি লাল রঙের হওয়ায় এটি লালকুঠি নামেই বেশি পরিচিত।
ইতিহাস সূত্রে আরো জানা যায়, ভাওয়াল রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী এই নর্থব্রুক হল নির্মাণের জন্য ১০ হাজার টাকা দান করেন। ভবনটি পুরোপুরি নির্মাণ শেষে ১৮৮০ সালের ২৫ মে উদ্বোধন করা হয়। সেই সময় ঢাকার কমিশনার নর্থব্রুক হলের উদ্বোধন করেন। তৎকালীন পদস্থ রাজকর্মচারী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সভা এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম এ ভবনেই আয়োজন করা হতো। পরবর্তীতে নর্থব্রুক হলের নামানুসারে সংলগ্ন সড়কের নামকরণ করা হয় নর্থব্রুক হল রোড।