ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

শ্রীমঙ্গলের চা শ্রমিকদের ‘সৌরা ভাষা’ মৃত্যুর অপেক্ষায়

নুরুল করিম
প্রকাশিত: ১৬:৩৬, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
শ্রীমঙ্গলের চা শ্রমিকদের ‘সৌরা ভাষা’ মৃত্যুর অপেক্ষায়
ফাইল ছবি

নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা, সংস্কৃতি—সবই আছে সৌরা জাতির। তবুও তারা এখন ‘মা’ কে আর নিজের ভাষায় ডাকে না। কিংবা চায়ের কচি পাতা তুলতে তুলতে যে গল্প করা হয়, সেটাও এখন আর সৌরা ভাষায় হয় না। বাংলা, ওড়িশা তাদের মায়ের ভাষা না হলেও, এখন এই ভাষাতে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত সুখ-দুঃখের আলাপ হয়। নিজের মায়ের ভাষায় মান-অভিমানের কথা বলতে না পারার চেয়ে বড় দুঃখ আর কী হতে পারে?

ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত ঘেঁষা শ্রীমঙ্গল রাজঘাট ইউনিয়নের সৌরাপল্লীতে সৌরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। এখানে ২২টি সৌরা পরিবার বসবাস করে। বয়স ১০/১২ বছর হলেই সীমান্ত ঘেঁষা এই জনগোষ্ঠীর সবাই চা বাগানে কাজ শুরু করেন। বাকি জীবন তারা চা শ্রমিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। ফলে এখন পর্যন্ত কোনো সৌরা উচ্চশিক্ষার দোরগোড়ায়ও পৌঁছাতে পারেননি।

সৌরা ভাষা ও সংস্কৃতি কেন হারিয়ে যাচ্ছে?

Advertisement

চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গলে সবুজের সমারোহে ঘেরা রাজঘাট চা বাগান। সেই বাগানের নিভৃত একাংশে সৌরাপল্লীর অবস্থান। এই পল্লীর খুব কাছেই ভারতের ত্রিপুরার বনবাজার। স্থানীয়রা এই পল্লীকে ‘রাজঘাট সৌরা বস্তি’ নামেই চেনে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির ওড়াউড়ি, সে সঙ্গে কিচির-মিচির শব্দ শুনতে শুনতে আমরা খোঁজ পাই সৌরাভাষীদের।

ব্রিটিশ আমল থেকেই নিভৃত এই পল্লীতে সৌরারা বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। ভারতের ঝাড়খন্ডের রাজধানী রাঁচি থেকে মূলত সৌরাদের আনা হয় চা-বাগানে কাজ করানোর জন্য। সেই সময়েও কথা-বার্তায় অক্ষত ছিল তাদের নিজস্ব ভাষা। বিয়ে থেকে শুরু করে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মতোই হতো। বিপত্তি ঘটে তখনই, যখন অনেক সৌরা পরবর্তীকালে আবার ফিরে যায়। জনসংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে তাদের যোগাযোগের সুযোগও কমে যায়। তার ওপর সৌরা ভাষা নিয়ে পড়াশোনার বিন্দুমাত্র সুযোগও ছিল না।

স্থানীয়রা এই পল্লীকে ‘রাজঘাট সৌরা বস্তি’ নামেই চেনে।

সৌরা ভাষায় এখনো পুরোপুরি কথা বলতে পারেন মাত্র ৩/৪জন ব্যক্তি। তবে আংশিক বলতে পারেন এমন সৌরাভাষীর সংখ্যার তিন হাজারের কম। সৌরা সম্প্রদায় প্রবীণ ব্যক্তি সামরা সৌরা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা মরে গেলে ভাষাটিও মরে যাবে। বাড়িতে কিছু কিছু কথা সৌরা ভাষায় বলতে পারলেও বাইরে বলার সুযোগ নেই। তাই সন্তানেরাও শিখতে পারে না।’

চা-বাগানে সৌরার থেকে ওড়িয়া ও সাদরি সম্প্রদায়ের লোকজনই বেশি। তাই কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য সৌরাদের বেশিরভাগই বাংলা, ওড়িয়া ও সাদরি ভাষাতেই কথা বলেন। চা-বাগানের শ্রমিক লিতু সৌরা বলেন, ‘আমরা যখন চা-বাগানে কাজ করি, তখন বাংলা, ওড়িয়া বা জংলি ভাষায় কথা বলি। সৌরা ভাষায় বললে কেউ বুঝে না। আমাদের ভাষায় কথা বলার সুযোগ কোথায়?’

৬৭ বছর বয়সী আরতি সৌরা বলেন,  ‘আমাদের বিয়ের আচারের নাম সুংকরা। আকাশের তারা দেখে আমরা বিয়ে করেছি। মাটিতে নানা ধরনের বিষয়বস্তু আঁকা থাকত। এটা ছিল আমাদের সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু আজকাল আমাদের বাচ্চাদের আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি শেখাতে চাই, কিন্তু তারা শিখতে চায় না।’

সৌরা ভাষায় পড়াশোনার সুযোগ নেই

ভারত থেকে প্রকাশিত সৌরা জনগোষ্ঠীর সৌরা ভাষার বর্ণমালার একটি বই তাদের কয়েকজনের কাছে থাকলেও চা-বাগান থেকে তাদের কারো সাহিত্যকর্ম এখনো প্রকাশিত হয়নি। ২০১৯ সালে ভারতের এক ব্যক্তি সৌরা ভাষার একটি পুস্তক দিয়ে যান এই সৌরাপল্লীতে। সেটা থেকে এখন ১ থেকে ৩০ পর্যন্ত পড়তে পারে সেখানকার শিশুরা।

রাজঘাট ইউনিয়নের বর্মছড়া শিশুশিক্ষা কেন্দ্রে পড়তে আসে খাড়িয়া, ওড়িয়া, সৌরাসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিশুরা। তাদের ভাষায় বাংলা না হলেও তারা লেখাপড়া করছে বাংলায়। স্কুলটির শিক্ষক লিজা নানুয়ার বলেন,  ‘অনেক আগে থেকেই পরিবারের লোকজন মাতৃভাষায় কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। যদি আমাদের বাবা-মা ঠিকমতো মাতৃভাষা বলতে না পারেন, ঠিকমতো পড়তে না পারেন, তাহলে আমরা কীভাবে শিখবো আর নিজেদের সন্তানদের কী শেখাবো।’

সৌরা ভাষার বর্ণমালা

রাষ্ট্রীয়ভাবে সৌরা ভাষার অবস্থান

বাংলাদেশ সরকার স্বাক্ষরিত  ‘আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ’-এর ৩০ নম্বর ধারায় উল্লেখ রয়েছে—‘যেসব দেশে জাতিগোষ্ঠীগত, ধর্মীয় কিংবা ভাষাগত সংখ্যালঘু কিংবা আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোক রয়েছে, সেসব দেশে ওই ধরনের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত বা আদিবাসী শিশুকে সমাজে তার নিজস্ব সংস্কৃতি ধারণ, নিজস্ব ধর্মের কথা ব্যক্ত ও চর্চা করা, তার সম্প্রদায়ের অপরাপর সদস্যদের সঙ্গে ভাষা ব্যবহার করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’

২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট পরিচালিত ভাষাগত জরিপের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪১টি মাতৃভাষা আছে। এর ভেতর কন্দ, খাড়িয়া, কোডা, সৌরা, মুন্ডারি, কোল, মালতো, খুমি, পাংখোয়া, রেংমিটচা, চাক, খিয়াং, লুসাই ও লালেং—এই ১৪টি আদিবাসী মাতৃভাষা বিপন্ন।

তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের জরিপের পর পরিচালিত জনশুমারিতে ‘সৌরাভাষীরা’ নথিভুক্ত হননি! মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মতে, সৌরাভাষী জনগোষ্ঠী মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে বসবাস করছেন। অনেকে নিজেদের ভীম পরিচয়দানকারী সৌরাদের জনসংখ্যা প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি। তারপরও এই জনগোষ্ঠী এখনো রাষ্ট্রীয় দলিলে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিখ মনজুর বলেন, দেশে চল্লিশের বেশি নৃ-ভাষার মধ্যে অতি বিপন্ন ১৪টি ভাষার একটি সৌরা। শিশুর পাঠ্যপুস্তকে মাতৃভাষা যুক্ত করা না গেলে  বিপন্ন এই ভাষাটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এনকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!