ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]
পর্ব- ২

বাংলাদেশের যেসব পণ্য জিআই স্বীকৃতির যোগ্য

নুরুল করিম
প্রকাশিত: ১৩:৪৫, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
বাংলাদেশের যেসব পণ্য জিআই স্বীকৃতির যোগ্য
অলংকরণ: ডেইলি বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মোট ২২টি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হিসেবে এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে। এছাড়া মোট ১৪টি পণ্যের জিআই স্বীকৃতির জন্য নতুন করে আবেদন জমা পড়েছে। মূলত বাংলাদেশের টাঙ্গাইল শাড়ি ভারতের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কোনো একটি দেশের পরিবেশ, আবহাওয়া ও সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখে, তাহলে সেটিকে ওই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কোন পণ্য জি-আই স্বীকৃতি পেলে পণ্যগুলো বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডিং করা সহজ হয়, বাড়ে কদর। এর ফলে দেশে পর্যটন বাড়ে, রফতানি বাড়ে, কৃষক, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা লাভবান হন। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়।

বাংলাদেশে অনেক কিছুই রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এমন অনেক পণ্য রয়েছে, মান ঠিক রেখে যা পৃথিবীর অন্য কোথাও উৎপাদন করা সম্ভব নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমন অনেক বিশেষ পণ্য রয়েছে যেগুলোর এখনো স্বীকৃতি পাওয়া হয়ে ওঠেনি। এমন পণ্য নিয়ে দুই পর্বের ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব আজ-

Advertisement

কুমারখালীর গামছা বহুকাল ধরেই দেশে-বিদেশে দারুণভাবে সমাদৃত। ছবি: সংগৃহীত

কুমারখালীর গামছা

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গামছা বহুকাল ধরেই দেশে-বিদেশে দারুণভাবে সমাদৃত। দেশে শতাব্দীর প্রাচীনতম কাপড়ের কল মোহিনী মিলেরও অবস্থান এখানে। এখানকার গামছা তৈরির ইতিহাসও বেশ পুরোনো।

কুমারখালীর স্থানীয় ভাষায় তাঁতিদের কারিগর বলা হয়। সুতার সঙ্গে বিভিন্ন রং মিশিয়ে নিজেদের তাঁতে সুনিপুণ হাতে গামছা ও অন্যান্য বস্ত্র তৈরি করে থাকেন তাঁতিরা। এখানকার গামছার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলোর রং বেশ পাকা। গামছাও হয় নরম, পানি চুষে নেয় তাড়াতাড়ি।

১৮৬৯ সালে কুমারখালীর গামছা ও লুঙ্গি বিক্রির জন্য গড়াই নদের তীরে গড়ে তোলা হয় বিশেষ হাট। এখনো সেই হাট দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ী, মহাজন ও ফড়িয়াদের পদচারণায় মুখর হয়ে থাকে।

নরসিংদীর লটকন

নরসিংদীর বেলাব ও শিবপুর উপজেলার যত্রতত্র দেখা যায় লটকনের বাগান। হেক্টরের পর হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে টক-মিষ্টি স্বাদের লটকন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে যা রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও।

জানা যায়, প্রায় ১২০ বছর পূর্বে শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের আজকিতলা গ্রামে লটকন চাষের গোড়াপত্তন করেন মরহুম হাজি আব্দুল আজিজ। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে তা ছড়িয়ে পরে রায়পুরা এবং বেলাব উপজেলার লাল মাটির এলাকায়।

লটকনের মৌসুমে জেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুই পাশে লটকনের হাট বসে। ট্রাকের পর ট্রাকে করে সারা দেশে ছড়িয়ে দেন পাইকাররা। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যেও রপ্তানি হচ্ছে লটকন।

কুমিল্লার খাদিশিল্প

কুমিল্লা জেলার সাথে খাদিশিল্প আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। একসময় এই খাদির খুব প্রচলন ছিল। দেশের চাহিদা মিটিয়ে সবসময় এই তাঁতের কাপড় বিদেশেও রপ্তানি হতো।

কুমিল্লার ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষক আহসানুল কবীর বলেন, ‘কুমিল্লায় খাদি কাপড় তৈরির ইতিহাস কমপক্ষে এক হাজার বছরের পুরোনো। পূর্বে কুমিল্লার মুরাদনগর, চান্দিনা, দেবিদ্বার ও বুড়িচংয়ের ময়নামতি এলাকায় খাদি কাপড় বানানো হতো। ১৯২৩ সালে স্বদেশি আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী বিদেশি পণ্য বর্জনের ডাক দেন। সে সময় খাদি কাপড় বানানোর প্রতিযোগিতা জোরদার হয়।’

খাদি কাপড়ের সঙ্গে এখন কয়েকটি দিক জড়িত রয়েছে। তা হচ্ছে তাঁতি, সুতা কাটুনি, ব্লক কাটার ও রঙের কারিগর। সবাই মিলে তৈরি করেন নান্দনিক খাদি কাপড়। শতবর্ষের পথপরিক্রমায় এগিয়ে চলা কুমিল্লার খাদি বর্তমানে বাহারি রং ও নকশায় হাল ফ্যাশনে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

সারাদেশের বাজারে আসা বড় বড় আনারসের অধিকাংশই চাষ হয় টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকার। ছবি: সংগৃহীত

টাঙ্গাইলের আনারস

আনারসের রাজধানী হিসেবে সুপরিচিত টাঙ্গাইলের মধুপুর। রসালো, সুমিষ্ট স্বাদ আর চমৎকার ঘ্রাণের জন্য বিখ্যাত এ এলাকার আনারস।

ষাটের দশকে মধুপুরের আউশনারা ইউনিয়নের ইদিলপুর গ্রামের গারো ভেরেনো সাংমা ভারতের মেঘালয় থেকে জায়ান্ট কিউ জাতের কিছু চারা এনে প্রথমবারের মতো মধুপুর গড়ে আনারস চাষ শুরু করেন। এরপর থেকেই শুরু আনারস বিপ্লব।

বর্ষায় তো বটেই এমনকি সারাবছর সারাদেশের বাজারে আসা বড় বড় আনারসের অধিকাংশই চাষ হয় টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকার। টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলায় জলছত্র বাজারে আনারসের হাট বসে সপ্তাহে দুইদিন; শুক্রবার এবং মঙ্গলবার।

রাজশাহীর মিষ্টি পান

রাজশাহীর পানের ঐতিহ্য দেশজোড়া। বিদেশেও রাজশাহীর পানের চাহিদা বেশি। শত বছর ধরে উৎকৃষ্টমানের পান ফলে রাজশাহীতে।

শত বছরের বেশি সময় ধরে বংশপরম্পরায় রাজশাহীর বাগমারা, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, মোহনপুর ও পবায় পানের চাষ করেন চাষিরা। রাজশাহীর এসব এলাকায় রয়েছে শতবর্ষী পানবরজ। রাজশাহীর কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম অবলম্বন হচ্ছে পান চাষ। রাজশাহীজুড়ে রয়েছে অর্ধলক্ষাধিক পানবরজ।

সারাদেশে রাজশাহীর মিঠা ও সাঁচি পানের চাহিদা বাড়ছে। এমনকি রাজশাহীর পান যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। তবে সবচেয়ে বেশি যাচ্ছে সৌদি আরবে।

মণিপুরি শাড়ি

দেশে মণিপুরি শাড়ি কিংবা কাপড়ের নাম শোনেননি, এমন নারীর সংখ্যা কমই হবে। সিলেটে ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে মণিপুরি শাড়ি।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মৈরাং রাজ্যের রাজকুমারীর জন্য তৈরি ‘মৈরাংফি’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মণিপুরী তাঁতিরা ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করে শাড়ি তৈরি শুরু করে। মণিপুরী শাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য হলো জমিনের রং থেকে পাড়ের রং গাঢ় থাকে। এর দুই পাড়ে থাকে মন্দিরের প্রতিকৃতি। প্রতিটি শাড়ির আঁচল, পাড় এবং জমিন তৈরি হয় উজ্জ্বল রঙের সুতা দিয়ে। সম্পূর্ণ হাতে বুনুন হয় বলে শাড়িগুলার এপিঠ-ওপিঠের কোনো পার্থক্য থাকে না।

মণিপুরি নারীদের প্রায় ৯০ শতাংশ জন্মসূত্রেই তাঁতশিল্পের সঙ্গে পরিচিত। বর্তমানে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে ও প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে তাদের এই উৎপাদন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘ছানামুখী’

মিষ্টিপ্রিয় বাঙালির পছন্দের তালিকার প্রথম সারিতেই যে মিষ্টিগুলোর নাম রয়েছে তার মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘ছানামুখী’ অন্যতম। ব্রিটিশ রাজত্বকাল থেকে তৈরি হয়ে আসা প্রসিদ্ধ এই মিষ্টি দীর্ঘসময় ধরে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।

ছানামুখীর প্রবক্তার নাম মহাদেব পাঁড়ে। বাড়ি তার ভারতের কাশিধামে। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি একসময় চলে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। বর্তমান জেলা শহরের মেড্ডায় তখন শিবরাম মোদকের একটি মিষ্টির দোকান ছিল। তিনি নিজের দোকানে মহাদেবকে আশ্রয় দেন। মহাদেব আসার পর শিবরামের মিষ্টির সুনাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। মহাদেব দুটি মিষ্টি বানাতেন; একটি লেডি ক্যানিং বা লেডি ক্যানি, অন্যটি ছানামুখী।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শত বছরের এই খাবার দেখতে চতুর্ভুজ আকারের ছোট ছোট টুকরার মতো। ওপরে হালকা চিনির আবরণ। ভেতরের পুরোটাই দুধের ছানা।

শেরপুরের ছানার পায়েস

শেরপুরের ছানার পায়েসের ঐতিহ্য শত বছরের পুরোনো। সুস্বাদু এই মিষ্টির জনপ্রিয়তা বরাবরই আকাশ ছোঁয়া। জনশ্রুতি রয়েছে, শত বছর আগে শেরপুরের ঘোষপট্টিতে প্রথম ছানার পায়েস তৈরি হয়। সে সময়কার জমিদাররা এখনকার ছানার পায়েস বিশেষ পদ্ধতিতে নিয়ে যেতেন কলকাতায়। এছাড়া আত্মীয়-স্বজন কিংবা অন্য জমিদারের কাছে উপঢৌকন হিসেবেও এ পায়েস পাঠাতেন তারা।

ব্রিটিশ আমলে হাতে গোনা দু-একটি দোকানে এই মিষ্টি হতো। এখন জেলা সদরেই অন্তত ২০টি দোকানে ছানার পায়েস তৈরি হচ্ছে।

মহেশখালীর মিষ্টি পান অন্যান্য পানের তুলনায় অনেক নরম। ছবি: সংগৃহীত

মহেশখালীর মিষ্টি পান

‘যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম, যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম, মইশখালীর পানের খিলি তারে বানাই খাবাইতাম’- শেফালী ঘোষের গাওয়া এ গানের মতোই জনপ্রিয় মহেশখালীর পান।

মহেশখালীর মিষ্টি পান অন্যান্য পানের তুলনায় অনেক নরম; এই গুণটির কারণে এই পান বেশ আলাদা এবং খেতেও মিষ্টি হয়। এই দ্বীপের আবহাওয়া, মাটি এবং পানি ইত্যাদি পান চাষের উপযোগী বলেই প্রতিবছর বিদেশে রপ্তানি হওয়া পানের একটি বড় অংশ মহেশখালী থেকেই উৎপাদিত হয়ে থাকে। বৈশ্বিকভাবে এই পানের প্রধান ক্রেতা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ।

গোপালগঞ্জের রসগোল্লা

গোপালগঞ্জে উৎসব-পার্বনের অন্যতম অনুষঙ্গ দত্ত মিষ্টান্ন ভান্ডারের রসগোল্লা। শুধু গোপালগঞ্জ নয়, দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিত এ মিষ্টান্ন।

দত্ত মিষ্টান্ন ভান্ডারের বয়স ৮৭ বছর হতে চললো। দোকানটির মালিক সবুজ দত্তের জানান, ‘বাপ, ঠাকুরদাদার আমল থেকে সুনামের সঙ্গে চলে আসছে আমাদের মিষ্টি। আমাদের মিষ্টি দেশের বাইরেও যায়। গোপালগঞ্জে রাষ্ট্রীয় যত অনুষ্ঠান হয়, সেখানে আমাদের মিষ্টি নেয়া হয়।’

দত্তের মিষ্টির পাশাপাশি গোপালগঞ্জ জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ছোট-বড় অনেক মিষ্টির দোকান রয়েছে।

নওগাঁর নাগ ফজলি আম

নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলের নাক ফজলি আম স্বাদে গুণে অনন্য। জানা যায়, ইংরেজ গভর্নর লর্ড লিটনের (১৯২২-১৯২৭) আমলে বিনোদ কুমার লাহিড়ী মুর্শিদাবাদের নবাবদের বাগান থেকে সংগ্রহ করেছিলেন উৎকৃষ্ট স্বাদের নাক ফজলির চারা। লাগিয়েছিলেন নিজের বাগানে। এর পর থেকে নওগাঁয় ছড়িয়ে পড়ে এ আম।

এ আমের চামড়া পাতলা এবং আঁটি খুব চিকন ও মাংস বেশি হয়। আমের নিচের দিকে নাকের মতো আছে বলে এর নাম নাক ফজলি—এমনটাই অনুমান স্থানীয় লোকজনের।

মাগুরার হাজরাপুরের লিচু

দেশের যেকোনো লিচুর তুলনায় মাগুরার হাজরাপুরের লিচুর স্বাদ অনন্য। এই লিচু টসটসে রসে ভরপুর। আকার ও আকৃতিতেও বড়। হাজরাপুরী লিচুর স্বাদ দেশের অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া ভার।

মাগুরায় সদর উপজেলার ইছাখাদা, হাজরাপুর, নড়িহাটি, রাঘবদাইড়, নন্দলালপুর, খালিমপুর, শিবরামপুরসহ জেলার অন্তত ৩০টি গ্রামে লিচুর চাষ হয়ে থাকে। এসব গ্রামে রয়েছে ছোটবড় বিভিন্ন আয়তনের অন্তত ২ হাজার লিচু বাগান। যেখানে স্থানীয় হাজরাপুরী লিচু ছাড়াও মোজাফ্ফরী, চায়না থ্রি ও বোম্বাই জাতের লিচুর আবাদ হয়ে থাকে। তবে বাগানের অন্তত ৬০ শতাংশে রয়েছে স্থানীয় হাজরাপুরী জাতের লিচু।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এনকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!