খুলনা
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের শেষ দিকে চূড়ান্ত বিজয়ের আগে দক্ষিণাঞ্চলের শ্যামনগর, দেবহাটা, সাতক্ষীরা হানাদারমুক্ত হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়ে যায়। তখন তাদের একটাই লক্ষ্য খুলনাকে মুক্ত করা।
.png)
ফাহিম উদ্দিন ও লে. নোমান উল্লাহর নেতৃত্বে তার বাহিনী সেনের বাজার, রাজাপুর ও রূপসা ঘাটের দিক থেকে, বোরহান উদ্দিন ও তার বাহিনী ক্রিসেন্ট জুটমিল ও এর পাশে নৌঘাঁটিতে, মুজাহিদ ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাস্টার ও তার বাহিনী কুলুটিয়া নামক স্থানে অবস্থান নিয়ে খুলনা রেডিও স্টেশনে, আফজাল ও কুতুব উদ্দিন তাদের বাহিনী নিয়ে ঝড়ডাঙ্গা ও সাচিবুনিয়ার দিক থেকে পাক সেনাদের লায়ন্স স্কুলের ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়ে খুলনা শহরের দিকে প্রবেশ করে।
এরপর মুক্তিযোদ্ধারা বেতারে শুনতে পান, মিত্র বাহিনীর কমান্ডার মানেক শথ র আহ্বানে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আত্মসমর্পণ করছে, কিন্তু খুলনায় তারা আত্মসমর্পণে রাজি হচ্ছে না। এই সংবাদ পাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা খুলনা শহরের দিকে এগিয়ে যান।
১৭ ডিসেম্বর ভোরে শিপইয়ার্ডের কাছে রূপসা নদীতে বটিয়াঘাটা ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি লঞ্চ এসে পৌঁছে। কিন্তু শিপইয়ার্ডের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা পাক সৈন্যরা লঞ্চটির ওপর আক্রমণ চালায় এবং গুলিবর্ষণ করে। মুক্তিবাহিনীও লঞ্চ থেকে নেমে শিপইয়ার্ডের ওপারের ধান ক্ষেতে অবস্থান নিয়ে পাল্টা গুলি চালায়।
অবশেষে সকল বাধা অতিক্রম করে ১৭ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধারা খুলনা শহরে প্রবেশ করতে শুরু করে। খুলনা সার্কিট হাউস দখল করার পর মেজর জয়নুল আবেদীন ও রহমত উল্লাহ দাদু যৌথভাবে সার্কিট হাউসে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।
কিশোরগঞ্জ
১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশের বেশির ভাগ জায়গা শত্রুমুক্ত হয়েছিলো, সারাদেশে যখন চলছিলো বিজয়ের আনন্দ মিছিল- তখনও সেই বিজয়ের স্বাদ নিতে পারেনি কিশোরগঞ্জবাসী। সেদিনও কিশোরগঞ্জ শহর ছিল স্থানীয় পাক দোসরদের শক্ত ঘাঁটি। তারা উড়াচ্ছিলো পাকিস্তানের পতাকা, গুলিতে ঝরাচ্ছিল এ দেশেরই মানুষের রক্ত। অবশেষে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় স্থানীয় আলবদর-রাজাকারের দল। তারপর কিশোরগঞ্জে জয় বাংলা ধ্বনিতে ওড়ানো হয় বিজয় নিশান। সে মাহেন্দ্রক্ষণটি ছিল ১৭ ডিসেম্বর।
সারারাত মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণ ও গোলাগুলিতে বিনিদ্র রাত কাটায় শহর ও শহরতলির লোকজন। পরদিন সকালে সে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি সামনে আসে। শহরের চারদিক থেকে চতুর্মুখী আক্রমণ করে ১৭ ডিসেম্বর সকাল ৮টার দিকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনী হানাদারদের হটিয়ে মুক্ত করে কিশোরগঞ্জকে। উত্তোলন করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। বিজয়ের স্বাদ পেয়ে মুক্তিসেনাদের মুখে জয় বাংলা স্লোগান মুখরিত হয়ে উঠে চারপাশ। স্বজন হারানোর ব্যথা ভুলে হাজার হাজার উৎফুল্ল জনতা নেমে আসে রাস্তায় ।
রাঙামাটি
প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) মনিষ দেওয়ান বলেন, রাঙামাটির কুতুবছড়িতে ১৫ ডিসেম্বর সকালে আমাদেরকে হেলিকপ্টারে অবতরণ করানো হয়। ঐদিন সকাল থেকে সারা রাত পাকিস্তানি সেনাদের সাথে আমাদের যুদ্ধ চলতে থাকে। ১৬ তারিখ সকালে আমি এবং শামসুদ্দীন কাউখালীর ঘাগড়ার দিকে নতুন একটি রাস্তার সন্ধানের এগোতে থাকি। ১৭ ডিসেম্বর কাউখালীতে এসে জানতে পারি ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দলবল নিয়ে রাঙামাটি ত্যাগ করেছেন। ১৭ ডিসেম্বর সকালে আমরা রাঙামাটি ডিসি অফিসে অবস্থান নিই। ঐদিন জেলা প্রশাসকের অফিসের সামনে পতাকা উত্তোলন করা হয়। স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল সুজান সিং উভান এবং শেখ ফজলুল হক মনি ও শেখ ফজলুল হক সেলিমসহ তারা ১৮ ডিসেম্বর রাঙামাটি আসেন এবং বিকাল ৩ টার দিকে হেলিকপ্টারে করে অবতরণ করেন। আবারও স্বাধীন দেশের পতাকা উত্তোলন করেন এবং কিছু আনুষ্ঠানিকতাও করা হয়।