ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ ফিচার ]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ ও একটি চমৎকার দিন

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪০, ১১ নভেম্বর ২০২৩
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ ও একটি চমৎকার দিন
অলংকরণ: ডেইলি বাংলাদেশ

১৯১৪ সালের ২৮ জুন, গ্রীষ্মের এক চমৎকার দিন।  ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে চারপাশে, নতুন পাতায় বাতাসের কাঁপন টের পাওয়া যায়। অস্ট্রিয়ার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন আর্কডিউক ফ্রান্সিস ফার্ডিনান্ড। বলকান অঞ্চলের রাজ্য বসনিয়ার রাজধানী ছিল সারায়েভা, সেখানে তিনি সস্ত্রীক গেলেন বেড়াতে। এর অল্প ক’বছর আগে অস্ট্রিয়া বসনিয়াকে দখল করে নিয়েছিল। এ কারণে বসনিয়ার উগ্রবাদী কিছু গ্রুপের ক্ষোভ ছিল অস্ট্রিয়ার উপর।

সারায়েভার খোলা গাড়িতে করে আর্কডিউক চলেছেন, পাশে তার স্ত্রী; এমন সময় তাদের উপরে গুলি ছোঁড়া হলো, দুজনেই নিহত হলেন। অস্ট্রিয়ার সরকার এবং জনসাধারণ রাগে ক্ষেপে উঠল, এই কাজে সাহায্য করেছে বলে সার্বিয়া সরকারের নামে অভিযোগ করে বসল। সার্বিয়া সরকার স্বাভাবিকভাবেই এ অভিযোগ অস্বীকার করল।

কিছুটা রাগের বশে, এবং বেশিরভাগ কূটনীতির একটা দাঁও হিসেবে, অস্ট্রিয়া সরকার সার্বিয়ার উপরে খুব জোর তম্বি শুরু করে দিল। এটা বোঝা শক্ত নয়, এই সুযোগে সার্বিয়ার বিষদাঁত একেবারে ভেঙে দেয়াই ছিল তার মতলব; এর থেকে যদি বৃহত্তর যুদ্ধের সৃষ্টি হয় তবে তখন জার্মানির প্রবল শক্তি তার সহায় হবে, এ ভরসাও তার মনে ছিল। অতএব সার্বিয়া যে ক্ষমাপ্রার্থনা করল অস্ট্রিয়া সেটা গ্রহণ করল না। ১৯১৪ সালের ২৩ শে জুলাই তারিখে, সে সার্বিয়াকে শেষ চরমপত্র পাঠিয়ে দিল।

Advertisement

এর পাঁচ দিন পরে, ২৮ শে জুলাই তারিখে অস্ট্রিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এই সামান্য এক হত্যাকাণ্ডের ফলে দুই দেশের যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার ফলাফল যে কতটা ভয়ংকর হতে চলেছে, প্রায় দুই কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে চলেছে এ ব্যাপারে কেউ ঘুণাক্ষরেও ধারণা করেনি। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহেই যুদ্ধে নিজেদের সংযুক্ত করে জার্মানি, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইতালি। পরে যুক্ত হয় আরো ডজনখানেক দেশ। শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

কিন্তু এ যুদ্ধের কারণ কেবল এই হত্যাকাণ্ড নয়। আরো ব্যাপক, আরো গভীর এর পেছনের গল্প। কেন অল্প কদিনেই এতগুলো দেশ যুদ্ধে লিপ্ত হলো। অস্ট্রিয়ার কেন ভরসা ছিল যুদ্ধে জার্মান তাদের পক্ষ নেবে? কীইবা ছিল সে সময়ের প্রেক্ষাপট?

জাতিতে জাতিতে এই রেষারেষি, এটা আসলে ছিল ধনিকতন্ত্রী শিল্পবাণিজ্যের অবশ্যম্ভাবী ফল। ধনতন্ত্রী দেশগুলোর বাজার আর কাঁচামালের প্রয়োজন দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, অতএব তারা সাম্রাজ্যের সন্ধানে পৃথিবীময় ছুটে বেড়াতে লাগল। এশিয়ায় গেল তারা, গেল আফ্রিকায়, যে যতখানি পারে জায়গা দখল করে বসে তাকে শোষণের ব্যবস্থা করে নিল। তারপর একদিন পৃথিবীটাই গেল ফুরিয়ে। তখন আর দখল করবার মত নতুন দেশ নেই; কাজেই তখন সাম্রাজ্যবাদী জাতিরা চোখ পাকিয়ে পরস্পরের দিকে তাকাতে শুরু করল, অন্যদের হাতের কোন সম্পত্তিটাতে কে কোন সুযোগে হস্তক্ষেপ করতে পারে তারই সুযোগ খুঁজতে লাগল। এশিয়াতে আফ্রিকাতে ইউরোপে সর্বদাই এদের মধ্যে ঠোকাঠুকি বাধতে লাগল, বেড়ে উঠল মনোমালিন্য, যুদ্ধ তখন শুধু বাঁধবার অপেক্ষা।

অষ্টাদশ শতকে ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের পর ইউরোপে যন্ত্রশিল্পের বিপুল উন্নতি হতে লাগলো। আগে যে পণ্য উৎপাদন করতে যে পরিমাণ খরচ হতো এখন যন্ত্রের বদান্যতায় খরচ হতে লাগলো তার থেকে অনেক কম। যন্ত্র সভ্যতায় সবার আগে উন্নতি করেছিল ইংল্যান্ড, তারপর ফ্রান্স, তারপর জার্মানরা।

এই পণ্য উৎপাদনের জন্য  সস্তায় কাঁচামাল প্রয়োজন হলো, আর দরকার হলো সেই উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার বাজার। ইংল্যান্ড ভারতবর্ষকে জোর করে তাদের উপনিবেশ বানালো। ফ্রান্স গেল উত্তর আফ্রিকায়। তাদের শোষণ করে নিজেদের গোলা ভরতে লাগলো তারা। সম্পদের পাহাড় জমতে লাগলো। এই নিষ্ঠুর দখলের খেলায় আসতে জার্মানরা একটু দেরি করে ফেললো। তারা দেখলো উন্নতি করতে হলে তাদেরও উপনিবেশ দরকার। অথচ সব তো ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স দখল করে রেখেছে। তাই তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকলো কীভাবে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সের কাছ থেকে উপনিবেশ কেড়ে নেয়া যায়।

এই উত্তেজনা তৈরির পেছনে আরেকটা পক্ষ আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ছিল। তাদের নির্ভুল চাল চেলে যাচ্ছিলো। সেটা হলো ধনিকতন্ত্রী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়। তাদের অনেকেরই ছিল অস্ত্র ব্যবসা। পুরো ইউরোপে এরা আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল যুদ্ধের। ভয় উসকে দিল জনসাধারণের মনে। এই ভয় জিনিসটাই ভয়ানক। প্রতিটা দেশ তৈরি হতে লাগলো যুদ্ধের জন্য। যার যতখানি সাধ্য সে অনুযায়ী সমরাস্ত্র সংগ্রহ করা শুরু করলো। গোটা ইউরোপজুড়ে শুরু হলো রণসজ্জা সম্পূর্ণ করবার একটা প্রতিযোগিতা।

এই প্রতিযোগিতার মজা হলো একটা দেশ যদি নিজের রণসজ্জা বাড়িয়ে দেয়, তখন অন্যান্য দেশগুলোকেও তাদের রণসজ্জা বাড়াতে হয়। অনেকটা বাধ্য হয়েই। আর রণসজ্জার যারা কারবারি মানে বন্দুক, কামান, গোলাবারুদ, ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ ইত্যাদি যারা প্রস্তুত করে তাদের তো ব্যবসা ফুলে উঠতে লাগলো। এ সুযোগে তারা বিরাট বড় দাঁও মেরে নিলেন। এবং নিজেরাই গুজব ছড়াতে লাগলেন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল বলে।

আতঙ্ক ছড়াতে লাগলেন যাতে সমস্ত দেশ তাদের কাছ থেকে বেশি বেশি অস্ত্র কেনে। মজার ব্যাপার হলো এই অস্ত্র উৎপাদন ব্যবসায় বড় অংশীদারদের দেশ আবার জার্মানি, ইংল্যান্ড আর ফ্রান্সে। এরা নিজেরা নিজেরা লাভের জন্য নিজেদের দেশের অগণিত মানুষকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে লাগলেন। ১৯১৪ সালের আগস্ট থেকে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। শুরু হলো মানুষ হত্যার এক অবিশ্বাস্য, অমানবিক প্রতিযোগিতা । ৪ বছর স্থায়ী যুদ্ধে প্রায় দুই কোটি মানুষের মৃত্যু হলো, কোটি কোটি মানুষ আহত হলো, ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে বসলো। অথচ এর পেছনে কারণ ছিল কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের উদগ্র লোভ। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা মানুষকে বানিয়ে দিয়েছিল বর্বর। সভ্যতার গায়ে লেপে দিয়েছিল লজ্জার চুনকালি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এনকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!