শিশিরের উপরে খালি পায়ে হাঁটার আনন্দটা অন্যরকম। গাছেভরা ক্যাম্পাসের বড় বড় বিল্ডিংগুলোর ওপর থেকে তাকিয়ে থাকলেই দেখা যায়, নীল আকাশের বুকে ভেসে থাকা মেঘ যেন সাদা কার্পেট বেছানো। মাথার ওপর থেকে উড়ে যায় সাদাবক, শালিক ও টিয়ার ঝাক। হলের বারান্দার গ্রামগুলোতে কিচিরমিচির শব্দে মেতে ওঠে শালিক পাখি। পাখিদের কলকাকলিতে ভরে থাকে চারপাশ।

.png)
সৌন্দর্যে সেজেছে উত্তরের বাতিঘরটি। ভাদ্র-আশ্বিন মিলে শরৎকাল। নানা উৎসবের আগমনি বার্তা এবং প্রকৃতিকে নতুন রূপে সাজিয়ে আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয় ঋতুরানী শরৎ। ধুয়ে মুছে নতুন সাজে সজ্জিত হয় প্রকৃতি।
কখনো পরিষ্কার নীল আকাশে ভেসে বেড়ায় সাদা মেঘের ভেলা, কখনো বা কালোমেঘে ঢেকে আসে বৃষ্টি। শিশিরভেজা শিউলি, দূর্বাঘাস প্রকৃতিতে ছড়ায় স্নিগ্ধতা, মোহিত করে সবকিছুই। নদীর কিনারায় যেমন কাশফুল, শাপলা, শালুক, পদ্মে ভরে উঠে পুকুর জলাশয় এবং রাস্তার ধারে পর্যটন কেন্দ্রসহ পাহাড়ে ফুটতে থাকে শিউলি, জবা, জুঁই, কেয়া, কামিনী, মালতী, জারুল, নয়নতারা, বেলি, দোলনচাপাসহ নানা ফুল।
পাকা তালের মিস্টি গন্ধে মৌ মৌ করে চারপাশ। এছাড়াও শরতে আমলকী, জলপাই, জগডুমুর, করমচা, চালতা, ডেউয়া পাওয়া যায়। শরৎকালের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে বাংলার প্রায় সব কবিই লিখেছেন কবিতা, গান, রম্য।

জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম শরতের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তার কাব্যে লিখেছেন-‘সই পাতাল কি শরতে আজিকে স্নিগ্ধ আকাশ ধরণী? নীলিমা বাহিয়া সওগাত নিয়া নামিছে মেঘের তরণী! অলকার পানে বলাকা ছুটিছে মেঘ-দূত-মন মোহিয়াচঞ্চুতে রাঙা কলমির কুঁড়ি-মরতের ভেট বহিয়া। সখীর গাঁয়ের সেঁউতি-বোঁটার ফিরোজায় রেঙে পেশোয়াজআশমানি আর মৃন্ময়ী সখী মিশিয়াছে মেঠো পথ-মাঝ।’

ক্যাম্পাসে শরৎ মানেই ভিন্ন মাত্রার আগমনীবার্তা। এ সময় ক্যাম্পাসে দেখা মেলে স্কুল পড়ুয়া ছোট ছোট ছেলেদের পদ্মফুল বিক্রির হিড়িক। সবুজে আচ্ছাদিত ক্যাম্পাসের চারপাশে শুধু সবুজ আর সবুজ। বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য্য শরতে বহুগুণ বেড়ে যায়।
নানা ফুল ফলে ক্যাম্পাসটি নতুন এক রূপে সজ্জিত হয়। পাখিদের কলকাকলিতে ভরে থাকে চারপাশ। থেমে থেমে ডেকে উঠে ঝিঁঝিঁ পোকা আর পাখিদের দল। শরৎকাল প্রকৃতি অত্যন্ত লাবণ্যময়ী ও বৈচিত্র্যময়ী যা কলমের কালিতে পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়া কঠিন। কেবল নিজ চোখেই উপভোগ করা যায়।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী নুর আলম সিদ্দিক বলেন, আবার শরৎ এসেছে। এবারের শরৎ সুন্দর কিন্তু এর বাতাসে বয়ে বেড়াচ্ছে রক্তের গন্ধ। বর্ষার বাদল ধারায় মুছে যায়নি সেই রক্তের গন্ধ। রক্ত লেগে আছে ক্যাম্পাসে। কোথাও কোথাও রক্তের রঙ কৃষ্ণচূড়া হয়ে ফুটেছে। বারবার ফুটবে। শরতের মেঘ যে শুভ্র তুলোর মতো ভেসে বেড়ায় সেটা এবার হয়ে উঠেনি। হয়তোবা মেঘেদেরও মন খারাপ। কারণ, এই ক্যাম্পাসে তাজা প্রাণ ঝড়ে গেছে বুলেটের আঘাতে।
এবারের শরতের বেরোবি ক্যাম্পাসের পাখিরা সবুজ ডালে উড়ে বসে। সুর তুলে গান গায়৷ সে গানের সুরে বেদনা ও কষ্টের প্রতিধ্বনি আসে। সবুজে মুড়ে গেছে বেরোবি ক্যাম্পাস। ফুলেরা হয়তো সুন্দর হবে, পাখির কিচিরমিচির হয়তো প্রাণবন্ত হবে, মেঘেরা হয়তো শুভ্র হবে আবু সাঈদের আত্মা ন্যায় বিচার পেলে।
আরেক শিক্ষার্থী সুমাইয়া শিমু বলেন, ফুল ফুটিল, আঁধার কেটে হলো ভোর শরৎ এলো ঘরের দোর। শরৎ তার আগমনি বার্তা জানান দিয়েছে বিভিন্ন রূপে আমাদের সৌন্দর্যমণ্ডিত প্রাণপ্রিয় ক্যাম্পাসে কাশফুলের দোলে, ঘাসের আলতো শিশির ছোঁয়ার ভাবে। শরৎ এলো তবে হিম শীতের আভাস যে বাতাসে ভাসে।

ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মাহাফুজ অনি বলেন, বিভাগীয় শহর হিসেবে রংপুর ইট-পাথর আর কংক্রিটের দেওয়াল-সিরাতে যখন ভরপুর। তখনই যেন এক টুকরো সতেজ নির্মল বাতাসের ছোঁয়া দিতে, ক্লান্ত মনগুলোকে আশাবাদী করে তুলতে ফুটে উঠেছে থোকায় থোকায় নানান ফুল। ক্যাম্পাসেও যে অক্টোবর এসেছে তা মনে করিয়ে দিচ্ছে শিউলি ফুল। নয়নতারার আবেশ অনুভব করছে মানুষ আপনার নয়নে নয়, হৃদয়ের গহীন হতে। একদিকে শরতের আকাশ সাদা সাদা ভেজা তুলোর ভেলা যেমন ভেসে চলেছে তেমনি নানান রং-বেরঙের ফুলগুলো তাদের আত্মপ্রকাশের মধ্যে দিয়ে জানান দিচ্ছে বসুন্ধরায় আজ শরৎ এসেছে।

বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম সৌন্দর্যমণ্ডিত বিশ্ববিদ্যালয় হলো বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এখন শরৎ এর ক্যাম্পাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুলগুলো হলো জবা, শিউলিসহ নাম না জানা হরেক রকমের ফুল। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
শরৎ সৌন্দর্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বাইরে থেকে আসা সৌন্দর্যপিপাসু লোকদের পিপাসা মিটাতে সাহায্য করে।