নগদ অর্থ প্রদান: বন্যার্তদের সাহায্যার্থে বাকৃবির শিক্ষকরা তাদের একদিনের বেতন ২৫ লাখ টাকা প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে দান করে। এছাড়াও, সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের এক মাসের স্টাইপেন্ড থেকে ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা বন্যার্তদের প্রদান করেছে, যা শিক্ষার্থীদের মানবিকতা ও সংবেদনশীলতার নিদর্শন।
.png)
কৃষকদের জন্য বীজতলা তৈরি: বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগ ও এগ্রি স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্স বিশেষ করে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে লেট আমন ধানের চারা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। প্রায় ৫ একর জমিতে চারা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা আরো বাড়তে পারে। এতে ব্যবহৃত বীজগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) থেকে ১ টন (বিনা-১৭), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখা থেকে ১৫০ কেজি (বিনা-১৭) এবং বায়ার বাংলাদেশ জামালপুর শাখা থেকে ৫০০ কেজি (ধানিগোল্ড) বীজ রয়েছে। এই চারা বিনামূল্যে বন্যাদুর্গত এলাকায় সরবরাহ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
গবাদিপশুর জন্য প্রাণিসেবা: প্রাণিসম্পদ বিভাগের শিক্ষার্থীরা এবং শিক্ষকেরা গবাদিপশু ও অন্যান্য প্রাণীদের চিকিৎসা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় গবাদিপশুদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা, বিনামূল্যে ঔষধ, এবং খামারিদের জন্য টেকনিক্যাল পরামর্শ প্রদান করে আসছেন। এরই মধ্যে ফেনীর তিন উপজেলায় ৩ টন গো-খাদ্য এবং মেডিসিন পাঠানো হয়েছে। কুলাউড়ায় আড়াই টন এবং লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালীতে ৫১০ কেজি গো-খাদ্য সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত এসব টিমকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাগণ সার্বিক সহায়তা প্রদান করেছেন। পাশাপাশি, টেলিমেডিসিন সেবা চালুর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে, যা খামারিদের দূরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিতে সহায়ক হবে।
গণত্রাণ সংগ্রহ: বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি কেন্দ্রিক শিক্ষার্থীদের গণত্রাণ কর্মসূচির আওতায়, নগদ অর্থ, জামাকাপড়, ঔষধ, বিশুদ্ধ পানি, এবং শুকনো খাবারসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীরা। গত ২২ আগস্ট থেকে শিক্ষার্থীরা এই ত্রাণ সংগ্রহ শুরু করে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। ত্রাণ সংগ্রহের জন্য টিএসসি ক্যান্টিন এবং কেআর মার্কেটে বুথ স্থাপন করা হয়। শিক্ষার্থীরা শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের বাসায় গিয়ে এবং বিভিন্ন অনুষদে ত্রাণ সংগ্রহ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকার মানুষও এই উদ্যোগে সাড়া দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য বিশেষ দল গঠন করা হয়, যারা ফেনীতে ত্রাণ সরবরাহ করেছে এবং ২৬ আগস্ট সকালে তারা ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। এছাড়া, ৩০ আগস্ট মধ্যরাতে শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় দফায় ত্রাণ নিয়ে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, এবং চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ত্রাণের মধ্যে চাল-ডালের ৬০০ প্যাকেট, শুকনো খাবারের ৩০০ প্যাকেট বিতরণ করা হয়।
ফুড সেইফটি কীট বক্স: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ইন্টারডিসিপ্লিনারি ইনস্টিটিউট ফর ফুড সিকিউরিটি (আইআইএফএস) এর আওতাধীন ফুড সেইফটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি দেশের পূর্বাঞ্চলে বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় একটি বিশেষউদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তারা বানভাসি বা বন্যার্তদের সহায়তায় ‘ফুড সেইফটি কীট বক্স’ বানিয়েছেন এবং সেগুলো পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন। তাদের এই প্রজেক্টের নাম দিয়েছেন ‘আশা নীড়’।
শিক্ষার্থীরা তাদের কার্যক্রমকে চারটি বিভাগে ভাগ করেছেন: পানি বিশুদ্ধকরণ সরঞ্জাম, স্যানিটারি সরঞ্জাম, ইমারজেন্সি ঔষধ সরবরাহ, এবং শক্তিবর্ধক ড্রাই ফুডস বিতরণ। এই উদ্যোগে বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। পূর্বাঞ্চলে বন্যার কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে, যার ফলে অনেকেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই সমস্যা মোকাবিলায় তারা বিশেষ প্যাকেট তৈরি করেছেন, যেখানে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ব্লিচিং পাউডার এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ রাখা হয়েছে। এছাড়াও, ক্ষতস্থানের জীবাণু প্রতিরোধের জন্য হেক্সিসল, ব্যান্ডেজসহ অন্যান্য সামগ্রী এবং শক্তি বাড়ানোর জন্য চকলেট, বিস্কুট ও বাদাম বিতরণ করা হবে। তারা আশা করছেন, তাদের এই উদ্যোগ বন্যাদুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সহায়তা করবে।
যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ: বাকৃবির কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং ডিন পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. খন্দকার মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা ও তাদের পুনর্বাসনের জন্য আমাদের শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগ দেখে আমরা গর্বিত। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগগুলো মানবিকতার প্রতীক এবং জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রমাণ। শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, তারা কেবল শিক্ষার্থী নয়; বরং দেশের প্রয়োজনে তারা যেকোনো ধরনের উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত। এই ধরনের কার্যক্রম শুধু দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়ক নয়, বরং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী সামাজিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতেও সাহায্য করবে।‘