বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জব ফেয়ার অথবা নবীনবরণ আয়োজনে স্পন্সর করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে প্রীতি রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটেন্সি লিমিটেডের মৌখিকভাবে চুক্তি হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা কার্যালয়ের প্রধান নিযুক্ত হন। চুক্তি অনুযায়ী ফার্মের একটি প্রজেক্টের (কোমলপানীয় নিয়ে বাজার গবেষণা) জন্য শিক্ষার্থীদের দ্বারা ৫০০ স্যাম্পল সংগ্রহ করে দেয়ার কথা বলা হয়। যার বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের পারিশ্রমিকসহ প্রায় ‘এক লাখ’ টাকা দেওয়ার কথা বলেন ফার্মের এমডি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা ছিল ‘দেড় লাখ’ টাকা।
এরপর ২০২৩ সালের ৭ জুন একটি কর্মশালার মাধ্যমে প্রজেক্টের কাজ শুরু হয়। যা ১৯ জুনের মধ্যে শেষ হয়। এতে চারজন তথ্যদাতা সংগ্রাহকের পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে ৮ জন শিক্ষার্থী কাজ করেন। যারা হলেন, তন্ময় সরকার, আমিন, জয়, সোমা, মৌ, সুরুপা, মাওয়া, মুনমুন। এছাড়াও প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করেন আহনাফ শাহরিয়ার রিকি।
.png)
এদিকে প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পর ‘এক লাখ’ টাকা দেওয়ার কথা বলা হলেও কনসালটেন্সির এমডি নাঈমুর রহমান শিক্ষার্থীদের পারিশ্রমিকসহ ৭০ হাজার টাকার বেশি দিতে পারবেন না বলে জানান। তিনি বলেন, প্রজেক্টটি যথাযথ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের সম্মানে অতিরিক্ত ২০-৩০ হাজার টাকা দিবে বলে জানাই। কিন্তু ছাত্র পরামর্শক ও প্রজেক্ট বাস্তবায়নকারীদের অসহযোগিতায় আমাদের অনেক স্যাম্পল বাদ পড়ে। তাই আমরা অতিরিক্ত টাকা না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
তবে প্রজেক্ট বাস্তবায়নে অসহযোগিতার বিষয়ে শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানান। তাদের ভাষ্য, প্রজেক্ট চলাকালীন ফার্মের প্রতিনিধি হিসেবে সার্বক্ষণিক একজন নিয়োজিত ছিল। যিনি সেসময় শিক্ষার্থীদের কিছু জানাননি।
কনসালটেন্সি ফার্ম ও শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা কার্যালয়ের অ্যাকাউন্টে ৭০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। যেখান থেকে শিক্ষার্থীদের পারিশ্রমিক বাবদ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটরের ৫ হাজার টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু অর্থ প্রাপ্তির প্রায় এক বছর পার হয়ে গেলেও ছাত্র উপদেষ্টা ড. হাবিবুর রহমান শিক্ষার্থীদের অর্থ পরিশোধ করেননি। এমনকি কোনো জব ফেয়ার কিংবা নবীন বরনেরও আয়োজন করা হয়নি।
এ বিষয়ে কো-অর্ডিনেটর আহনাফ শাহরিয়ার রিকি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি জব ফেয়ার আয়োজনের জন্য স্পন্সর হিসেবে প্রজেক্টটি ক্যাম্পাসে আনার ব্যবস্থা করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে আমরা কম টাকায় প্রজেক্টটি করে দিই। যেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের লাভবান হওয়ার পাশাপাশি জুনিয়ররাও যেন গবেষণার হাতেখড়ি শিখতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে ছাত্র পরামর্শক দফতরের অসহযোগিতার কারণে আমাদের বেগ পোহাতে হয়। এতকিছুর পর কোম্পানি আমাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিলেও স্যার তা গোপন করেন। যা অর্থ আত্মসাতের শামিল। অনেক সময় পার হলেও আমরা চাই, আমাদের প্রাপ্য দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়া হোক। নয়ত আমরা আইনি ব্যবস্থায় বিষয়টি নিয়ে আগাব।
তথ্য সংগ্রহকারী তন্ময় সরকার বলেন, আমরা এই বিষয়ে স্যারের সঙ্গে পাঁচবারের বেশি দেখা করি। শুরুর দিকে স্যার বলতেন, কনসালটেন্সি ফার্ম ওনার কাছে টাকা দিলে আমাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিবেন। কিন্তু ঐ প্রজেক্টের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও স্যার আমাদের অর্থ প্রাপ্তির বিষয়ে কিছু জানাননি। ৪-৫ মাস আগেও আমরা স্যারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি ‘সময় নেই’ বলে এড়িয়ে যান।
তবে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে ড. হাবিবুর রহমান বলেন, এ বিষয়ে আমার সঙ্গে কেউ দেখা করেনি। একজন এসেছিল তাকে বলেছি, তোমরা প্রজেক্ট ফেল করেছ।
ফার্মের অর্থ প্রেরণের বিষয়ে ফার্মের এমডি নাঈমুর রহমান বলেন, আমরা যখন টাকা দিতে চাই, ঐ শিক্ষক প্রথমে হ্যান্ড ক্যাশ নিতে চান। কিন্তু, আমরা ডকুমেন্ট ছাড়া দিব না বলে জানাই। পরবর্তীতে তিনি বলেন, ওনার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে দিতে আমরা তাতেও আপত্তি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট দেওয়ার কথা বলি। তারপর তিনি ছাত্র পরিচালনা দফতরের নামে জনতা ব্যাংকের একটি নম্বর দিলে আমরা স্টুডেন্টদের পারিশ্রমিকসহ ৭০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিই।
অর্থ প্রাপ্তির বিষয়টি ছাত্র উপদেষ্টা ড. মো. হাবিবুর রহমান নিশ্চিত করলেও প্রাপ্ত অর্থ শিক্ষার্থীদের নয় বলে জানান। তিনি বলেন, ফার্ম কর্তৃপক্ষ আমাকে জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা প্রজেক্টে ফেল করেছে। তারা কাজ ঠিকভাবে করেনি। তাই তারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে টাকা দিয়েছে।
তবে ফার্মের এমডি বিষয়টিকে অস্বীকার করে বলেন, কাজ করেছে শিক্ষার্থীরা। আমি কেন বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু শুধু টাকা দিব। যেহেতু ছাত্র পরামর্শক এর সঙ্গে যুক্ত, তাই তাকেই পুরো টাকাটা দেয়া হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, বিষয়টি আমি মাত্রই শুনলাম। উক্ত শিক্ষকের সঙ্গে আমি কথা বলব। যদি বিষয়টি সত্যি হয় তাহলে দ্রুত এর সমাধান করে নিতে বলব।