সরেজমিনে দেখা যায়, কাক ডাকা ভোরে লাইব্রেরির সামনে সারি সারি রাখা ব্যাগের দীর্ঘ লাইন। এছাড়া লাইব্রেরিতে প্রবেশে যেন দৌড়ের প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতায় দৌড়ে যারা লাইব্রেরিতে সারা দিনের জন্য একটি আসন দখলে রাখতে পারবে।
জানা যায়, রোববার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা, শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা এবং শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে ঢাবি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছে অনেকটাই আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার।
.png)
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আসন সংকটের মাঝেও গড়ে ১ হাজার ৪০০ জন ছাড়িয়ে যায় প্রতিদিনের উপস্থিতিতে, এই উপস্থিতির পুরোটা জুড়েই থাকেই চাকরির প্রত্যাশীদের সংখ্যা। সরেজমিনে দেখা যাবে, এদের সবার সামনে থরথরে রাখা থাকে চাকরির গাইড বই। সবাই মুখ গুঁজে আছেন চাকরির বইতে। দেখা যায়, লাইব্রেরিতে অ্যাকাডেমিক বই পড়তে আসা মানুষদের সংখ্যা একেবারেই নেই বলেই চলে। হাতে-গোনা দুই একজন।
ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সূত্রে জানা যায়, গত তিন মাসের মধ্যে জানুয়ারিতে পাঠক ছিল সবচেয়ে বেশি। এ মাসে ১ হাজার ২০৫ জন, বই ইস্যু হয়েছে ২ হাজার ১২টি এবং ফেরত এসেছে ২ হাজার ২৫ টি। ফেব্রুয়ারিতে পাঠক সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯৪ জন, বই ইস্যু হয়েছে ১ হাজার ৯১২টি এবং ফেরত এসেছে ১ হাজার ৯৮৩টি এবং গত মার্চে পাঠক এসেছে ১ হাজার ১৭১ জন, ইস্যু হয়েছে ১ হাজার ৮০৭টি এবং ফেরত এসেছিল ১ হাজার ৮৫০টি।
এ নিয়ে বেশ কয়েকজন চাকরি প্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা হয় ডেইলি বাংলাদেশের। তারা জানায়, বয়সও শেষে দিকে আবার অনার্স ও মাস্টার্স শেষ। এখন সবার তো প্রত্যাশা থাকেই। পরিবারের লোকজন, প্রতিবেশী সবাই উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন যে ভালো একটা চাকরি করব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাস্টার দা’ সূর্য সেন হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়েছি অনেকেই ভাবে বিসিএস আমাকে দিতেই হবে এবং ক্যাডার হয়ে ফিরতেই হবে। এই এক ধরনের সামাজিক চল, যেটি না চাইলেও এখানকার শিক্ষার্থীরা এটি পাস কাটাতে পারে না। সেই থেকেই এখানে নিয়মিত আসা। তাছাড়া এখানে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হওয়াতে হলের রিডিং রুমের তুলনায় সেন্ট্রাল লাইব্রেরি বেশ ফ্রেন্ডলি।
তিনি আরো বলেন, এখানে বর্তমান আসন সংকট রয়েছে। কর্তৃপক্ষের উচিত হবে এই দিকটাতে একটু ফোকাস দেওয়া। কেননা, প্রতিদিনই এখানে চাকরি প্রত্যাশীরা আসে। এছাড়া অ্যাকাডেমিক বই পড়তে তো একটা সংখ্যক শিক্ষার্থী এসেই থাকে। তাই আসন সংকটের সমস্যাটি নিরসন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দায়িত্বে থাকা এক উপ-গ্রন্থাগারিক বলেন, পাঠক আগের তুলনায় অবশ্যই বেড়েছে, তবে সেটি চাকরি প্রত্যাশীদের সংখ্যা। আগে যেমন টেক্সট বই পড়তে এখানে আসত, এখন সেটি আর আগের মত নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দিন মুন্সী ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, যখন একজন শিক্ষার্থী সবে দ্বিতীয় বর্ষে ওঠে তখন থেকেই সেই লাইব্রেরিতে আসে বিসিএসের প্রস্তুতি নিতে। অথচ কথা ছিল উলটো; বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সেমিস্টার সিস্টেম সেখানে শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিক বইমুখী হয়ে লাইব্রেরি আসা-যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন তারা চাকরির পড়াশোনা করছে। কেননা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী পাস করে চাকরি পাচ্ছে না, তখন তারা এই দায় এড়াতে এখন থেকে চাকরিমুখী পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় বহিরাগতরা প্রবেশ করে এমন সত্যতা মিলে ঢাবির গ্রন্থাগারে উপ-গ্রন্থাগারিক সাইফুল ইসলাম মোল্লার কথায়। তিনি বলেন, এসব তো এমনি আসে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই আনে।
এমন বেশ কয়েকটি ঘটনার কথাও বলেন তিনি। একদিনের ঘটনার বর্ণনা অনেকটা এভাবেই দেন, বহিরাগত ছাত্র পেলে, পরে কেউ না কেউ বলে বসে ‘ছেড়ে দেন আমার পরিচিত’। তার বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দায়ী করা হয়, এসব বহিরাগত প্রবেশে।
_1716275445.jpg)
এদিকে অভিযোগ রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থী পাশাপাশি অছাত্রদের লাইব্রেরিতে প্রবেশ হরহামেশাই ঘটছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী সঙ্গে কথা হয়। যিনি তার এলাকার বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে নিয়মিত যাতায়াত করেন লাইব্রেরিতে। যদিও কীভাবে যাতায়াত করেন তা জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করেন ঐ শিক্ষার্থী।
এদিকে গত ১০ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, এখন লাইব্রেরিতে সবাই বিসিএস পড়ার জন্য যায়। আমরা লাইব্রেরিতে কার্ড পাঞ্চ পদ্ধতি চালু করব। যেসব শিক্ষার্থীর ছাত্রত্বের মেয়াদ শেষ তারা কেবল বিসিএস পড়তে যায় লাইব্রেরিতে। এর ফলে তাদের প্রবেশ অসম্ভব হয়ে যাবে, সেখানে কার্ড পাঞ্চ করে যেতে হবে।
তার কয়েকদিন যেতে না যেতেই আইডিকার্ড পাঞ্চ করে গ্রন্থাগারে প্রবেশের নির্দেশনা দেয় কর্তৃপক্ষ। যার একটি কপি ডেইলি বাংলাদেশের হাতেও এসেছে, যেখানে বলা হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ব্যবহারকারী ছাত্র-ছাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০২১- ২০২২ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীরা ই-গেইটে তাদের ডিজিটাল আইডি কার্ড ব্যবহার করে গ্রন্থাগারে প্রবেশ করবে। কোনো রকম অসুবিধা হলে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ডিজিটাল কার্ড শাখায় (কক্ষ-১১১) যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুন মাস থেকে তা পুরোপুরি কার্যকর হবে। এর ফলে বহিরাগত ও মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থী আপনা-আপনি কমে আসবে, যার ফলে অনেকটাই কমবে চাকরি প্রত্যাশীদের পড়াশোনা।