বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নিতে চার বছর সহযোগী অধ্যাপক পদে (ফিডার পদ) থাকার শর্ত থাকলেও তা শিথিল করে তিন বছর করা হতে পারে। এতে চাপা ক্ষোভ দেখা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের মধ্যে। ইউজিসির নিয়ম উপেক্ষা করায় এ নিয়ে সমালোচনাও সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ২৫ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপক নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আবেদনকারীকে পিএইচডি বা সমমান ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১২ বছর, তন্মধ্যে সহযোগী অধ্যাপক বা সমমান পদে ন্যূনতম ৪ বছর, এমফিল/সমমান বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম ১ বছরের বিদেশি দ্বিতীয় মাস্টার ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের ন্যূনতম ১৫ বছর, তন্মধ্যে সহযোগী অধ্যাপক বা সমমান পদে ন্যূনতম ৫ বছর এবং যেসব প্রার্থীর কোনো উচ্চতর ডিগ্রি নেই, তাদের ন্যূনতম ১৯ বছর, তন্মধ্যে সহযোগী অধ্যাপক বা সমমান পদে ন্যূনতম ৭ বছরের স্নাতক অথবা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষকতার অথবা স্বীকৃত উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
.png)
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক অধ্যাপক জানান, কিছু জুনিয়র শিক্ষককে সুবিধা দিতে পিএইচডি বা সমমান ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১২ বছর, তন্মধ্যে সহযোগী অধ্যাপক বা সমমান পদে ন্যূনতম ৪ বছরের শর্তকে শিথিল করে ৩ বছর করা হতে পারে। এতে নতুন করে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবেন, তাদের সঙ্গে সিনিয়রদের ব্যবধান কমে যাবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পদোন্নতির ভারসাম্য ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
এদিকে পদোন্নতির জন্য ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালাও মানছে না জবি। ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালা অনুযায়ী, সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য ৫ বছর সময়ের নিয়ম থাকলেও জবিতে তা চলছে ৪ বছরের নিয়মে। এবার বিশেষ কয়েকজন শিক্ষককে সুবিধা দিতে সেই শর্তও শিথিল করে কমিয়ে ৩ বছর করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অধ্যাপক বলেন, মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল মালেক, শিক্ষক সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সহযোগী অধ্যাপক ড. শেখ মাশরিক হাসান, অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক ড. মো. মহসীন রেজাসহ কয়েকজনকে এই সুবিধা দিতেই পদোন্নতির শর্ত শিথিল করতে এমন তোড়জোড় চালানো হচ্ছে।
জবি শিক্ষক সমিতির একজন সাবেক সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে রেয়াতের নিয়ম আছে। তবে সেটি মোট ১২ বছরের ক্ষেত্রে। তবে ফিডার পদে ৪ বছরের যে শর্ত ছিল, তা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে রেয়াতের নিয়ম নেই। আমার জানামতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন নিয়ম নেই। ১২ বছরের শর্ত এবং ফিডার পদে (সহযোগী অধ্যাপক বা সমমান পদে) ৪ বছরের শর্ত শিথিল করা উচিত হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক হতে এত তাড়াহুড়া করা ঠিক না। একজন সহযোগী অধ্যাপক ৪ বছর স্বপদে থাকলে তার জ্ঞানের গভীরতা এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যা কম সময়ে সম্ভব হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, ইউজিসির নিয়ম অনুযায়ী- সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ৫ বছর থাকা লাগবে। সেখানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনিতেই ১ বছর কম করা আছে। আবার নতুন করে ১ বছর কমানো ঠিক হবে না। আমার মনে হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের মান নিশ্চিত হবে না। তাছাড়া নতুন নিয়মে যাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হবে, তাদের ব্যাপারে খবর নিলে জানা যাবে, তাদের পিএইচডিতেও অতিরিক্ত ছুটি নিয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন বলেন, ইউজিসির কমন রুলস এখনও কোথাও গৃহীত হয়নি। তবে যে নিয়মই করা হোক, ১২ বছরের নিচে অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ নেই। যদি নিয়ম করাও হয়, তাহলে সেটা খুবই কঠিন শর্তে আসবে। যদি অতিরিক্ত প্রকাশনার বিষয়ও থাকে তবে তা উচ্চমানের জার্নালে থাকতে হবে, তবে সেটা অনেক কঠিন। সেক্ষেত্রে শিক্ষকরা উৎসাহিত হবেন উচ্চমানের জার্নালে পাবলিকেশন আনতে। তবে আমার মনে হয়, বছরে ১ জনও হয়তো এভাবে পদোন্নতি পাবেন না। স্বপদে বা ফিডার পদে এমন নিয়মে করলেও কোনোভাবেই ১২ বছরের আগে পদোন্নতি হতে পারবে না।
গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, এটা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে বিভিন্ন নিয়ম করে রাখে। আমার জানামতে, ফিডার পোস্টে এমন রেয়াতের নিয়ম নাই। এটা সঠিক হবে না। দুয়েকজনকে বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক যদি নিয়ম করে ফেলা হয় তবে সেটা শোভন নয়।
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল মালেক বলেন, আমি তো অধ্যাপক পদে আবেদন করছি না, সময়ও হয়নি আমার। আর এমন কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানাও নেই। প্রজ্ঞাপনও মনে হয় আসেনি। তবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রেয়াতের নিয়ম আছে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই শর্ত শিথিলের এমন নিয়ম করা হচ্ছে। শিক্ষকদের ভালো মানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করতে আগ্রহী করতে এবং গবেষণার প্রতি আগ্রহী করতেই পদোন্নতির এই শর্ত শিথিল করা হচ্ছে। র্যাংকিংয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে এটি ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে প্রশাসন। তবে ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালা না মানার ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই প্রশাসনের কাছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, এই বিষয়টি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি ছিল বলা যায়। ভালো জার্নালে প্রকাশিত ভালো মানের গবেষণা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষকরা যাতে দ্রুত অধ্যাপক হতে পারেন, সেজন্য এই সুবিধাটি চালু করা হচ্ছে। এতে শিক্ষকরা গবেষণার প্রতি আগ্রহী হবেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংও বাড়বে।
এতে ইউজিসির নিয়মের ব্যত্যয় হচ্ছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে রেজিস্ট্রার বলেন, এখানে ইউজিসির নিয়মও ফ্লেক্সিবল বলা যায়। ইউজিসির নিয়মের ব্যাখ্যা কী আছে, তা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।
ইউজিসির সচিব ড. ফেরদৌস জামান বলেন, শিক্ষকদের পদোন্নতির নিয়মনীতি নিয়ে ইউজিসির একটি অভিন্ন নীতিমালা আছে। সেটা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই করা হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধিদের নিয়ে তাদের মাধ্যমেই এই নীতিমালা করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব বিশ্ববিদ্যালয়কে এটি অনুসরণ করার নির্দেশনাও দিয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নীতিমালার বাইরে কিছু করা হচ্ছে কি না, সেটা জানা নেই। না জেনে কিছু বলতে পারছি না।