নিজের মধ্যে কিছু একটা করার জেদ চেপে বসে। শুরু হয় আয়ের উৎস খোঁজা। দীর্ঘ এই সময়ে কি করবেন ভেবে না পেয়ে হঠাৎ মুরগি পালনের সিদ্ধান্ত নেন৷ হীনম্মন্যতা, লোকলজ্জা, লাভ-লোকসান, ভয়, সংশয়সহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে পরিবারের সহায়তায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকার পুঁজিতে বাড়ির পাশের পরিত্যক্ত তাঁতকলের ঘরে ব্রয়লার মুরগি পালন শুরু করেন। তখন থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি৷ দেড় বছরের ব্যবধানে ভাগ্য খুলেছে। এখন প্রতিমাসে আয় লাখ টাকা। কোনো মাসে এর বেশিও হয়ে থাকে।
তরুণ এই উদ্যোক্তা হলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মো. সাইদুল ইসলাম। নরসিংদী জেলার মাধবদী থানার চরদিঘলদী ইউনিয়নের আড়াইআনী গ্রামে তার বাড়ি। গুলেস্তাহাফিজ মেমোরিয়াল উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও আব্দুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন।
.png)
শুরুর গল্প সম্পর্কে সাইদুল ইসলাম বলেন, ঐ সময়টাতে (২০২০ সাল) অনেক মানুষ চাকরি হারাচ্ছিল। তার দুই ভাই তখন বিদেশে থাকতেন। তারাও কাজ হারান। পিতৃহীন পরিবারে তখন টানাপড়েন চলছিল। হাত খরচের টাকা চাইতে নিজের কাছে ছোট মনে হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের একের পর এক ছুটি বাড়তে থাকায় অলস সময়ে একই ইউনিয়নের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বন্ধুর পরামর্শে মুরগি পালনের সিদ্ধান্ত নিই।
সাইদুল ইসলাম বলেন, আমি ও আমার পরিবারের কোনো সদস্যের খামার করার অভিজ্ঞতা ছিল না। ইউটিউবে ভিডিও দেখে ও পাশের এলাকাগুলোর খামারে ঘুরে ঘুরে দেখতাম কীভাবে মুরগি পালন করতে হয়। অসুখ-বিসুখ হলে কোন ওষুধ দিতে হয়। এসব টিউটরিয়াল ভিডিও অনলাইনে বেশি দেখতাম।
তরুণ এই উদ্যোক্তা জানান, শুরুর দিকে পোল্ট্রি নাকি সোনালি মুরগির খামার দেবেন তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। পরে নিজে এককভাবে পোল্ট্রি মুরগি খামার দেন। অন্য তিন বন্ধু যৌথভাবে শুরু করে সোনালি মুরগির খামার। যে সময়ে মানুষ কর্মসংস্থান হারাচ্ছিল তখন প্রথম দফায় ১৫ হাজার টাকা লাভ করেন তিনি। সেই থেকে মুনাফা শুরু। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে সাইদুল ইসলাম বলেন, কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা মাথায় নিয়েই ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নিই। শুরুটা এতটা সহজ ছিল না। পরিবারকে বুঝিয়ে অল্প পুঁজি দিয়ে মুরগি পালন শুরু করি। প্রথম দফায় ১৫ হাজার টাকা লাভ হয়। এটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম উপার্জন। আমার সঙ্গে অন্য তিন বন্ধু যৌথভাবে খামার দিয়েছিল, তারা ব্যবসায় লোকসান গুণে খামার বন্ধ করে দেয়।
পরিবার ও গ্রামাঞ্চলের লোকজন প্রথমে এটিকে ভালোভাবে নেয়নি উল্লেখ করে সাইদুল বলেন, নিজের পরিবারের লোকজনই প্রথমে ভরসা করতে চায়নি। পরে অনেক বুঝিয়ে তাদের রাজি করাই। গ্রামের মানুষও বাঁকা চোখে দেখত। বর্তমানে পরিবারের সদস্যের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। খামারে ২ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। পাশাপাশি সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টেছে।
ব্রয়লার মুরগি পালন অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সচেতনতা ও বুদ্ধি খাটাতে পারলে সহজেই সফলতা পাওয়া সম্ভব। ব্রয়লার মুরগির বাজার দর সাধারণত উঠানামা করে। তিনটি শেডে ১০ দিন আগে-পরে বাচ্চা দেওয়া হয়। এতে মুরগি বিক্রির সময় পুরো মাস মুরগি থাকে। এক সপ্তাহ বাজার দর কম থাকলেও অন্য দুই সপ্তাহে বেশি থাকে। এতে ভারসাম্য আসে ও বেশি লাভ হয়। তাছাড়া নরসিংদীর কোনো ডিলার থেকে বাচ্চা না নিয়ে সরাসরি কোম্পানি থেকে বাচ্চা নেওয়ায় একটু বেশিই সুবিধা পেয়ে থাকি।
ধীরে ধীরে খামার বৃদ্ধি ও মুনাফার পরিমাণ বাড়তে থাকে। বর্তমানে তিনটি শেডে প্রায় ৩ হাজার মুরগি পালন করেন তিনি। তার এ উদ্যোগ যেমন পরিবারের স্বচ্ছতা এনে দিয়েছে তেমনি নরসিংদীর প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় মাংসের চাহিদাও পূরণ করছে।
ক্যাম্পাস খোলার পর খামার দেখাশোনা করেন সাইদুল ইসলামের ভাই আবু সিদ্দিক। বিদেশ থেকে আসার পর একটা দুর্ঘটনায় তার পা ভেঙে যায়। তারপর আর তার বিদেশ যাওয়া হয়নি। সাইদুল এখন রাজশাহীতে বসেই মুঠোফোনে তাকে দিকনির্দেশনা ও বিভিন্ন পরামর্শ দেন।
আবার ক্যাম্পাস ছুটি থাকলে নিজে বাড়িতে গিয়ে খামারের মুরগি দেখাশোনা ও পরিচর্যা করেন। সাইদুল ইসলাম স্বপ্ন দেখেন ভবিষ্যতে যে পেশাতেই থাকেন না কেন তার পাশাপাশি এই খামারকে আরো সম্প্রসারিত করে সমাজের বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন।
সাইদুলের ভাই আবু সিদ্দিক খামার দেখাশোনার পাশাপাশি কাঠের ব্যবসা করেন। তিনি অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, প্রথমে আমরা সাইদুলের ওপর ভরসা করতে পারছিলাম না। সাইদুল অনেক বুঝিয়ে আমাদের রাজি করে। পরে ধীরে ধীরে আমাদের ভাগ্যের চাকা খুলতে থাকে। প্রতি মাসে এখন লাখ টাকারও বেশি আয় হয়। আল্লাহর রহমতে এখন আমরা অনেক ভালো আছি। আমরা সাইদুলকে নিয়ে গর্বিত।