ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

[ অর্থনীতি ]

ঐতিহ্যের মসলিনে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা

ডেইলি-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩:০৬, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
ঐতিহ্যের মসলিনে রপ্তানির নতুন সম্ভাবনা
সংগৃহীত ছবি

প্রায় ১৭০ বছর পর আবার বাণিজ্যিক উৎপাদনের পথে এগোচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন। হারিয়ে যাওয়া ফুটি কার্পাস তুলা ও মসলিন তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধারের পর এবার আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জাপানের বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রহ এবং ৫০০ গজ মসলিন কাপড়ের একটি আন্তর্জাতিক অর্ডার সম্পন্ন হওয়ার তথ্য এ সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।

তবে উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের সীমিত সরবরাহ ও দীর্ঘ উৎপাদনপ্রক্রিয়া এ শিল্পের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য, সরকারি গবেষণায় পুনরুদ্ধার করা প্রযুক্তি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, ফুটি কার্পাসের উৎপাদন বাড়ানো এবং মসলিনকে টেকসই বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়িত মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা। বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

মসলিনের অতি সূক্ষ্ম সুতা কাটার জন্য ৩০০-এর বেশি প্রান্তিক নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোয় প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকাই মসলিন হাউস’কে কেন্দ্র করে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদ্যোগও চলছে।

ঢাকাই মসলিনের বাণিজ্যিক উৎপাদনে সবচেয়ে বড় বাধা এর উচ্চ ব্যয়। প্রথম দিকে একটি মসলিন শাড়ি তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। একটি শাড়ি বুনতে দুই থেকে চারজন তাঁতির কয়েক মাস সময় লাগে।

এ কারণে সাধারণ পোশাকের বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল ফ্যাশনপণ্য হিসেবে মসলিনকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা বাস্তবসম্মত হতে পারে।

ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে শাড়িপ্রতি ব্যয় এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এটি এখনো একটি পরিকল্পনা। বাস্তবে উৎপাদন ব্যয় কতটা কমানো সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে কাঁচামালের সরবরাহ, প্রযুক্তির উন্নয়ন, কারিগরদের দক্ষতা এবং উৎপাদনের পরিমাণের ওপর।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প বড় পরিসরে উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ভিত্তিতে এগিয়েছে। কিন্তু মসলিন তৈরির প্রক্রিয়া ভিন্ন। এ ক্ষেত্রে অতি সূক্ষ্ম সুতা তৈরি, দক্ষ কারিগর এবং কাপড়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখাও জরুরি।

মসলিন তৈরির বিশেষ কাঁচামাল ফুটি কার্পাসের সরবরাহ বাড়াতে কাপাসিয়া, রাজশাহী ও কুমিল্লার কৃষকদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক চাষের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তুলার ফলন, আঁশের গুণমান ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া উন্নত করতে গবেষণা চলছে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সম্প্রতি জানিয়েছেন, গবেষকেরা এমন জাত উদ্ভাবনে কাজ করছেন, যাতে তুলার ফলন বাড়ে এবং বড় ও বেশি তুলাযুক্ত বীজকোষ পাওয়া যায়।

২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড মসলিন পুনরুদ্ধারে গবেষণা শুরু করে। ঐতিহাসিক তথ্য ও বিভিন্ন অঞ্চলের বুনো তুলার জাত সংগ্রহ করে গবেষকেরা ফুটি কার্পাস শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত পুরোনো মসলিনের নমুনার সঙ্গে তুলনা করেও গবেষণা এগিয়ে নেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পুনরুজ্জীবিত মসলিনের সুতার কাউন্ট ৭৩১ থেকে ৭৫০ মেট্রিক পর্যন্ত পৌঁছেছে। সাধারণভাবে সুতার কাউন্ট যত বেশি হয়, সুতা তত সূক্ষ্ম হয়।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকাই মসলিন বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। এই স্বীকৃতি পণ্যটির স্বতন্ত্র পরিচিতি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়মিত বিক্রি নিশ্চিত করতে কার্যকর বিপণন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রধানত তৈরি পোশাকনির্ভর। ঢাকাই মসলিনের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ সফল হলে ঐতিহ্যভিত্তিক উচ্চমূল্যের বস্ত্র রপ্তানির নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি তুলাচাষি, সুতা কাটার কারিগর ও তাঁতিদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।

তবে ৫০০ গজের একটি অর্ডার সম্পন্ন হওয়া কিংবা বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর আগ্রহের তথ্য থেকেই বড় রপ্তানি বাজার গড়ে ওঠার সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ক্ষেত্রে অর্ডারের মূল্য, ক্রেতাদের পরিচয়, পুনরায় অর্ডার পাওয়ার তথ্য, বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা এবং প্রকৃত রপ্তানি আয়ের হিসাব প্রকাশ করা জরুরি। এসব তথ্য ছাড়া প্রকল্পটির বাণিজ্যিক সাফল্য মূল্যায়ন করা কঠিন।

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমও মসলিন তৈরির প্রযুক্তি দ্রুত বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর এবং গবেষণার মাধ্যমে ফুটি কার্পাসের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের পর এখন ঢাকাই মসলিনের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন। সরকারি গবেষণা, পর্যাপ্ত কাঁচামাল, দক্ষ কারিগর, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়মিত ক্রেতা নিশ্চিত করা গেলে ঐতিহ্যবাহী এই বস্ত্র বাংলাদেশের রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!