বৃষ্টির ধাক্কায় উত্তপ্ত কাঁচাবাজার
রাজধানীর কাঁচাবাজারে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের শাকসবজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। টানা বৃষ্টিপাত, সরবরাহ সংকট এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে কার্যকর তদারকির অভাব ও সিন্ডিকেটের কারণেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মালিবাগ, রামপুরা ও নিউমার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, হাতে গোনা দু-একটি সবজি ছাড়া প্রায় সব ধরনের সবজির দাম এখন ১০০ টাকার ওপরে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৮০ টাকায়। এ ছাড়া লম্বা বেগুন ১২০ টাকা, গোল বেগুন ১৬০ টাকা, করলা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, উচ্ছে ১৪০ টাকা, শসা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং পাকা টমেটো ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পটল ও ঢ্যাঁড়স ৮০ টাকা, ঝিঙা ও চিচিঙ্গা ১০০ থেকে ১২০ টাকা, বরবটি ও কাঁকরোল ১২০ টাকা, কচুর লতি ১০০ টাকা এবং কচুর মুখী ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সাইজভেদে প্রতিটি লাউ ১০০ টাকা এবং জালি কুমড়া ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তুলনামূলকভাবে দাম কম আছে শুধু পেঁপে ও আলুর বাজারে। পেঁপে প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং আলু ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশি পেঁয়াজের দাম ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, ফার্মের ডিমের ডজন ১৪০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২১০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা কেজি।
.png)
সবজির লাগামহীন দামে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। সংসারের মাসিক বাজেট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। মালিবাগ বাজারে কেনাকাটা করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী হায়দার আলী বলেন, ‘গত কিছুদিন ধরেই সবজির দাম বেশি ছিল। কিন্তু এখন বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। কাঁচা মরিচ কিনেছি ২৮০ টাকা কেজি দরে। এভাবে বাজার করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। বাজারে কার্যকর মনিটরিংও দেখা যাচ্ছে না।’রামপুরা বাজারের ক্রেতা ও বেসরকারি চাকরিজীবী মাসুদ রানা বলেন, ‘ভাবছিলাম, সবজির দাম কিছুটা কমবে। কিন্তু এখন সবজি কিনতেই পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে। তাহলে মাছ-মাংস কিনব কীভাবে? দেখার কি কেউ নেই?’ নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী নাজমা আক্তার বলেন, ‘চার সদস্যের পরিবারের জন্য এক কেজি সবজি এক বেলাও যথেষ্ট হয় না। অথচ ভালো মানের একটি সবজি কিনতেই ১০০ থেকে ১৩০ টাকা খরচ হচ্ছে। সরকারের উচিত দ্রুত বাজার তদারকি জোরদার করা।’
ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়াচ্ছেন না। পাইকারি বাজারে বেশি দামে কিনতে হওয়ায় খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়ছে। কারওয়ান বাজারের পাইকারি সবজি বিক্রেতা আব্দুল মতিন বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক কৃষক সময়মতো ফসল তুলতে পারছেন না। ফলে রাজধানীতে সরবরাহ কমে গেছে। ট্রাকে কম পণ্য আসায় আমাদেরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।’শান্তিনগর বাজারের খুচরা বিক্রেতা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। বৃষ্টির কারণে অনেক সবজি নষ্ট হয়ে যায়। এতে লোকসানের ঝুঁকি থাকে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দাম কমার সম্ভাবনা কম।’
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতা রয়েছে। সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগেও একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী সুযোগ নেয়। কোল্ড স্টোরেজ ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষকও ন্যায্য দাম পান না। দীর্ঘমেয়াদে কৃষি বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মাঠপর্যায়ে কঠোর বাজার তদারকি প্রয়োজন।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজমুল হুদা বলেন, নিয়মিত বাজার তদারকির অভাব এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিকে অজুহাত করে পণ্যের দাম দ্বিগুণ হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। পাইকারি ও খুচরা বাজারের দামের ব্যবধান খতিয়ে দেখতে সরকারের টাস্কফোর্সকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম জানান, বাজার নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ও পাইকারি আড়তে প্রতিদিন একাধিক টিম অভিযান পরিচালনা করছে। কোথাও অতিরিক্ত মূল্য আদায় বা সিন্ডিকেটের প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা, সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং বাজারে কঠোর নজরদারির মাধ্যমেই কাঁচাবাজারের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অন্যথায় নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির চাপ আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘস্থায়ী হবে।