ঢাকা,  সোমবার   ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

ইউটিউব দেখে পটল চাষ, পাহাড়ে নতুন সম্ভাবনা গড়ছেন আনোয়ার

মাটিরাঙ্গা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:১১, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
ইউটিউব দেখে পটল চাষ, পাহাড়ে নতুন সম্ভাবনা গড়ছেন আনোয়ার
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সবজির বাজারে পটল এক অনন্য ও অতি পরিচিত নাম। গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা, সারা বছরই বাঙালির রান্নাঘরে পটলের কদর। মাছের ঝোল, পটলের দোলমা কিংবা চিংড়ি-পটল, নানা পদের ভিড়েও পটল নিজের স্বকীয়তা ধরে রাখে। তবে এসব পদের মধ্যে পটলের খোসা দিয়ে তৈরি ভর্তার স্বাদ যেন একেবারেই আলাদা। অথচ বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, মাটিরাঙ্গায় এই জনপ্রিয় সবজির চাষ একসময় প্রায় ছিলই না।

সেই শূন্যতার জায়গায় নতুন আশার বীজ বুনে পাহাড়ি জনপদে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাড়ার উদীয়মান কৃষি উদ্যোক্তা মো. আনোয়ার হোসেন। ইউটিউবে পটল চাষের ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পরীক্ষামূলকভাবে পটল চাষ শুরু করেন তিনি। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির বলে তিনি এখন এলাকার কৃষকদের কাছে রোল মডেল। তার সফলতা দেখে আশেপাশের আরও কৃষক পটল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

২০২৪ সালে নওগাঁ থেকে বারি-১ এবং বারি-২ জাতের ১০০টি পটলের চারা-কলম সংগ্রহ করেন আনোয়ার। খরচসহ প্রতিটি চারা-কলমের দাম পড়ে ১৭ টাকা করে। মূলত পটলের লতা থেকেই বীজ ও নতুন চারা তৈরি হয়। আর রোপণের মাত্র দুই মাস পর থেকেই খেত থেকে ফসল তোলা শুরু করা যায়।

এবার ধানের জমিতে ১০ শতক জায়গায় মাচা তৈরি করে পরীক্ষামূলকভাবে পটল আবাদ করেন তিনি। জমি তৈরি, চারা, জৈব সার, বালাইনাশক, হলুদ ফেরোমন ফাঁদ ও মাচা তৈরি এবং শ্রমিক খরচ সহ সব মিলিয়ে ১০ শতকে তার খরচ হয়েছে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। প্রতি ১০ শতক জমি থেকে মাসে গড়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ কেজি পটল পাওয়া যাচ্ছে।

সরেজমিনে পটলখেতে গিয়ে দেখা যায়, সূর্য অস্ত যাওয়ার মুহূর্তে মাচাজুড়ে ঝুলে আছে সারি সারি সবুজ পটল। অস্তগামী সূর্যের সোনালি আভায় সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলে থাকা পটলগুলো যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা করেছে। চোখজুড়ানো সেই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।

মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলায় মাত্র ১ হেক্টর জমিতে পটলের আবাদ হয়েছে। এ মৌসুমে পটল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ মেট্রিক টন।

মৌসুমের শুরুতে প্রতি কেজি পটল ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হলেও বাজারে শীতকালীন সবজি আসায় এখন দাম নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়।

আনোয়ারের সফলতা দেখে চরপাড়ার আরেক কৃষক বাচ্চু মিয়া ১০ শতক জমিতে পটল চাষ করেছেন। ওয়াছু এলাকার কৃষক ছাত্তারও একই পরিমাণ জমিতে পটল লাগিয়েছেন। সব মিলিয়ে তিন স্থানে মোট ৩০ শতক জমিতে এখন পটল চাষ হচ্ছে।

পটলের পাশাপাশি আনোয়ার পুরো এক একর জমিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো ও পেঁপেসহ মিশ্র সবজি চাষ করেছেন। এর মধ্যে ৫ হাজার কপির চারা রোপণ করা হয়েছে। চারা রোপণ থেকে পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কপির পেছনে খরচ হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। প্রতি ১০ শতক জমিতে মাসিক খরচ গড়ে প্রায় ২ হাজার টাকা।

আনোয়ার, বাচ্চু মিয়া ও আব্দুস ছাত্তার, তিনজনের কারোরই নিজের জমি নেই।  অন্যের জমি বর্গা নিয়ে তাঁরা চাষ করছেন। আনোয়ার একর প্রতি ৮০ হাজার টাকায় জমি নিয়ে বিভিন্ন সবজি আবাদ করছেন। 

সফল এই উদ্যোক্তা মো. আনোয়ার হোসেন আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, “ব্যতিক্রমী ফসল করার চিন্তা থেকে ইউটিউব ফলো করে পটল চাষ শুরু করি। ভালোই ফলন হয়েছে এখন। ভবিষ্যতে আরও ব্যতিক্রমী কিছু করার চিন্তা রয়েছে।”

মাটিরাঙ্গা পৌর এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেবাশীষ চাকমা বলেন, “আনোয়ার অত্যন্ত পরিশ্রমী একজন যুবক। তিনি ইউটিউব দেখে নিজ উদ্যোগেই উন্নত জাতের পটল চাষ শুরু করেছেন। আমাদের পক্ষ থেকে তাকে নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। তার এই উদ্যোগ দেখে অন্য কৃষকরাও সবজি চাষে এগিয়ে আসছেন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক।”

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, “ধানের জমিতে মাচা তৈরি করে পটল চাষ এবং বর্গা জমিতে মিশ্র ফসল ফলানোর বিষয়টি সত্যিই প্রশংসনীয়। মাটিরাঙ্গার মাটি ও আবহাওয়া শাকসবজি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। কৃষি বিভাগ সবসময় এ ধরনের উদ্যমী কৃষকদের কারিগরি সহায়তা, মানসম্মত বীজ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। আনোয়ারের এই সাফল্য এলাকার বেকার যুবকদের কৃষিতে স্বাবলম্বী হতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।”

ডেইলি-বাংলাদেশ/মাটিরাঙ্গা/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!