কয়রায় ৯৫ শতাংশ মানুষের কাঁচা ঘরে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস
খুলনার কয়রা উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে হাজতখালি গ্রাম। সেখানেই স্বামীর ভিটায় পলিথিন আর জিও ব্যাগে মোড়ানো ছোট্ট একটি খুপড়িতে রাত কাটে সুধা সরকারের (৬০)। জীবনের শেষ বয়সে এসেও তার মাথার ওপর নেই নিরাপদ ছাদ। অথচ একসময় এই ভিটাতেই ছিল তার সংসার, ছিল স্বামী-সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
বিয়ের ১২ বছর পর প্রথম সন্তানের মা হয়েছিলেন সুধা। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মেয়ের বয়স যখন মাত্র তিন মাস, তখনই মারা যান তার স্বামী। ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম। অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে কোনোমতে স্বামীর ভিটায় টিকে ছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে তার মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও ভেঙে তছনছ হয়ে যায়। এরপর ছয় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন করে ঘর নির্মাণ করতে পারেননি তিনি।
সুধার বাড়ি থেকে এক রশি পথ উত্তরে কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধের ঢালে বসবাস করেন গৌরপদ মণ্ডল। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। নদীর পাড়ের এই বসতিই এখন তাদের ঠিকানা। তবে একসময় তাদেরও ছিল নিজস্ব বাড়ি ও জমি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) গৌরপদ মণ্ডলের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার ছেলে শান্ত মণ্ডলের সঙ্গে। বেড়িবাঁধের ঢালে বসবাসের কারণ জানতে চাইলে শান্ত বলেন, ‘বাবার মুখে শুনেছি, আমাদের বাড়ি ছিল হাজতখালি খালের পাড়ে। আমি তখন খুব ছোট। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় ওবদার বাঁধ ভেঙে আমাদের বাড়িঘরসহ আশপাশের অনেক গ্রাম লোনাপানিতে তলিয়ে যায়। জোয়ার-ভাটার পানিতে কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের ঘরবাড়ি ও জমি হাজতখালি খালে বিলীন হয়ে যায়।
এরপর থেকে বেড়িবাঁধের ঢালেই তাদের বসবাস। আইলার পর ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও নিজের ভিটায় আর ফিরতে পারেননি তার বাবা। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্যও হয়নি পরিবারের।
শুধু সুধা সরকার বা গৌরপদ মন্ডলের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়নি।বিভিন্ন দুর্যোগে উপজেলা এরকম ৫১ হাজার ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।দুর্যোগ প্রবন এই উপজেলায় ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত পেলেই ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটতে হয় । কিন্তু যে ঘরটি রেখে তারা আশ্রয়ে যান, দুর্যোগ শেষে ফিরে এসে সেটি অক্ষত পাবেন কি না, তার নিশ্চয়তা নেই। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করা এসব মানুষের নিরাপদ আবাসনের সংকটও কাটেনি। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ঘর নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর স্থায়িত্ব, ব্যবহারযোগ্যতা ও সহায়তার আওতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কয়রা উপজেলার ৯৫ শতাংশ মানুষ কাঁচা ঘরে বসবাস করেন। আর ৬০ দশমিক ৩ শতাংশ ঘরের ভিত্তি উঁচু নয়। ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার সময় এসব বাড়ির বাসিন্দারা বাড়তি ঝুঁকিতে থাকেন। নিচু ভিটা ও দুর্বল কাঠামোর কারণে সামান্য প্লাবনেও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চলতি বছরের ৮ এপ্রিল প্রকাশিত কমিউনিটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের (সিআরএ) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কয়রার ৯৭ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো জলবায়ুজনিত ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষণায় লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়কে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। লবণাক্ততায় ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ঘূর্ণিঝড়ে ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। দক্ষিণ বেদকাশীকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নির্মিত ঘরের অনেকগুলোই ব্যবহারের অনুপযোগী
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকারিভাবে ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প-২-এর আওতায় কয়রার তিনটি এলাকায় মোট ৪৫০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে কপোতাক্ষ নদের চর ভরাট করে গোবরা গ্রামে ২২০টি, শেওড়াপাড়ায় ৬০টি এবং কয়রা নদীর চর ভরাট করে মঠবাড়ী গ্রামে ১৭০টি ঘর নির্মাণ করা হয়।
তবে স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘরের অনেকগুলো বর্তমানে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। ফলে পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে নির্মিত ঘরগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঘরগুলো কেন ব্যবহার করা যাচ্ছে না, কতটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেগুলো মেরামতের কোনো উদ্যোগ আছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য প্রয়োজন।
এ ছাড়া মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় আরও ২৩৯টি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ৪৫ ঘর নির্মাণ করা হয়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় প্রায় দুই হাজার ঘর নির্মাণের জন্য সহায়তা দেওয়ার তথ্যও রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের আওতায় কতটি পরিবার বর্তমানে নিরাপদ ও টেকসই ঘরে বসবাস করছে, তার হালনাগাদ হিসাব পাওয়া গেলে আবাসন পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল জাবির বলেন,গুচ্ছগ্রামের অধিকাংশ ঘরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। মেরামতের জন্য বর্তমানে কোন বরাদ্ধ নেই। বরাদ্ধ পেলে ঘরগুলো মেরামত করা হবে।
দুর্বল বেড়িবাঁধে বাড়ছে শঙ্কা
নদীবেষ্টিত কয়রা উপজেলায় প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ উপকূলবাসীকে জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার হাত থেকে রক্ষার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু আইলা, সিডর, বুলবুল ও আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড় বারবার এই জনপদের দুর্বল বাঁধব্যবস্থার ঝুঁকি সামনে এনেছে। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর উপজেলার কোনো কোনো এলাকা প্রায় পাঁচ বছর ধরে লোনা পানিতে তলিয়ে ছিল।
২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে কয়রার বেড়িবাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় প্রায় অর্ধশত গ্রাম। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি ও জীবিকা। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই দুর্যোগে উপজেলায় প্রায় ৫১ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লাখ।
বর্তমানে দশহালিয়া, পবনা, হরিণখোলা ও কোবাদকসহ কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙনে বেড়িবাঁধের বিভিন্ন অংশ হুমকির মুখে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ অংশে বারবার অস্থায়ী মেরামত করা হলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় তাঁদের উদ্বেগ কাটছে না।
খু্লনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের( বিভাগ-২) উপসহকারী প্রকৌশলী মশিউল আবেদিন বলেন, কয়রা উপজেলার পোল্ডর নং ১৪/১ পূরর্বাসন প্রকল্পের আওতায় ১১৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩১.৭৭৫ কিলোমিটার এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে ১৩-১৪/২ পোল্ডারে ২৬ কোটি টাকায় ৮.৯৫ কিলোমিটার কাজ চলমান রয়েছে।এ কাজ বাস্তবায়ন শেষ হলে কয়রার বেড়িবাঁধ আর ঝুকিপূর্ণ থাকবে না।
আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্র জীবন বাঁচানোর অন্যতম ভরসা। কিন্তু কয়রা উপজেলার ৩ লক্ষ মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা মাত্র ৪২ টি।দুর্যোগের সময় এসব কেন্দ্র নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন নিশ্চিত করা হয় না।
সিআরএ গবেষণায় ৮৯ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের জন্য নিরাপদ ও পৃথক স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া ৮২ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ দুর্যোগের পর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। এতে জরুরি সহায়তা ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কয়রায় গত পাঁচ বছরে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর মাত্র ১৮ শতাংশ সরকারি সহায়তা পেয়েছে। ৩ হাজার ২০০ দরিদ্র পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়। এই চিত্র দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে সহায়তার আওতা ও বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
নিরাপদ আবাসনের পরিকল্পনা কোথায়?
আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। ‘ঘরে থেকেই শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এমন সময়ে কয়রার উপকূলবাসীর নিরাপদ আবাসনের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ ঘরে নিতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী? গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পে নির্মিত বসবাসের অনুপযোগী ঘরগুলো সংস্কার করা হবে কি না, দুর্যোগসহনশীল ঘর নির্মাণে সহায়তা কীভাবে বাড়ানো হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের স্থায়ী সমাধান কবে হবে?
কয়রার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আগাম সতর্কবার্তা ও আশ্রয়কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। প্রয়োজন টেকসই ও দুর্যোগসহনশীল আবাসন, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সহায়তা, বেড়িবাঁধের স্থায়ী সমাধান এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের কার্যকারিতা যাচাই। কারণ দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে জীবন বাঁচলেও, ফিরে এসে মাথা গোঁজার নিরাপদ ঠাঁই না থাকলে দুর্যোগের ক্ষতি শেষ হয় না।