এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকেরাও ঝুঁকছেন বিকল্প কৃষির দিকে। কয়েক বছর আগেও বাড়ির আঙ্গিনায় বা বিছরা বাড়ি সংলগ্ন নিচু ক্ষেতে নিজের সংসারের প্রয়োজনে সামান্য জমিতে আলু চাষাবাদ করলেও বাণিজ্যিকভাবে আলুর ব্যাপক চাষাবাদ হতো না। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গত কয়েক বছর আলুর ভালো ফলন ও বাজারে ন্যায্যমূল্য থাকায় এ বছরেও মধ্যনগর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের চাষিরা আলু চাষে উৎসাহিত হয়েছেন।
ভরা মৌসুমের আলুর অধিক ফলন হলেও দাম কিছুটা কম থাকে। তবে মৌসুমের শুরুতে নতুন আলুর দাম থাকে তুলনামূলক চড়া। আর ক্ষেতের আলুর ফলন ভালো হলে লাভবান হন চাষিরা। এই আশায় দেশীয় জাতের ‘ডায়মন্ড’ ও ‘ললিতা’ আলু চাষ করে এবার মধ্যনগর উপজেলার চাষিরা ভালো ফলন পেয়েছেন। এরইমধ্যেই ক্ষেত থেকে ডায়মন্ড আলু উত্তোলন শুরু হয়েছে। বর্তমানে বাজারে দামও রয়েছে ভালো। ভালো ফলন ও এই মুহূর্তে দাম বেশি পাওয়াতে এবার খুশি মধ্যনগরের আলু চাষিরা।
.png)
উপজেলায় চারটি ইউনিয়নের মধ্যে আলু উৎপাদনের শীর্ষে বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হেক্টর। তবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০ হেক্টর বেড়ে ওই ইউনিয়নে ৫০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এই মৌসুমে উপজেলায় আলু চাষে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২০০ হেক্টর জমি। আর আলু চাষ হয়েছে ২৫৬ হেক্টর জমিতে।
উপজেলার রংচী গ্রামের শফিকুল ইসলাম এবার চার বিঘা জমিতে দেশীয় ললিতা জাতের আলু চাষ করেছেন। এসব আলু উত্তোলন করতে আরো ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগবে। দেশীয় জাতের এসব আলু সাধারনত রোপণের পর ৬৫ থেকে ৭০ দিনের মাথায় উত্তোলন করা যায়।
শফিকুল জানান, এক বিঘা জমিতে হালচাষ থেকে, বীজ, সার, কীটনাশক, উত্তোলন বাবদ সর্বসাকূল্যে ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন ভালো হয়। ভালো ফলন হলে এক বিঘা জমিতে ৭৫ থেকে ৮০ মন আলু উৎপাদিত হয়। বর্তমানে খোলা বাজারে আলুর কেজি ৫০ টাকা। আলু উঠানো পর্যন্ত এমন দাম থাকলে, আমরা কৃষকরা লাভবান হব। এমন বাজারমূল্য পাওয়ায় কৃষক হিসেবে আমি খুশি।
উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের আলু চাষি আবুল কালাম বলেন, আমি তিন বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। বাজার ভালো পাশাপাশি আলুর ফলনও ভালো হয়েছে। এরইমধ্যে যারা নতুন আলু বাজারে তুলছেন, তারা বর্তমান বাজারে নতুন আলু দুই হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন। এই দাম থাকলে আমরা কৃষকরা লাভবান হব। আর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে এ এলাকায় প্রায় সবার ক্ষেত থেকে আলু উত্তোলন শেষ হবে। তখন দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে ১৬০০ টাকার নিচে আলুর দাম কমে আসলে আমাদের লোকসান হবে। আমার তিন বিঘা জমিতে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। আশা করা যায়, ২০০ মনের মতো আলু উত্তোলন করতে পারবো।
উপজেলার হাতপাটন গ্রামের আলু চাষি দ্বিজেন্দ্র তালুকদার বলেন, আমাদের এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় পরিবহনে সুবিধা নেই। তাই আমাদের উৎপাদিত আলু স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হয়। পাইকার না থাকায় খুচরা বিক্রয়ে দাম ভালো পেলেও আলু বিক্রির টাকা সহজে অন্য খাতে বিনিয়োগ করা নিয়ে চাষীদের ভোগান্তি বাড়ে।
তিনি আরো বলেন, সরকারের কৃষিবিভাগ আলু চাষে প্রণোদনা প্রদান ও বাজারজাত করণের ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করলে এ উপজেলায় আলু চাষাবাদ আরো বাড়বে। আগাম জাতের আলু বীজ সরকারিভাবে যেন দেওয়া হয়।
বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আকমল হোসেন বলেন, এবছর বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে আলুর চাষ বেড়েছে। আলু ক্ষেতে প্রাথমিক পর্যায়ে কাটুই পোকার আক্রমন হলেও কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে সঠিক মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করে তা দমন করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলুর মাকড় রোগের আক্রমণ কম। নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও আলু চাষিদের পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। এ বছর আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাবে।
মধ্যনগর উপজেলা কৃষি বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হয় পাশের ধর্মপাশা উপজেলা থেকে। ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ তুষার বলেন, আলুতে কৃষকরা লাভবান হচ্ছে। বর্তমান বাজারে খুচরা পর্যায়ে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৪৮ টাকা থেকে ৫০ টাকায়। এরইমধ্যেই অনেক চাষি ক্ষেতের আলু উত্তোলন করে খুচরা বাজারে বিক্রি করছেন। তারা বাজারমূল্য ভালো পাচ্ছেন।