ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
জাহাজে ৭ খুন

পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের বিচার চায় কিবরিয়া ও সবুজের পরিবার

ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:১০, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪
পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের বিচার চায় কিবরিয়া ও সবুজের পরিবার
ইনসেটে সবুজ (বামে), কিবরিয়া (ডানে)

পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হলে সরকারের কাছে খুনের রহস্য উন্মোচন এবং জড়িতদের উপযুক্ত বিচার দাবি করেছেন চাঁদপুরে মেঘনা নদীতে খুনের শিকার এমভি বাকেরার মাস্টার গোলাম কিবরিয়ার স্ত্রী রোজি আক্তার (৪৬)। আর তার ননদ রিজিয়া বেগমও অতি দ্রুত খুনিদের খুঁজে বের করতে প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে, ময়নাতদন্ত শেষে গোলাম কিবরিয়া (৬০) ও তার বোনের ছেলে সবুজ শেখের (২৭) লাশ মঙ্গলবার রাত‌ ১১টার দিকে ফরিদপুরে এসে পৌঁছে। এরপর সদর উপজেলার জোয়াইর গ্রামের জোয়ারের মোড় জামে মসজিদ কবরস্থানে তাদের দুজনকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।

গত প্রায় ৪০ বছর জাহাজে চাকরি করেছেন গোলাম কিবরিয়া। অবসর নিয়ে দু-একদিনের মধ্যেই তার বাড়ি ফেরার কথা ছিলো। বাড়িতে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও ছোট একটি ছেলে রয়েছে তার। ১০ জানুয়ারি তার মেয়ের বিয়ের দিন ধার্য্য করা হয়েছে। প্রতিবেশীরা ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে সেই গোছগাছ করছিলেন। কিন্তু বিয়ের আনন্দের বদলে সেখানে তারা এখন শোকের আয়োজনে ব্যস্ত!

Advertisement

গোলাম কিবরিয়ার ভাগ্নে শেখ সবুজের (২৬) বাড়ির দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম। এ মাসেই মামার হাত ধরে জাহাজে লস্করের কাজে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। জোয়ার গ্রামের সবুজের মৃত অতাউর রহমানের ৬ ছেলে ও ৪ মেয়ের মধ্যে সবুজ একজন। চাকরিতে যাওয়ার সময় তার মা ঢাকায় থাকায় শেষ দেখাটাও হয়নি এই মা-ছেলের।

‘তুমি তুমি দোয়া কইরো আমার জন্য। আমি তোমার কাছে টাকা পাঠায় দিবানি।’ মাকে বলেছিলেন সবুজ মোবাইলে। ছেলের এই‌ স্মৃতি মনে করে কাতর হয়ে পড়ছেন রিজিয়া বেগম।

তিনি বলেন, ‘মাত্র তিনদিন আগেই আমার ছেলের সঙ্গে কথা হইছে। আমারে বলেছে, মা আমি মামার সঙ্গে বাড়ি আসতেছি। আমার ভাইর সঙ্গেও আমার কথা হইছে। মেয়ের বিয়ে। আইজই আসার কথা ছিলো।’

কান্নায় ভেঙে যাওয়া রিজিয়া বেগম বলেন, ‘ওরা মালছামানা সবকিছু নিয়ে যাইতো, আমার ছেলেগের ক্যান মাইর‌্যা গেলো? আমি এই দুইটা শোক কেমনে সইবো? অসুখ বিসুখ হয় আলাদা কথা। এমনে মার‌্যা থুইয়্যা যায় নেকি? ওরা কি আজরাইল নেকি…? ও আল্লাহ্ এমন কোনো নজির আমি জীবনে দেখি নেই এক জাহাজে এমনে সবাইরে মাইর‌্যা ফেলে। আমি বিচার চাই। আমি প্রশাসনের কাছে এর কড়া বিচার চাই।’

গোলাম কিবরিয়ার স্ত্রী রোজি আক্তার বলেন, ‘মেয়ের বিয়ের জন্য ১০ জানুয়ারি ঠিক করছে উনি (গোলাম কিবরিয়া)। বাপের‌ যেই স্বপ্ন থাকে সন্তানরে নিয়্যা। মেয়েরে উঠ্যায় দিবি বৈল্যা আসার কথা ছিলো আজকালের ভেতরেই। আইজ নয়তো কাইলই বাড়ি আসার কথা ছিল তার (গোলাম কিবরিয়া)।’

গোলাম কিবরিয়ার বড় মেয়ে হাবিবা আক্তার গেরদার আব্দুল খালেক ডিক্রি কলেজে স্নাতক ২য় বর্ষের ছাত্রী। ছোট মেয়ে মুসলিমা একই কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ২য় বর্ষে পড়েন। একেবারে ছোট ছেলেটি মো. রুবায়েত পড়ছে মক্তবে।

নিহত‌ গোলাম কিবরিয়ার প্রতিবেশী আবুল হোসেন বলেন, এভাবে তাদের হত্যার শিকার হতে হবে তা ভাবতেও পারছি না। এখন গোলাম কিবরিয়ার পরিবার অথৈ সাগরে পড়ে গেলো।

আজিজুর রহমান নামে তাদের এক আত্মীয় বলেন, মর্মান্তিক এই পরিবার দুটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা নেই। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।

সবুজের বড় ভাই মিজানুর রহমান ফারুক বলেন, ‘আমি নিজে গেছি লাশ আনতে। তাদের যেভাবে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে, মাথার ঘিলু বের হয়ে গেছে। কোনো মালামাল নেয় নাই। এটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য করতে পারে। মালিক পক্ষ থেকেও হতে পারে। আবার শুনছি, চট্টগ্রামে সারবোঝাই করার সময়েও তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়েছে। এসব কোনো কারণও থাকতে পারে।

নিহত গোলাম কিবরিয়ার সহকর্মী একই কোম্পানির অন্য আরেকটি জাহাজের মাস্টার আবুল কাশেম বলেন, ‘আমরা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। যাতে এরপরে আর কেউ এমন ঘটনা না ঘটাতে পারে।’ এছাড়া তিনি নিহতদের পরিবারের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২০ লাখ করে টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিয়েছে খুনিদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারের জন্য। অন্যথায় আমরা জাহাজ শ্রমিকেরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে নামবো।’

প্রসঙ্গত, গত সোমবার চাঁদপুরের হাইমচর নীলকমল ইউনিয়নে মেঘনা নদীর মাঝেচর এলাকায় সারবাহী জাহাজ এমভি আল-বাকেরাহ মাস্টার ও চুকানিসহ ৭ জন খুনের ঘটনা ঘটে। এদের দুইজন ছাড়াও ফরিদপুরের সদর উপজেলার বগারটিলা গ্রামের সেকেন্দার খালাসির ছেলে জুয়েল রানা (৩৫) নামে এক যুবক ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হন। তার শ্বাসনালি কেটে গেছে। তার অবস্থাও শঙ্কটাপন্ন বলে জানা গেছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
ট্যাগ: ফরিদপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!