এরইমধ্যে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে চিঠি দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। চাপে পড়ে এখন দায়সারাভাবে সে কাজ করছেন ঠিকাদার। যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন মুসল্লিরা।
জানা যায়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফট জালিয়াতির দায়ে অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশন এই মসজিদ নির্মাণের কাজ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক সৈয়দ জাকির হোসেন। তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত বছর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লিফট জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া যায়। দরপত্র অনুযায়ী সেখানে চাওয়া হয়েছিল ‘এ’ ক্যাটাগরির লিফট। তার বদলে ‘সি’ ক্যাটাগরির লাগানো হয়। এই দুই লিফটের দামের পার্থক্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা। সেখানেও কর্তাদের যোজসাজসে বিল তুলে নিয়েছিলেন তিনি। পরে গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে আসার পর এ নিয়ে তদন্ত হয়। এরপর এই লিফট ঠিকাদার খুলে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তার পরিবর্তে নতুন লিফট এখনো সরবরাহ করা হয়নি।
.png)
এবার গোদাগাড়ী উপজেলা মডেল মসজিদ নির্মাণের কাজ কাজ শেষ না করেই ১০ কোটি টাকার বিল তুলে নেয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। গোদাগাড়ী উপজেলার তৎকালীন ইউএনও গত ২৪ জুন মসজিদের বিভিন্ন সমস্যা ও অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য রাজশাহীর গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর চিঠি দেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, মসজিদের মিনারের চারপাশের নকশা হালকা বাতাসে ভেঙে পড়ছে, যা থেকে প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আপাতত স্থানটির চারপাশে প্রবেশ নিষেধ করে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। মসজিদের সামনের বড় সিঁড়ি হালকা বৃষ্টিতেই বিদ্যুতায়িত হয়ে যাচ্ছে। সিঁড়ির সবকটি লাইট নষ্ট। এতে রাতে মুসল্লিদের মসজিদে আসা–যাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, বিদ্যুৎসংযোগের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে ভবনের ভেতরে অনবরত পানি পড়ে। নষ্ট ‘এসি’ অসম্পূর্ণভাবে ফিটিং করে গেছেন ঠিকাদার, যা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। সুইচগুলো থেকে বিদ্যুৎ শক করছে, ফলে লাইট-ফ্যান চালানো যাচ্ছে না। রেগুলেটরে সমস্যা, প্রায় সবকটিই অকার্যকর। পুরো মসজিদের সব ঝাড়বাতি নষ্ট। অনেক সকেটে বিদ্যুৎসংযোগ নেই। সাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা, স্পিকার মিক্সার মেশিন নেই। অ্যামপ্লিফায়ার খুবই নিম্নমানের। মসজিদের সামনের বড় বারান্দার লাইট স্থাপন ভুলভাবে হয়েছে, প্রায় সব লাইট নষ্ট, লাইট লাগানো ফ্রেমগুলো বাতাসেই খুলে পড়েছে।
ইউএনওর চিঠিতে বলা হয়, মসজিদে মুসল্লিদের প্রবেশের প্রধান ফটকের সামনে হালকা বৃষ্টিতে পানি জমে যায়। প্রধান ফটকের গ্লাসে সমস্যা, গ্লাস লাগানো বা খোলা যাচ্ছে না এবং গ্লাস ফ্রেম ফিটিংয়ের সমস্যা। মসজিদ ঢুকতে বের হতে মুসল্লিদের পা কেটে যায়। ফায়ার গেটে সমস্যা। হাতল নষ্ট, গেট লক করার পদ্ধতি থাকলেও কোনো চাবি নেই। মার্বেল পাথর নিম্নমানের। অধিকাংশ পাথর ভাঙা এবং ফাটা। বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। বড় বারান্দার ভেতরের দিক ঢালু, জায়গায় জায়গায় পানি জমে থাকে, মুসল্লিদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই চলতে হচ্ছে। মসজিদের ছাদে গম্বুজের লাইটগুলো খুলে খুলে পড়ছে। ছাদের টিন দিয়ে প্রথম থেকেই পানি পড়ে। এখন টিনগুলো খুলে পড়েছে। মসজিদের পশ্চিম বারান্দায় পানি প্রবেশ করে জমে থাকে, চলাফেরা করতে খুব সমস্যা হয়। পানির মোটর নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর, তা ঠিক করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। আপাতত ছোট একটি মোটরের মাধ্যম দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে।
চিঠিতে মসজিদের আরো সমস্যার বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়। এতে জানানো হয়, মসজিদের দেয়ালে ফাটল। ঠিকাদার বারবার চেষ্টা করছে রং এবং আঠার মাধ্যমে তা ঢেকে দিতে, তবু নিম্নমানের কাজ দেখা যাচ্ছে। মসজিদের চারপাশের লোহার নকশায় ভুল, যার ফলে যে কেউ ইচ্ছা করলেই যত্রতত্র দিয়ে মসজিদে ঢুকতে পারেন। মসজিদের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ না করেই কাজ শেষ করা হয়েছে। সিসি ক্যামেরা নেই, যার কারণে মাঝেমধ্যেই মসজিদের আসবাবপত্র চুরি এবং নিরাপত্তাহীনতায় পড়তে হচ্ছে। অর্ধেক এসি লাগানো হয়নি। বাকি অর্ধেক এসি লাগালেও চালু করতে পারেনি। প্রতিবন্ধীদের প্রবেশের ফটক নেই। প্রতিবন্ধীদের টয়লেট এখন পাবলিক টয়লেটে পরিণত হয়েছে। মসজিদের রান্নাঘরে গ্যাস ফ্যান, সিলিং ফ্যান নেই। মসজিদের ভেতরে দরজায় ‘ডোর ক্লোজার’ নেই। মসজিদে ওঠার বড় সিঁড়ি ঘিরে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই, ফলে ছাগল-কুকুর উঠে নামাজ চলাকালে মসজিদে ঢুকে পড়ে, ময়লা করে ফেলে।
মসজিদটির ইমাম মো. সিগবাতুল্লাহ বলেন, ২০২১ সালের ১০ জুন উদ্বোধনের জন্য মসজিদের কাজ শেষ না করেই ফেলে রাখেন এই ঠিকাদার। তারপর টুকটাক কাজ করলেও অসমাপ্ত কাজ তারা শেষ করেননি। এখন মসজিদের দেয়াল ফেটে যাচ্ছে। একপাশ দেবে যাচ্ছে। ভেতরে পানি ঢুকছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফিল্ড অফিসার মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, আমরা মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি ব্যবহার করি। পদে পদে বিভিন্ন সমস্যা। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করা হোক।
এ বিষয়ে গোদাগাড়ী উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আবুল হায়াত বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়ম হওয়ায় তৎকালীন ইউএনও আতিকুল ইসলাম কাজ বুঝিয়ে নেননি। কিন্তু উদ্বোধন হওয়ায় এটি ব্যবহার করা হচ্ছিলো। কিন্তু এতো সমস্যা নিয়ে তো প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছি। ডিসি স্যারও নির্দেশ দিয়েছেন। এরপরও যদি কাজ না হয়, তাহলে যারা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার দিকে যাওয়া হবে।
এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হায়াত মো. শাকিউল আজম বলেন, উনারা কাজ বুঝে নেননি, কিন্তু ব্যবহার তো করছেন। আর যে ছোটোখাটো সমস্যা আছে, সেটা ৫-৭ দিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে ঠিকাদার সৈয়দ জাকির হোসেনের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।