ঢাকা,  শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

[ দেশজুড়ে ]

আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’

কামরুজ্জামান মিন্টু, ময়মনসিংহ
প্রকাশিত: ১৫:৩৩, ৮ নভেম্বর ২০২৪
আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’
কিশোর গ্যাং। প্রতীকী ছবি

ময়মনসিংহে আবারো কিশোর গ্যাং মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। শহরের পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গ্রামেও গড়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য। হত্যার ঘটনা ছাড়াও মাদকাসক্ত হয়ে চুরি, ছিনতাই ও মেয়েদের উত্ত্যক্ত করাসহ নানা অপরাধ করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিশোর গ্যাং। ফলে মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক।

এরা যে সবাই সমবয়সীদের সঙ্গেই চলাফেরা করে তা নয়। অনেক কিশোর আলাদা হয়ে যুবকদের সঙ্গেও যোগ দিয়ে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। নিজেদের পরিচিতি জানান দিতে মাদক সেবন করে ফূর্তির নাম করে প্রচণ্ড গতিতে সড়কে বিকট শব্দে মোটরসাইকেলে হর্ণ বাজিয়ে চলাচল করে। নারীদের উত্ত্যক্ত করা নিজেদের রেওয়াজে পরিণত করেছে।

গ্যাংয়ে জড়িত অনেক কিশোররা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়। তাদের কেউ কেউ বড় ভাইদের নির্দেশনা পালন করে। আধিপত্য বিস্তার, মারামারি, মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করছে। মূলত আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় ভাড়াটে হিসেবে অন্যের জমি দখল করাসহ নানা অপরাধে যুক্ত হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বিভাগীয় নগরীর নতুন বাজার, গাঙ্গিনারপাড়, চরপাড়া মোড়, মাসকান্দা, ব্রিজ মোড়, শম্ভুগঞ্জ, আকুয়া, কেওয়াটখালী, বাকৃবি এলাকা, কৃষ্টপুর, পুরোহিতপাড়া, বাঘমারাসহ আরো বেশকিছু এলাকাসহ পুরো সদর উপজেলায় এরকম প্রায় শতাধিক ‘কিশোর গ্যাং’ সক্রিয় রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে রয়েছেন এলাকাভিত্তিক ‘বড় ভাই’। নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের নিজেদের কবজায় নিয়ে এসব বড় ভাই মাদক বিপণনের কাজ করাচ্ছে। অনেক সময় নিজেদের স্বার্থে এদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, ছুরি-চাকু থেকে শুরু করে দেশীয় অস্ত্র। মারামারির ঘটনাও ঘটায় প্রকাশ্যেই। এসব ‘কিশোর গ্যাং’ এর অধিকাংশ সদস্যই ইয়াবা আসক্ত।

চলতি বছরের ২৪ মে রাত ৯টার দিকে ময়মনসিংহ নগরীর পাটগুদাম সেতু মোড় এলাকার হাজী কাশেম আলী কলেজের পাশে আড্ডা দিচ্ছিল মো. হাসানসহ  তার দুই বন্ধু রহিত ও রাজা। পূর্ব বিরোধের জেরে হঠাৎ ৩০ থেকে ৪০ জনের একদল কিশোর-যুবক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে তিনজন গুরুতর আহত হলে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক হাসানকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৬ মে রাত ১০টার দিকে কমিউটার ট্রেনে ময়মনসিংহ থেকে জামালপুরে বাড়িতে ফিরছিলেন ময়মনসিংহ পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের এক ছাত্র। পূর্ব শক্রতার জেরে ময়মনসিংহ স্টেশন থেকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের ৬ সদস্য ট্রেনটিতে ওঠে। তারা পিয়ারপুর স্টেশনে নেমে ওই ছাত্রকে ট্রেন থেকে টেনে-হিঁচড়ে নামানোর চেষ্টা করলে যাত্রীদের সহায়তা তাকে নামাতে পারেননি। এরপর ট্রেনটি নরুন্দি স্টেশনে বিরতি দিলে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাকে খুঁজতে থাকে। তাকে না পেয়ে যাত্রীদের ওপর হামলা চালান। এ সময় তারা ট্রেনের জানালা ভাঙচুর শুরু করেন। যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে ট্রেনের জানালা দরজা বন্ধ করে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিলে কিশোর গ্যাংয়ের ৬ সদস্য স্টেশনে ঘুরাফেরা করতে থাকলে স্টেশনে থাকা লোকজন তাদের আটক করেন। 

তারা হলেন- ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার তারাটি পূর্বপাড়া এলাকার সাইদুর ইসলাম ছেলে জকিরুল ইসলাম (১৫), মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে মারুফ হোসেন (১৮), রফিকুল ইসলামের ছেলে রাকিব হোসেন (২০), নুরুল ইসলামের ছেলে রাকিব হাসান (১৮), বিল্লাল হোসেনের ছেলে মো. শিহাব উদ্দিন (১৮) এবং ডওয়াখোলা এলাকার দুদু মিয়ার ছেলে শাকিল আহম্মেদ (১৮)। তাদের সঙ্গে থাকা একটি ব্যাগ তল্লাশি করে বেশ কয়েকটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

২২ এপ্রিল রাতে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের বন্যাবাড়ি গ্রামে বৈশাখী মেলায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে কিশোর শিপন মিয়া (১৬) খুন হয়। নিহত শিপন একই ইউনিয়নের কান্দানিয়া উল্লারচালা গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় একদল কিশোর তাদের বন্ধু কিশোর নাঈমকে (১৭) ফোন করে পার্শ্ববর্তী বন্যাবাড়ি গ্রামে বৈশাখী মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যায়। রাতে মেলায় মঞ্চ নাটক চলার সময় নিজেদের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের ইমানসহ ৫ থেকে ৭ জন শিপনের ওপর হামলা চালায়। পরে স্থানীয়রা তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন সকালে মারা যান তিনি।

২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ময়মনসিংহ নগরীর সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকায় রাজু ওরফে পুইট্টা রাজু (৩৫) নামে এক যুবককে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে ১০ থেকে ১২ জনের একটি গ্রুপ। পরে রাজুর সঙ্গে থাকা মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। রাজুর সঙ্গে পূর্ববিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহের সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বেশিরভাগই দরিদ্র এবং স্কুল থেকে ঝরে পড়া। এসব কিশোর হতাশাগ্রস্ত হয়ে প্রথমে মাদকে জড়ায়। এতে অস্বাভাবিক জীবন-যাপনের পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গেও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। পর্যাপ্ত সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্যাং কালচার বিকশিত যেনো হতে না পারে, সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিয়েছি। শুধু আইনের শাসন কায়েম করে কিশোর অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। এক্ষেত্রে পরিবারসহ সমাজের সবাইকে সক্রিয় হতে হবে।

ময়মনসিংহ র‍্যাব-১৪ সদর দফতরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে কাজ করছে র‍্যাব। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এসব অপরাধীদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে। কিশোর গ্যাং কালচার পুরোপুরি বন্ধ করতে সচেতনতামূলক আন্দোলন শুরু করতে হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
Durga Puja
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!