* টাকা না পেলে ফাঁসিয়ে দেন মামলায়
* টাকা হলেই ছেড়ে দেন আসামিদের
* স্বার্থ ছাড়া চালান না অভিযান
* খবর প্রচার না করতে টাকা দেওয়ার চেষ্টা
ফরহাদ আকন্দ। ঠাকুরগাঁও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিদর্শক। গত তিন বছর ধরে একই কর্মস্থলে রয়েছেন তিনি৷ এর আগে সহকারী পরিচালক পদে কর্মকর্তা থাকলেও তার বদলির পর নিয়মিত দায়িত্ব পাননি কোনো কর্মকর্তা। পাশের জেলা নীলফামারীর কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিলেও নিয়মিত অফিসে আসেন না তিনি৷ এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব বলয় গড়ে অনিয়মের কারখানা তৈরি করেছেন আকন্দ।
ঠাকুরগাঁও পৌরশহরের মিলন নগরের বাসিন্দা রঞ্জু৷ দুপুরে বাড়িতে শুয়ে ছিলেন। আচমকাই তার বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে আকন্দ টিম। ঘটনা না বোঝার আগেই কিছুক্ষণের মধ্যে তাকে সেখান থেকে আটক করে আনা হয়৷ পরিবারের সদস্যরা জানতে চাইলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়৷
রঞ্জুকে গাড়িতে উঠানোর পর শুরু হয় আকন্দনামা। আড়াই লাখ টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন আকন্দ। টাকা দিতে অপারগতা জানালে তাকে নিয়ে চলে যাওয়া হয় অফিসে। তারপর আকন্দের সহযোগী কনস্টেবল বাঁধন, খালেক ও ইউনুসের মাধ্যমে শুরু হয় দর কষাকষি৷ সেখানে ডেকে নেয়া হয় রঞ্জুর ছোট ভাই শাকিলকে। টাকা দিলে হালকা মামলার প্রস্তাব দেন তারা৷ দাবি করা হয় এক লাখ টাকা৷ ভাইয়ের মাদকের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই জানিয়ে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান শাকিল। তাতেও ক্ষান্ত হননি আকন্দ বলয়। নানা ধরনের ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে শুরু করেন চাপ৷
.png)
পরে নগদ ৩০ হাজার টাকা ও কনস্টেবল বাঁধন তার বিকাশ ও নগদ নম্বরে আরো ৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন৷ পাঁচ পিস মাদক দিয়ে ৭ দিনের ভ্রাম্যমাণ দেওয়া হয় রঞ্জুকে। আর টাকার বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তাদের দেখে নেয়ারও হুমকি দেন আকন্দ।
রঞ্জুর ভাই শাকিল বলেন, আমার ভাইকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে আমি জানতে পারি। তাদের অফিসে গেলে তারা টাকা দাবি করে আমার কাছে। আমরা অনেক গরিব। টাকা কোথায় পাব? অনেক মিনতি করি, কিন্তু আকন্দ কোনো কথা শোনে না। পরে আমি কোনোভাবে টাকা ম্যানেজ করে নগদ ৩০ হাজার টাকা দেই ও কনস্টেবল বাঁধনের নম্বরে বিকাশে ৫ হাজার টাকা দেই।
ভুক্তভোগী রঞ্জু ইসলাম বলেন, আমাকে শুধুমাত্র টাকার জন্য ফাঁসানো হলো। এলাকা, পরিবারের কাছে আমার সম্মানহানি করা হলো। আমি তো মাদক ব্যবসায়ী না। তারপরও আমার সঙ্গে অন্যায় করা হলো। আমি এর বিচার চাই।
শুধু একটি ঘটনাই নয়৷ এমন নানা চক্রীয় ঘটনার হোতা ফরহাদ আকন্দ। জেলার বালিয়াডাঙ্গী ও পীরগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তিতেও অর্থ নেন তিনি৷ কিছুদিন আগে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সহকারী পরিচালকের সিল ও স্বাক্ষর জালিয়াতি করে মামলার চার্জশিট থেকে পুলিশ কনস্টেবল মোশাররফ হোসেনের নাম বাদ দিয়েছিলেন তিনি৷
এছাড়াও জেলায় অভিযান পরিচালনাকালে মাদক পেলেও টাকা, না পেলেও টাকা ও বাড়িতে থাকা নগদ অর্থ নিয়ে আসেন তিনি৷ এক অভিযান চালানোকালে বাকি মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে গাড়ি ভাড়া, খাওয়া বাবদ টাকাসহ মাসোহারা নিয়ে থাকেন এ কর্মকর্তা।
ভুক্তভোগী লাকি আক্তার বলেন, আকন্দ উনার বাহিনী নিয়ে প্রায় আমার বাসায় রেইড দেয়। আমরা মেয়ে মানুষ। বাসায় কী অবস্থায় থাকি, তারপরও সে বাসার ভেতরে চলে আসে। একবার বাসায় মাল পাওয়ার পরে এক লাখ টাকা নিয়ে মামলায় মাল কম দেখায়। প্রায় তারা আমাদের বাসায় এসে টাকা নিয়ে যায়।
নিজের সব অভিযোগকে অস্বীকার করে আনীত অভিযোগ বানোয়াট ও মিথ্যা আখ্যা দেন ফরহাদ আকন্দ। মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে না স্বীকার করে প্রতিবেদন না করার জন্য অনুরোধ করেন। প্রতিবেদনটি প্রচার না করার জন্য খামে ভরে প্রতিবেদককে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি৷
ঠাকুরগাঁও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত) মোহাম্মদ শরীফ উদ্দীন বলেন, অভিযোগের সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।