ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
৩৮ চেক জালিয়াতি

যশোর শিক্ষা বোর্ডের পৌনে ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ

মো. তবিবর রহমান, যশোর
প্রকাশিত: ১৬:৪৭, ২০ অক্টোবর ২০২৪
যশোর শিক্ষা বোর্ডের পৌনে ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ
যশোর শিক্ষা বোর্ড -ফাইল ফটো

যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড থেকে চেক জালিয়াতি করে ৬ কোটি ৭৪ লাখ ৪৩ হাজার ৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এ ঘটনায় ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা আল আমিন।

অভিযুক্তরা হলেন- শিক্ষা বোর্ডের হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম, রাজারহাটের ভেনাস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের মালিক শেখ শরিফুল ইসলাম, হাইকোর্ট মোড়ের শাহী লাল স্টোরের মালিক আশরাফুল আলম, পোস্ট অফিস পাড়ার নুর এন্টারপ্রাইজের মালিক গাজী নূর ইসলাম, শহরের জামে মসজিদ লেন এলাকার প্রত্যাশা প্রিন্টিং প্রেসের মালিক ও ইকবাল হোসেনের স্ত্রী রুপালী খাতুন, উপশহর ই-ব্লকের সহিদুল ইসলাম, একই এলাকার সোনেক্স ইন্টারন্যাশনালের মালিক রকিব মোস্তফা, যশোর শিক্ষা বোর্ডের সহকারী মূল্যায়ন অফিসার আবুল কালাম আজাদ, নিম্নমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর জুলফিকার আলী, নিম্নমান সহকারী (চেক ডেসপাসকারী), মিজানুর রহমান ও সাধারণ কর্মচারী (চেক ডেসপাসকারী) কবির হোসেন।

২০২১ সালের ৭ অক্টোবর আত্মসাতের প্রথম ঘটনাটি ধরা পড়ে। দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত যশোর জেলা কার্যালয়ে ওই বছরের ১৮ অক্টোবর মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে মোট ১১ জন আসামির বিরুদ্ধে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ৩৮টি চেক জালিয়াতি করে ৬ কোটি ৭৪ লাখ ৪৩ হাজার ৩ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় চার্জশিট করা হয়।

Advertisement

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদক যশোরের উপপরিচালক আল আমিন জানান, তদন্তকালে দেখা যায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড যশোরের প্রায় ২৫টি হিসাব সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, বিআইএসই শাখা যশোরে পরিচালিত হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ২০২১-২০২২ অর্থবছর পর্যন্ত (হিসাব নম্বর ২৩২৩২৪০০০০০২৪) ৩৮টি চেক জালিয়াতি করে বিভিন্ন ব্যাংকে জমা করা হয়। এর পর ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ২৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭০৬ টাকার স্থলে ৬ কোটি ৯৭ লাখ ৮৫ হাজার ৩৯৭ টাকা তোলা হয়।

তদন্তকালে আরো দেখা যায়, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ৩৮টি চেকের মধ্যে টিএ/ডিএ বিল বাবদ আসামি আব্দুস সালামের নামে ইস্যুকৃত চেক ৩টি, সাধারণ বিল বাবদ সহকারী সচিব আশরাফুল ইসলামের নামে ইস্যুকৃত চেক ১টি, মিম প্রিন্টিং প্রেসের নামে ৩টি, মেসার্স খাজা প্রিন্টিং প্রেসের নামে ২টি, নিহার প্রিন্টিং প্রেসের নামে ১টি, সবুজ প্রিন্টিং প্রেসের নামে ১টি, শরিফ প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের নামে ১টি, সানিয়া ইলেক্ট্রনিক্সের নামে ১টি, নুর এন্টারপ্রাইজের নামে ৮টি, প্রত্যাশা প্রিন্টিং প্রেসের নামে ৩টি, শাহী লাল স্টোরের নামে ১টি, দেশ প্রিন্টার্সের নামে ১টি, সেকশন অফিসার আবুল কালাম আজাদের নামে ১টি, অর্পানেটের নামে ১টি, আয়কর কর্তন বাবদ ইস্যুকৃত চেক ৪টি ও ভ্যাট কর্তন বাবদ ইস্যুকৃত ৬টি চেক রয়েছে।

২ হাজার ৮৭০ টাকার একটি চেক ও সহকারী সচিব আশরাফুল ইসলামের রিসিভ করা ৪ হাজার ২৭৫ টাকার একটি চেকের টাকার পরিমাণ কথায় ও অংকে আব্দুস সালাম নিজে ঘষামাজার মাধ্যমে অবমোচন করে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে লিখে প্রিন্ট করেন। পরে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড বিআইএসই শাখা যশোরে উপস্থাপন করে অতিরিক্ত ১৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮৫৫ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন তিনি।

এছাড়া আব্দুস সালাম রিসিভ করা ২টি আয়কর চেক একইভাবে আশরাফুল আলম ও সহিদুল ইসলামের (আসামি আব্দুস সালামের আপন ছোট ভাই) মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক যশোর শাখায় শাহী লাল স্টোর নামীয় হিসাবে জমা দিয়ে মোট ৬১ লাখ ৩২ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন। এভাবে আব্দুস সালাম তার রিসিভ করা অপর ২টি টিএ/ডিএ চেক টেম্পারিং করে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে লিখে প্রিন্ট করে বসিয়ে অপর আসামি শেখ শরিফুল ইসলামের মাধ্যমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড যশোর শাখা থেকে ৫৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭০৫ টাকা আত্মসাৎ করেন।

আসামি আব্দুস সালাম আয়করের অবশিষ্ট ২টি চেক ও ভ্যাটের ৬টি চেক টেম্পারিং করে ভেনাস প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের নামে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড যশোর শাখা থেকে মোট ২ কোটি ৫ লাখ ১০ হাজার ২০ টাকা শেখ শরিফুল ইসলাম ও রকিব মোস্তফার যোগসাজশে আত্মসাৎ করেন। অর্থাৎ আসামি আব্দুস সালামের ১৬টি চেক টেম্পারিং করে আসামিদের যোগসাজশে ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৪০ হাজার ৭২৫ টাকা নগদে উত্তোলন ও ট্রান্সফারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন।

এভাবে মোট তদন্তকালে ৩৮টি চেক বিশারদের মাধ্যমে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। ফরেনসিক পরীক্ষায় বিশারদের মতামত অনুযায়ী, ৩৮টি চেকের মধ্যে ২১টি চেকে শুধু টাকার পরিমাণ কথায় ও অংকে অংশে ঘষামাজার মাধ্যমে পূর্বের লেখা অবমোচন করে পরবর্তীতে দৃশ্যমান লেখা প্রিন্ট করে বসানো হয়েছে। অবশিষ্ট ১৭টি চেকের টাকার পরিমাণ কথায় ও অংকে ঘষামাজার মাধ্যমে লেখা অবমোচন করে পরবর্তীতে দৃশ্যমান লেখা প্রিন্ট করে বসানো হয়েছে।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেক জালিয়াতির বিষয়ে তদন্ত করার জন্য কলেজ পরিদর্শক কে এম রব্বানীকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে মতামত প্রদান করেন যে, বিতর্কিত চেকগুলোর টাকার অংক এবং কথায় লেখার অংশে নিরাপত্তা দাগগুলো (বাঁকা রেখা) ঘষে ওঠানো হয়েছে, তা আল্ট্রাভায়োলেট মেশিনে স্পষ্টভাবে পরিদৃষ্ট হয়েছে। ভ্যাট ও আয়করের চেকগুলো এবং যে চেকগুলোতে প্রাপকের নাম পাল্টে অন্য নাম বসানো হয়েছে তার সবগুলোতে প্রাপকের নাম লেখার অংশে নিরাপত্তা দাগগুলো (বাঁকা রেখা) ঘষে ওঠানো হয়েছে বলে পরিলক্ষিত হয়েছে। সাধারণ চোখে এটি তেমন নজরে পড়ে না। খুব খেয়াল করলে টেম্পারিং করার চিহ্ন দেখা যায়।

দুদক যশোরের উপপরিচালক আল আমিন জানান, যশোর শিক্ষা বোর্ডের ইস্যুকৃত ৩৮টি চেক রিসিভ করার পর টেম্পারিং/ঘষামাজার মাধ্যমে ৬ কোটি ৭৪ লাখ ৪৩ হাজার ৩ টাকা নগদে উত্তোলন করে আত্মসা‍ৎ করেছেন অভিযুক্তরা।

তদন্তকালে আরো দেখা যায়, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছর থেকে ২০২১-২০২২ অর্থবছর পর্যন্ত যশোর শিক্ষা বোর্ডে দুইজন চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ আব্দুল আলীম ও অধ্যাপক ড. মোল্লা আমীর হোসেন কর্মরত ছিলেন। এ সময়ে ড. মোল্লা আমীর হোসেনসহ তিনজন সচিব কর্মরত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ড. মোল্লা আমীর হোসেন প্রথমে সচিব ছিলেন, পরে চেয়ারম্যান হন। অন্য দুইজন সচিব হলেন- প্রফেসর এ এম এইচ আলী আর রেজা ও প্রফেসর তবিবার রহমান। প্রফেসর মোহাম্মদ আব্দুল আলীম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোট ২২টি এবং অধ্যাপক ড. মোল্লা আমীর হোসেন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ১৬টি, মোট ৩৮টি চেক জালিয়াতি হয়েছে। তারা দুইজন ৩৮টি চেকে চেয়ারম্যান হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন।

এছাড়া ৩৮টি চেকের মধ্যে ড. মোল্লা আমীর হোসেনের সচিব হিসেবে স্বাক্ষর রয়েছে ১২টিতে, প্রফেসর এএমএইচ আলী আর রেজা’র সচিব হিসেবে স্বাক্ষর রয়েছে ৫টিতে এবং প্রফেসর তবিবার রহমানের সচিব হিসেবে স্বাক্ষর রয়েছে ২১ টিতে। ৩৮টি চেক জালিয়াতি/টেম্পারিং এ সিগনেটরি হিসেবে বোর্ডের বর্ণিত চেয়ারম্যান ও সচিবের দালিলিক সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। কারণ, চেকগুলো তাদের স্বাক্ষরের মাধ্যমে ডেসপাস হওয়ার পর টেম্পারিং হয়েছে। এছাড়া টেম্পারড চেক তাদের নামীয় ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি বা চেক টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত অপরাধলব্ধ অর্থ তাদের ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফারের মাধ্যমে জমা হওয়ার রেকর্ডও তদন্তকালে পাওয়া যায়নি। সুতরাং চেক জালিয়াতির ঘটনায় সিগনেটরি হিসেবে বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ আব্দুল আলীম, অধ্যাপক ড. মোল্লা আমীর হোসেন, সচিব প্রফেসর এ এম এইচ আলী আর রেজা ও প্রফেসর তবিবার রহমানের সম্পৃক্ততা নেই। বিধায় এজাহার নামীয় ১ নম্বর আসামি শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোল্লা আমীর হোসেন এবং ২ নম্বর আসামি সাবেক সচিব প্রফেসর এএমএইচ আলী আর রেজাকে মামলা থেকে অব্যাহতি প্রদানের সুপারিশ করা হয়।

তবে প্রাতিষ্ঠানিক চেক হস্তান্তর হওয়ার পর ক্লিয়ারিং জালিয়াতি হওয়ায় দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার ফলে চেক জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে। এ জন্য চেকের সিগনেটরি হিসেবে বর্ণিত দুইজন চেয়ারম্যান ও তিনজন সচিব সুস্পষ্টভাবে দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। এছাড়া বর্ণিত সময়ে যশোর শিক্ষা বোর্ডে কোনো অভ্যন্তরীণ অডিট পরিচালিত হয়নি। প্রতি অর্থবছর শেষে একটি হিসাব মিলকরণের ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে সচিবের নেতৃত্বে বোর্ডের হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগের উপপরিচালক এমদাদুল হক ও অডিট অফিসার আব্দুস সালাম আজাদ কাজ করেছেন।

কিন্তু ২০১৭-২০১৮ অর্থবছর থেকে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে পরিচালিত হিসাব মিলকরণ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, তারা জালিয়াতি সঠিক সময়ে উদ্ঘাটন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা সুস্পষ্ট দায়িত্ব অবহেলা। ফলে সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ আব্দুল আলীম, অধ্যাপক ড. মোল্লা আমীর হোসেন, সাবেক সচিব প্রফেসর এ এম এইচ আলী আর রেজা, প্রফেসর তবিবার রহমান, বোর্ডের উপপরিচালক এমদাদুল হক, অডিট অফিসার আব্দুস সালাম আজাদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবরা এরইমধ্যে সরকারি চাকরি হতে অবসর গ্রহণ করায় শুধু এমদাদুল হক ও আব্দুস সালাম আজাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএইচ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!