বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোলরুমের দায়িত্ব থাকা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তারা। এভাবে দিনের পর দিন পানির সঙ্গে বসবাস তাদের। নাওয়া নেই খাওয়া নেই অনেকটাই অসহায়ত্ববোধ করছেন তারা। সরকারি-বেসরকারিসহ বিভিন্ন সংস্থা সংগঠন খাদ্য সহায়তা করে আসছে। তবে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন তারা। সবেচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছে সদরের বাঙ্গাখা, মান্দারী, চন্দ্রগঞ্জ, কুশাখালী, দিঘুলী, লাহারকান্দি, পার্বতীনগর, চরশাহী, উত্তর হামছাদীসহ সদরের ১৬টি ইউনিয়নের বাসিন্দা। টানা বৃষ্টিপাত হলেও আতঙ্কে থাকেন তারা। একে তো ধীরগতিতে পানি নামছে অন্যদিকে বৃষ্টির পানি জমে বেড়েছে জলাবদ্ধতা।
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মনোহরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়া মোহাম্মদ আলী আকবর জানান, তিনি পরিবার নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। তবে শুক্রবার ও শনিবারের বৃষ্টিতে আবারো তার ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। পরে তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। তার মতো আরো কয়েকজন আশ্রয়কেন্দ্রে ফিরে এসেছেন।
.png)
তিন সন্তান নিয়ে জীর্ণ ঘরে পানিবন্দি জীবন যাপন করছেন কমলনগর উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়নের চরকাদিরা গ্রামের তাসলিমা বেগম। ঘরের ভেতর হাঁটুসমান পানি। ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে ঘরের জিনিসপত্র। নেই রান্না করার ব্যবস্থা।
ভুক্তভোগী মো. হাফিজ জানান, দেড় মাস ধরে তিনি পরিবার নিয়ে পানিবন্দি। ঘরের জিনিসপত্র চুরির ভয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেননি। সাত সদস্যের পরিবার তার। অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটছে তাদের। একসময় তিনি মাছের ব্যবসা করলেও দেড় মাস ধরে বেকার। তার মতো একই অবস্থা অনেকেরই।

লক্ষ্মীপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ইউনূস মিয়া জানান, বন্যার পানি কমলেও পরবর্তী বৃষ্টিপাতের কারণে আবারো বেড়েছে পানি। বর্তমানে ৩০ শতাংশের বেশি মানুষ পানিবন্দি জীবন যাপন করছে। এখনো ৫ হাজার ৩০০ মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে। আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারীদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও কমলনগর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মানুষ এখনো পানিবন্দি। পানি ধীরে নামার কারণে বন্যা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না।
এদিকে ডুবে গেছে ফসলি জমি, ভেসে গেছে মাছের ঘের। সব হারিয়ে এখন পথে বসার অবস্থা স্থানীয় কৃষক ও খামারিদের। পানি কমছে না তার মূল কারণ, বন্যার পানি ভুলুয়া নদীসহ খাল ও নালা দিয়ে নিষ্কাশন হতে পারছে না। এ কারণে বন্যা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতিও হচ্ছে না। কিছু স্থানে ঘরবাড়ি তলিয়ে থাকায় অনেকে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরতে পারেননি। ফলে বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান শুরু করা যায়নি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরে ৭৩২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এরমধ্যে ৪০টি বিদ্যালয় এখনো পানিবন্দি। ৮৯টিতে বন্যাকবলিত মানুষ বসবাস করছে। বিদ্যালয়ের মাঠ, শ্রেণীকক্ষ, পার্শ্ববর্তী রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে থাকায় জেলার অর্ধেকেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান শুরু করা যায়নি। কবে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পুরোপুরি চালু করা যাবে সে বিষয়ে নিশ্চিত করতে পারেননি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ মজুমদার।
রামগতি-কমলনগর নদীভাঙন প্রতিরোধ আন্দোলন মঞ্চের আহ্বায়ক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আব্দুস সাত্তার পলোয়ান জানান, ভুলুয়া নদীসহ অধিকাংশ খাল ও নালা দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও দখলমুক্ত না করায় পানি নামতে পারছে না। ফলে বন্যা দীর্ঘ স্থায়ী হচ্ছে। ভুলুয়া নদীসহ জেলার খালগুলো দখলমুক্ত করতে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা প্রশাসনকে নদী ও খালগুলো দখলমুক্ত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত।
নবাগত জেলা প্রশাসক রাজীব কুমার সরকার বলেন, জেলায় এখনো ৩০ শতাংশ মানুষ পানিবন্দি। মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতির প্রতিবেদন চেয়েছে। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। পানিবন্দিদের ত্রাণসহ বিভিন্ন সহায়তায় মাঠ পর্যায়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন।