ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

চট্টগ্রামে ১৫ উপজেলার ৯টিই প্লাবিত

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০১:২৯, ২৩ আগস্ট ২০২৪
চট্টগ্রামে ১৫ উপজেলার ৯টিই প্লাবিত
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

হালদা ও মুহুরি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বন্যার কবলে পড়েছে চট্টগ্রামের নয়টি উপজেলা। আগে তিনটি উপজেলা ফটিকছড়ি, মীরসরাই ও সীতাকুণ্ডের কথা বলা হলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাবিত হতে থাকে আরো ছয় উপজেলা- বাঁশখালী, পটিয়া, বোয়ালখালী, রাউজান, কর্ণফুলী ও হাটহাজারী। 

এসব উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এরমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে উদ্ধারের আকুতি জানাচ্ছেন সেসব গ্রামের মানুষ। এখন পর্যন্ত নয় উপজেলার অন্তত আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) সকালে জেলা প্রশাসন জানায়, ফটিকছড়ি, মীরসরাই ও সীতাকুণ্ডের ২০ হাজার ১৭৫ পরিবার দুর্যোগকবলিত। এসব পরিবারের প্রায় ৯৫ হাজার ৯০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ফটিকছড়ি উপজেলা। এ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে পানিবন্দি তিন হাজার ১৭৫ পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত ১৫ হাজার ৯০০ মানুষ। মীরসরাইয়ের ১২টি ইউনিয়নে পানিবন্দি ১২ হাজার পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৬০ হাজার মানুষ এবং সীতাকুণ্ডের ছয়টি ইউনিয়নে পানিবন্দি পাঁচ হাজার পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২০ হাজার মানুষ।

Advertisement

ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোট ৫০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলায় ২০ মেট্রিক টন, মীরসরাই উপজেলায় ২০ মেট্রিক টন এবং সীতাকুণ্ড উপজেলায় ১০ মেট্রিক টন চাল ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।

দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় খোলা হয়েছে ২৩৯টি আশ্রয়কেন্দ্র। এছাড়া গঠন করা হয়েছে ১৩৭টি মেডিকেল টিম। এরই মধ্যে নারী, পুরুষ, শিশুসহ অনেককে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়া হয়েছে গবাদিপশুও।

ফটিকছড়ি

এ উপজেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ২০ হাজার পরিবারের অন্তত লক্ষাধিক মানুষ। ২২টি ইউনিয়নের প্রায় সবকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বন্ধ হয়ে পড়েছে বিভিন্ন সড়ক যোগাযোগ।

হালদা নদী, শর্তা খাল, ধুরুং খাল, ফটিকছড়ি খাল, মন্দাকিনী খাল, গজারিয়া খাল, তেলপারি খাল, কুতুবছড়ি খাল, লেলাং খালসহ বিভিন্ন খালের বাঁধ ভেঙে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে যায় বলে জানান স্থানীয়রা। 

এতে উপজেলার ফটিকছড়ি পৌরসভা, নাজিরহাট পৌরসভা, সুন্দরপুর, পাইন্দং, হারুয়ালছড়ি, সুয়াবিল, দাঁতমারা, বাগানবাজার, নারায়ণহাট, ভুজপুর, লেলাং, সমিতিরহাট, রোসাংগিরী, জাফতনগর, বক্তপুর, নানুপুরসহ বিভিন্ন স্থানের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোজ্জামেল হক চৌধুরী বলেন, ফটিকছড়ি দিয়ে প্রবাহিত হালদা নদী ও বেশকিছু খালের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। লাখো মানুষ পানিবন্দি। আমরা ১৮টি ইউনিয়নে ১৮ জন কর্মকর্তা নিয়োগ করেছি। ৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছি।

মীরসরাই

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মীরসরাই উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের প্রায় সবকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ১২ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। বন্যার্তদের উদ্ধারে কাজ করছে উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ছাত্র-জনতাসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। রয়েছে ৩০টির বেশি নৌযান।

উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা আমলীঘাট, করেরহাট, হিঙ্গুলী, বারইয়ারহাট পৌরসভা, মীরসরাই পৌরসভার নিম্নাঞ্চল, জোরারগঞ্জ, ইছাখালী, কাটাছরা, দুর্গাপুর, মিঠানালা, খৈয়াছড়া, ওসমানপুর, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজা জেরিন জানান, এখন পর্যন্ত এক হাজার ৭০০’র বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বাকিদের উদ্ধারে কাজ চলছে।

সীতাকুণ্ড

এ উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন এলাকায় সিকদার খালের বাঁধ ভেঙে অন্তত ছয়টি ইউনিয়নের অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ছয় ইউনিয়নে পাঁচ হাজার পরিবারের অন্তত ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি বলে জানায় জেলা প্রশাসন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতর।

হাটহাজারী

হাটহাজারী উপজেলার কয়েকটি এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে- বুড়িশ্চর, শিকারপুর, গড়দোয়ারা, দক্ষিণ মাদার্শা, উত্তর মাদার্শা, মেখল, পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ড, নাঙ্গলমোড়া, ছিপাতলী। হালদা নদীতে বেড়ে যাওয়া পানি তীরবর্তী কয়েকটি বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম মশিউজ্জামান বলেন, উপজেলার সাত থেকে আটটি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

রাউজান

রাউজান উপজেলার কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পশ্চিম নোয়াপাড়া, মোকামীপাড়া, সাম মাহালদারপাড়া, ছামিদর কোয়াং, কচুখাইন, দক্ষিণ নোয়াপাড়া, মইশকরম, সওদাগরপাড়া, সুজারপাড়া, পূর্ব উরকিরচর, খলিফার ঘোনা, বৈইজ্জাখালি, বাগোয়ান, পশ্চিম গুজরা, গহিরা, নোয়াজিশপুর, চিকদাইর, ডাবুয়াসহ কয়েকটি এলাকার তিন শতাধিক পরিবারের দেড় হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন বলে জানা গেছে।

বাঁশখালী

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাঁশখালী উপজেলার আট ইউনিয়নের অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় পানিবন্দি রয়েছেন এক হাজার ৭৫০ পরিবারের আট হাজারের বেশি মানুষ। এছাড়া উপজেলায় গঠন করা হয়েছে ১৫টি মেডিকেল টিম।

পটিয়া

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পটিয়া উপজেলা ও পৌরসভা মিলিয়ে ছয় হাজার ৯৪৬ পরিবারের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

বোয়ালখালী

বোয়ালখালী উপজেলা ও পৌরসভা মিলিয়ে ১০০ পরিবারের প্রায় ৭০০ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

কর্ণফুলী

কর্ণফুলী উপজেলায় ১০০ পরিবারের প্রায় ৫০০ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

এদিকে, বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) বেলা ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ডের কথা জানায় আবহাওয়া অফিস। এরমধ্যে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় রেকর্ড করা হয় ৭২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত।

কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানায়, বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত লেকের পানির উচ্চতা ছিল ১০৩ ফুট (এমএসএল)। যা গতকাল ছিল ১০১ ফুট। ২৪ ঘণ্টায় উচ্চতা বৃদ্ধি পায় দুই ফুট। তবে পানির বিপৎসীমা ১০৮ ফুট। সে হিসেবে পাঁচ ফুট কম ছিল দুপুর পর্যন্ত। ফলে এই মুহূর্তে কাপ্তাই বাঁধের পানি ছাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই বলেও জানানো হয়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের অধীন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ মজুমদার জানান, চট্টগ্রামের নয় উপজেলা ফটিকছড়ি, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, বাঁশখালী, পটিয়া, বোয়ালখালী, রাউজান, কর্ণফুলী ও হাটহাজারীর মোট ৯৩টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়েছে ৪৫ হাজার ৯১৬ পরিবারের দুই লাখ চার হাজার ৮৫০ জন মানুষ। বন্যার্তদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে খোলা হয়েছে ৮৪টি আশ্রয়কেন্দ্র। এছাড়া গঠিত ১১৬টি মেডিকেল টিমের ১১১টি চালু রয়েছে। মীরসরাই ও ফটিকছড়িতে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে ৩৫টি নৌযান।

 

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
ট্যাগ: চট্টগ্রাম
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!