বর্ষা মানেই বৃষ্টির পানিতে খাল-বিল থৈ থৈ। আর বর্ষার এ পানিতে দেশীয় মাছ ধরতে গ্রামের মানুষ ব্যবহার করে নানান ধরনের ফাঁদ। গ্রামের খালে বিলে মাছ ধরার সবচেয়ে জনপ্রিয় ফাঁদ হলো বাঁশের তৈরি চাঁই। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা কৃষির পাশাপাশি এসব চাঁই তৈরি করে হয়ে উঠেছেন স্বাবলম্বী। বর্ষা এলে এসব চাঁই কারিগরদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। দিনরাত চলে চাঁই তৈরির মহা উৎসব।
সরেজমিন উপজেলার মধ্য শাহেদল,কুড়িমারা, গলাচিপা,রহিমপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায় মাছ ধরার চাঁই তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারী ও পুরুষরা। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করছে ছেলে-মেয়েসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। এ উপজেলার প্রায় শতাধিক পরিবার চাঁই তৈরি করে বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। প্রতিটি চাঁই ৬০০-১০০০ টাকা হয়ে থাকে। আবার বড়গুলো ১৫০০ পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে।
.png)
কৃষির পাশাপাশি চাঁই তেরি করা উপজেলার শাহেদল গ্রামের হাদিস মিয়া বলেন, ২০-২৫ বছর ধরে চাঁই তৈরি করে আসছি। চাঁই গুলো আমরা কুলিয়াচর, কটিয়াদি, পুলের ঘাট, সরারচর, হাওর এলাকা সহ বিভিন্ন নিম্ন অঞ্চলের জায়গায় বিক্রি করি।
কুড়িমারা গ্রামের কেরামত আলী জানান, ছোট কাল থেকেই বাপ দাদার এ পেশা ধরে রেখেছি। চাঁই বিক্রি করে পারিবারিক সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। চাঁই বিক্রি করে দুই সন্তানকে ইতালি পাঠিয়েছি।
রামপুর বাজারে চাঁই কিনতে আসা সিরাজ মিয়া জানান, দীর্ঘ দিন ধরেই তিনি চাঁই দিয়ে মাছ ধরেন। রাতে চাঁই জমির পানির মধ্যে চাঁই স্থাপন করে রেখে আসেন৷ সকালে গিয়ে মাছ তুলে নিয়ে আসেন৷ একটি চাঁই দিয়ে দুই সিজন মাছ মারা যায় বলেও জানান তিনি।
জানা যায়, চাঁই তৈরির প্রধান কাঁচামাল বাঁশ। বিভিন্ন মাপে বাঁশের শলা তুলে সেগুলো রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। তারপর শুরু হয় চাঁই তৈরির কাজ। মুলি ও মোড়ল দুই ধরনের বাঁশ দিয়েই এসব চাঁই তৈরি করা হয়। মূলত এ শিল্পের বেশির ভাগ কারিগরই হলেন নারী। একটি মুলি বাঁশ দিয়ে সাধারণত ছোট মাছ ধরার চারটি চাঁই হয়, আর একটি মোড়ল বাঁশ দিয়ে কুচে, শিং, কই প্রভৃতি মাছ ধরার চাঁই হয় ২৫টি। মাছ ধরতে চাঁই খাল,বিল কিংবা ডুবে যাওয়া ফসলি ক্ষেতে পেতে রাখা হয়।
বর্ষাকালে দেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের বাঁশের চাঁই দিয়ে মাছ শিকার করতে দেখা যায়, বিশেষ করে হোসেনপুরে গ্রামগুলোর খাল-বিল, নদী-নালায় ফাঁদ পেতে খুব সহজেই বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ শিকার করা হয়। সারা বছরই চাঁই তৈরি করে থাকেন কারিগররা। তবে বর্ষার ঠিক আগ মুহূর্তে বিভিন্ন গ্রামে মাছ ধরার ফাঁদ চাঁই বানানোর ধুম পড়ে যায়। বিভিন্ন আকার ও আঙ্গিকে তৈরি মাছ ধরার এ ফাঁদগুলোর রয়েছে বাহারি নাম। যেমন—চাঁই, বুচনা, গড়া, চরগড়া, খুচইন ইত্যাদি। আবার চাঁইয়ের মধ্যেও রয়েছে নামের বিভেদ। যেমন—ঘুনি চাঁই, কইয়া চাঁই, বড় মাছের চাঁই, জিহ্বা চাঁই, গুটি চাঁই ইত্যাদি।
স্থানীয় এলাকাবাসীদের ধারণা,দেশীয় এ কুটির শিল্প কারিগরদের সরকারীভাবে আর্থিক সহায়তা ও ক্ষুদ্র ঋণই এগিয়ে নিতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতিকে।
এ ব্যাপারে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এহসানুল হক জানান, চাঁই বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী একটি কুটির শিল্প। এ অর্থবছরে প্রান্তিক এসব কুটির শিল্প কারিগরদের প্রণোদনা দিয়ে সাহায্য করা হবে।