যে ইটভাটা বাড়াচ্ছে কর্মসংস্থান, বাণিজ্যে আশার আলো
আগুনে পোড়ানোর কোনো ঝামেলা নেই। স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হচ্ছে একের পর এক কংক্রিট ব্লক। মিশ্রন তৈরি কিংবা প্রেসার সব কিছুই করছে মেশিন। এভাবেই নেত্রকোণায় তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব ব্লক বা ইট। পোড়া মাটির ইটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ইটের চাহিদা বাড়ছে হাওর, নদী ও পাহাড় সীমান্তঘেরা নেত্রকোণায়। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্লক তৈরির কারখানা। এতেই বাড়ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এছাড়া বাণিজ্যেও নতুন আশা দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
জেলার কেন্দুয়ায় দুটি কারখানায় প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে শতশত কংক্রিট ব্লকসহ নির্মাণ শিল্পে ব্যবহারের জন্য নানা রকম ব্লক। পোড়া মাটির ইটের থেকে সাশ্রয়ী হয় সারা ফেলেছে ক্রেতাদের মাঝেও। তাই নতুন করে নির্মাণ শিল্পে বাজার দখল করছে এই কংক্রিট ব্লক।
কেন্দুয়া উপজেলার প্রত্যন্ত আশুজিয়া গ্রামে ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করে ‘এডভান্স ইকো ব্রিকস’। শুরুতে একটি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন কংক্রিট ব্লক তৈরি করলেও এখন দুটি স্বয়ংক্রিয় মেশিনে প্রতিদিন অন্তত কয়েক হাজার ব্লক তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে স্থানীয় বেকার অন্তত ৩০ জন শ্রমিকের। যারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। এটির মাধ্যেমে তাদের জীবিকার পথ তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি চান্দুরা গ্রামেই গত বছরের শুরুতে ‘খোকন ইকো কংক্রিট ব্রক অ্যান্ড ব্রিকস’ নামে স্থাপন হয় আরো একটি কারখানা। এই কারখানায় আরো ১৫ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজে তাদের জীবিকার যোগান দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠান দুটি বর্তমানে জেলার সর্বাধিক কংক্রিট ব্লক সরবরাহকারী হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে। আশেপাশে বিভিন্ন জেলাও যাচ্ছে তাদের উৎপাদিত এসব পণ্য। বছর শেষে এই প্রতিষ্ঠান কয়েক লাখ ব্লক প্রস্তুত করছে এর বিপরীতে ব্যবসা হচ্ছে প্রায় দুই কোটি টাকার ওপরে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূলত; বালু, পাথর আর সিমেন্ট মেশিনে মিশ্রণ করে উচ্চচাপে তৈরি করা হয় এক একটি ব্লক। এরপর ২০ থেকে ৩০ দিন নিয়মিত পানি আর রোদে শুকিয়ে সম্পূর্ণরূপে তৈরি হয় এক একটি ব্লক। এর জন্য প্রয়োজন হয় না কোনো প্রকার জ্বালানি কিংবা আগুনের। এছাড়াও সাধারণ ইটের চেয়ে তাপ ও শব্দ নিরোধক, ওজনে হালকা, ভূমিকম্প সহনশীল, কার্বন নিয়ন্ত্রণসহ বেশকিছু সুবিধা রয়েছে পরিবেশবান্ধব এসব ব্লকগুলোতে।
কারখানাগুলোতে বর্তমানে ইটের পাশাপাশি ইউনি ব্লক, হলো ব্লক, সলিড ব্রিকসসহ বিভিন্ন ব্লক তৈরি হচ্ছে। এরমধ্যে ইউনি ব্লকের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। এসব ব্লক মূলত; সড়ক তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে। এরইমধ্যে জেলার বেশকিছু সড়ক নির্মাণেও এই ব্লকের ব্যবহার হয়ে। এতে যেমন সড়ক নির্মাণের খরচ কমে আসছে তেমনি সড়কের স্থায়িত্ব বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ।
এদিকে, জেলায় মোট ৪০টি ইটভাটা থাকলেও ৩৬টি অবৈধ। এসব ভাটায় কাঠসহ বিভিন্ন জিনিস পুড়ে ইট তৈরি করায় জেলার পরিবেশসহ বৈশ্বিক জলবায়ুর উপর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। তবে এসব ভাটা বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে প্রশাসন। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ১০টি ইটভাটা ধ্বংসের পাশাপাশি ৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে প্রশাসন।
শ্রমিকরা বলছেন, ইটের ভাটায় আগুনে পোড়ানো ইটের থেকে এসব কারখানায় ইট তৈরিতে পরিশ্রম একেবারেই কম। তাছাড়া আগুনে পুড়ানো ক্ষেত্রে নানা রকম ঝুঁকি থাকলেও কংক্রিট ব্লক তৈরিতে কোনো ঝুঁকি নেই। মেশিনের মাধ্যমেই মিশ্রণ তৈরিসহ প্রেশারের মাধ্যমে এক একটি ব্লক প্রস্তুত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় কৃষি কাজের পাশাপাশি বাড়তি আয় হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে।
খোকন ইকো কংক্রিট ব্লক অ্যান্ড ব্রিকসের সহকারী ম্যানেজার তাজুল রহমান বলেন, আমরা গত বছরের শুরু থেকে উৎপাদন শুরু করেছি। আমরা এখানে হলো ব্লক, সলিড ব্রিকসসহ তিনটি আইটেমের ব্লক তৈরি হয়। আধুনিক নির্মাণ কাজের জন্যই আমাদের এই ব্লক। তাছাড়া পরিবেশগত ভাবেও এই ব্লক উন্নত হওয়ায় দিনদিন এর চাহিদা বাড়ছে।
এডভান্স ইকো ব্রিকসের ম্যানেজার ওয়াহিদুর রহমান বলেন, পোড়ামাটি ইট তৈরিতে খরচ যেমন বাড়ছে তেমনি পরিবেশগত নানা বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে প্রকৃতি। পোড়ামাটির এই ইটের পরিবর্তে তাই নির্মাণ শিল্প ঝুকছে আধুনিক নির্মাণ সামগ্রীর দিকে। গতানুগতিক পোড়ামাটির ইটের পরিবর্তে বাজার ধরছে পরিবেশবান্ধব ব্লক। এই ইট তৈরিতে যেমন খরচ কম তেমনি বাড়ি নির্মাণ খরচও কম।
নেত্রকোণা পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. আবু সাঈদ বলেন, পোড়ামাটির ইটের পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক স্থাপনের জন্য আমরা ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করছি। এরইমধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান পুরোদমে পরিবেশবান্ধব ব্লক তৈরি করছে। আশা করি, বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো পোড়ামাটির পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক তৈরি করবে।