পরিবেশ অধিদফতর ও ইটভাটা ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, মাগুরা জেলায় ৪টি উপজেলায় মোট ১১০টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে বৈধ ইট ভাটা রয়েছে মাত্র ৪টি। বাকি ১০৬টিই অবৈধ। শীতের শুরু থেকে বর্ষার আগ পর্যন্ত একটি ভাটায় একটানা ৫ মাসের আগুনে ৭০-৮৫ লাখ ইট পোড়ানো হয়। যেখানে কাঠের প্রয়োজন হয় ৯০-৯৫ লাখ হাজার মণ। সেই হিসেবে এক মৌসুমেই এক কোটি ৪ লাখ ৫০ হাজার মণ কাঠ পাড়ানো হয়।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ ) আইন বলছে, ইটভাটা স্থাপনের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণ ও পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেয়ার বিধান রয়েছে। আবাসিক, সংরক্ষিত ও বাণিজ্যিক এলাকা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর ও কৃষি জমিতে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। ইটভাটা হবে এসব এলাকা থেকে ১ কিলোমিটার দূরে। ইট উৎপাদনের জন্য কৃষি জমি, পাহাড় ও টিলা থেকে মাটি কেটে কাঁচামাল ও জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারও নিষিদ্ধ। অথচ ইটভাটাগুলোর অধিকাংশই স্থাপিত হয়েছে জনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লাগোয়া ফসলি জমি ও নদীর পাড়ে। ইটভাটার চিত্র দেখলে মনে হবে জেলায় কিছুদিনের মধ্যে উজাড় হবে সব গাছ। ফলে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ ও বনজ গাছ হচ্ছে নিধন।
.png)
অন্যদিকে, অবৈধ ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিত মাটি কাটায় স্থায়ীভাবে ক্ষতি হচ্ছে নদীর নাব্য। পরিবেশের জীববৈচিত্র্যও ভারসাম্য হচ্ছে প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন।
সদরের কাশিনাথপুর গ্রামে গড়া উঠা শাপলা ব্রিকসের প্রবেশমুখে অনেকটা এলাকাজুড়ে রয়েছে কয়েক হাজার মণ কাঠ। পরিবেশ অধিদফতরের নিয়ম মেনে কাঠের পরির্বতে কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানোর ভাটার অনুমতি থাকলেও সেদিকে হাঁটছেন না কেউ।
সরেজমিন জেলা সদরের বিভিন্ন ইট ভাটা ঘুরে দেখা গেছে, সবকটি ইট ভাটায় লাগামহীন ভাবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। কয়লা পোড়ানোর কথা থাকলেও মানছেন তা কেউই।
নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক এক ভাটার মালিক বলেন, বছরের প্রায় ৮ মাস ভাটা চলে। ৪ মাস বন্ধ থাকে। বর্তমানে সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের অধিক দাম দিয়ে কাঠ কিনে পোড়াতে হচ্ছে। কয়লা দিয়ে ভাটায় ইট পোড়ানো কথা আমরা জানি কিন্তু এখন কয়লা তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। যাও পাওয়া যাচ্ছে তাও দাম আকাশচুম্বী। তাই আমরা বাধ্য হয়ে কাঠ পোড়াচ্ছি।
মাগুরা গণকমিটির আহ্বায়ক ও পরিবেশ আন্দোলনের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা এটিএম মহব্বত আলী বলেন, সদরের ৩ নম্বর কছুন্দী ইউনিয়নের আড়পাড়া, দুর্গাপুর, খর্দকছুন্দী, বাগবাড়িয়াসহ আশপাশের সব ফসলি জমিতে ধান, পাট, সরিয়া, বেগুন, মরিচ, পেঁপে, শিমসহ বিভিন্ন সবজির চাষ করা হয়ে থাকে। এখানকার কৃষকরা তাদের জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপাদন করে থাকে। এখানে যে সবজি চাষ হয়, তা থেকে জেলার অধিকাংশ সবজির চাহিদা মেটে। কিন্তু এখন দৃশ্য পাল্টে গেছে। গোটা গ্রামই ইটভাটায় পরিণত হয়েছে। এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫টির বেশি ইটভাটা। চারপাশেই ইটভাটার ছড়াছড়ি। এটা যেন ইটভাটার গ্রাম!
সম্প্রতি নতুন করে আড়পাড়া গ্রামের ফসলি ও বসত বাড়ির কাছে একের একের পর এক নির্মাণ করা হচ্ছে অবৈধ ইটভাটা। এতে করে দৈনন্দিন জীবন যাপনে মারাত্বক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে এবং এলাকার পরিবেশ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে মনে করি। এভাবে যদি ফসলি জমিতে ইটভাটা নির্মাণ করা হয়, তাহলে মানুষ চাষাবাদ করবে কোথায়?
পাতুড়িয়া গ্রামের গোলাম হোসেন বলেন, একই এলাকায় এত ইটভাটার কারণে দিন রাত গ্রামের মধ্যে দিয়ে মাটি টানা গাড়ি চলে। যে কারণে ২৪ ঘণ্টায় গ্রামটিতে ধুলায় অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। এ জন্য তারা অনেক সময় শ্বাসকষ্টসহ নানা অসুখে ভুগছেন।
আড়পাড়া গ্রামের কৃষক নির্মল, কুমারেশ, বিরাটচন্দ্র বিশ্বাস, বাসুদেব গয়ালী, সুজন সরকার, বিদ্যুৎ গয়ালী, সুকুমারসহ একাধিক গ্রামবাসী বলেন, ফসলের জমি দখল করে গড়ে উঠেছে ইটভাটা সেখানে কয়লা দিয়ে ইটপোড়ানোর কথা থাকলেও পোড়ানো হচ্ছে গাছ। যে কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা ইটভাটার ট্রাকের ভয়ে স্কুলে পর্যন্ত যেতে পারে না। ধুলাবালির জন্য আমরা ঠিক মতো ভাতও খেতে পারি না।
ইটভাটা তদারকি কমিটির সদস্য ও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ফসলি জমিতে কোনো ইন্ডাষ্ট্রি বা ইটভাটা করা যাবে না। যদি কেউ ফসলি জমিতে ইটভাটা করে সেটি হবে আইনের পরিপন্থী। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সহায়তায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাঠ পোড়ানোর দায়ে ইতিপূর্বে ভাটা মালিকদের অর্থদণ্ডসহ ইটভাটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।