অভিযুক্ত রাসেলের বিরুদ্ধে একাধিক পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকার হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দালাল রাসেলকে আটক করেছে কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানা পুলিশ। রাসেল মিয়া শহরের তাতাঁরকান্দি এলাকার কুদ্দুছ মিয়ার ছেলে।
সম্প্রতি শহরের তাতাঁরকান্দি এলাকায় জনতা তাকে আটক করে পুলিশে সোপার্দ করে। এছাড়া রাসেলের বিরুদ্ধে মানবপাচার ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছেন শহরের কমলপুর দর্শন সিনেমা হল পাড়া এলাকার এবাদুল্লাহ। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ভৈরব থানা অফিসার ইনচার্জ মো. সফিকুল ইসলাম।
.png)
ভুক্তভোগীরা জানান, রাসেল তার আত্মীয় লিবিয়া বসবাসরত ইয়াকুবের মাধ্যমে যোগসাজসে ভৈরবসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৭৫-৮০ জন লোককে ইতালি পাঠাবে বলে প্রায় ১০-১২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পরে লিবিয়া নিয়ে মাফিয়াদের সঙ্গে কন্ট্রাক করে তাদের হেফাজতে নিয়ে প্রত্যেকের জন্য মুক্তিপণে প্রায় ১০-১৫ লাখ টাকা দাবি করেন। প্রথম চুক্তিতে ১০ লাখ টাকা পরে ৬-৭ লাখ টাকা নেন। মাফিয়াদের কথা বলে তাদের কাছে আটকিয়ে মুক্তিপণের ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন রাসেল।
এদিকে, এই চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে অনেক পরিবার। কেউ বিক্রি করেছে জমি, কেউ বিক্রি করেছে বাড়ি, কেউ বিক্রি করেছে স্বর্ণালংকার, কেউ অধিক সুদের নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। সন্তানকে পাঠাতে নিজের সহায়সম্বল বিক্রি করে পথে বসেছে একাধিক পরিবার।
এ বিষয়ে ভোক্তভোগীদের আরো অভিযোগ, তাদের লোকজন লিবিয়ায় অপহরণকারীদের হাতে বন্দি হয়ে আছে। আবার কেউ কেউ লিবিয়ায় জেলে রয়েছে। অপহরণকারীরা তাদেরকে অমানসিক নির্যাতন অত্যাচার করছে মুক্তিপণের টাকা দিতে। টাকা না দিলে তাদেরকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভোক্তভোগীদের মধ্যে অনেকেই তাদের সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। এ ঘটনার জন্য আটককৃত রাসেল মিয়া দায়ী বলে তারা অভিযোগ করেন।
জানা গেছে, লিবিয়া থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধ পথে ইতালি পাঠাতে যারা রাসেল মিয়াকে টাকা দিয়েছেন তারা হলেন- শহরের কমলপুর দর্শন সিনেমা হল পাড়া এলাকার এবাদুল্লাহর ছেলে রাকিবুল হাসান। তিনি দিয়েছেন ১৪ লাখ ৫০ হাজার, জগন্নাথপুর উত্তর পাড়া এলাকার জামাল মিয়ার ছেলে বাদশা মিয়া। তিনি দিয়েছেন ১৪ লাখ টাকা, একই এলাকার আক্তার হোসেনের ছেলে জুয়েল। তিনি দিয়েছেন ১৩ লাখ টাকা, উপজেলার তুলাকান্দি গ্রামের ইকাবাল মিয়ার ছেলে আলী হোসেন। তিনি দিয়েছেন ১৭ লাখ টাকা। একই এলাকার গোলাম মোস্তফার ছেলে মোস্তাকিম। তিনি দিয়েছে ২৪ লাখ টাকা।
এভাবে সজীব ও তোফায়েল ২২ লাখ টাকা, হাছেন আলীসহ তিনজনে ৪০ লাখ টাকা, সুমন ১৪ লাখ টাকা, রোকেল ৮ লাখ টাকা, আজিজুল ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ইমন ১০ লাখ টাকা, কাঞ্চন ১২ লাখ টাকা মানিক মিয়ার ছেলে আরিফ ৮ লাখ টাকা রাসেলকে দিলেও তিনি লিবিয়া পাঠিয়ে বিপদে ফেলেছেন বলে তাদের অভিযোগ। এ ঘটনায় এ নিউজ লেখা পর্যন্ত মোট ৭৪ জনের তালিকা পাওয়া গেছে। তবে সময় যত যাচ্ছে ভোক্তভোগীদের সংখ্যাও তত বাড়ছে।
ভোক্তভোগীদের দাবি, অপহরণকারীরা অপহৃতদেরকে নির্যাতন করে নির্যাতনের ভিডিও পাঠাচ্ছে এদেশে পরিবারের কাছে। তারা নতুন করে কারো কারো প্রত্যেকের কাছে ১০-১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে। এত পরিমাণ টাকা কোনো পরিবারের দেওয়ার সাধ্য নেই বলে জানান ভোক্তভোগীরা। এমনিতেই ঘরবাড়ি, জমিজমা, স্বর্ণালংকার বা মূল্যবান জিনিসপত্র বিক্রি করে রাসেলকে টাকা দিয়েছে সন্তানকে ইতারি পাঠানো আশায়।
ভোক্তভোগী শাকিবুল হাসানের বাবা এবাদউল্লাহ বলেন, ইতালি পৌঁছানো পর্যন্ত আমার ছেলের বডি কন্ট্রাকের নামে ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেয় রাসেল। কিন্তু মাফিয়ার কথা বলে আরো ১০ লাখ টাকা দাবি করছে। আমি এমনিতেই নিঃস্ব। এত টাকা পাবো কই? আমার ছেলেকে কিভাবে ছাড়িয়ে আনবো কিছুই বুঝতেছি না। তাই থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ দিয়েছি।
ইউনুছ মিয়া বলেন, আমার ছেলে ফারুককে ইতারি পাঠাতে রাসেলকে ২৪ লাখ টাকা দিয়েছি চার মাস আগে, এখন ছেলের খোঁজ নেই। শুনেছি অপহরণকারীদের হাতে লিবিয়ায় বন্দি।
রাসেলের বাবা হানিফ মিয়া অভিযোগ, আমার ছেলেকে ইতালি পাঠাতে ৭ লাখ টাকা দিয়েছি। কিন্ত সে এখন লিবিয়ার জেলে বন্দি।
১০ সন্তানের জননী জিয়াসমিন আক্তার বলেন, আমার ৯ মেয়ে ও আরিফ একমাত্র ছেলে। আমি একটি বিড়ি ফ্যাক্টরিতে মেয়েদের নিয়ে কাজ করি। তিলতিল করে টাকা জমিয়ে ছেলেকে ইতালি পাঠাতে রাসেলকে ৮ লাখ টাকা দিয়েছি। এখন ছেলে লিবিয়া পড়ে আছে।
ভৈরব থানার ওসি মো. সফিকুল ইসলাম জানান, মানবপাচারকারী রাসেলকে জনতা আটক করেছে। খবর পেয়ে পুলিশ তার নিরাপত্তার জন্য উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। এখন ভোক্তভোগীদের মধ্যে এবাদুল্লাহ মানবপাচার আইনে মামলার করেছে। বাকিরা অভিযোগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাসেল ১০-১২ জনের কাছ থেকে বিদেশের কথা বলে টাকা নিয়েছে বলে স্বীকার করেছে।