গত ২৬ জুন বগুড়া কারাগারের কনডেম সেলের ছাদ ফুটো করে ফাঁসির চার আসামি পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে নানা তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। এরইমধ্যে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে চার কয়েদি পালানোর ঘটনায় প্রধান কারারক্ষীসহ তিনজনকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয় কারা কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া অপর দুই কারারক্ষীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন- প্রধান কারারক্ষী দুলাল হোসেন, হাবিলদার আব্দুল মতিন এবং কারারক্ষী আরিফুল ইসলাম। এছাড়া কারারক্ষী ফরিদুল ইসলাম ও কারারক্ষী হোসেনুজ্জামানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
.png)
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া জেলা কারাগারের মধ্যে টাকা বিনিময়ে মাদক কেনাবেচা ও সেবনও চলে। টাকার বিকল্প হিসেবে বেনসন সিগারেট ভর্তি প্যাকেট নেয়া হয়। পরে সেই সিগারেট ক্যান্টিনে বিক্রি করে টাকা নেয়া হয়। বগুড়া জেলা কারাগারের এক শ্রেণির সুবেদার, জামাদার, কারারক্ষী, রাইটার, ইনচার্জ, সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি, মেট’র সমন্বয়ে রয়েছে একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডকেট থাকা ও খাওয়াসহ একটু ভালো সুযোগ দিয়ে বন্দিদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় টাকা ও বেনসন সিগারেট। যেসব বন্দির টাকা আছে তারা কারাগারের মধ্যে বাড়ির মতো রাজকীয় জীবনযাপন করতে পারেন।
বগুড়া কারাগারের ভেতরে গাঁজা ও ইয়াবা সরবরাহ করা হয়। কারাগারের পশ্চিমপাশে বগুড়া পৌরসভার সামনে রাস্তা থেকে কাগজ বা পলিথিনের মধ্যে গাঁজা, ইয়াবার সঙ্গে ঢিল তুলে হাজতির নাম লেখা চিরকুটসহ তা ছুঁড়ে মারা হয় কারাগারের মধ্যে। দেখা করতে আসা বন্দিদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভালো খাবারের জন্য কারাগারের পিসির মাধ্যমে নিয়মিত টাকা পাঠান কারাগারে। আর ওই টাকা থেকে পিসি কার্ডের মাধ্যমে বন্দিদের কাছ থেকে এসব টাকা তুলে নেন তারা।
একজন হাজতির নাম যদি হয় ‘আজিজ’ কারাকর্তৃপক্ষ তার নাম লিখবে ‘আকিজ’। আদালত থেকে তার জামিন মঞ্জুর হলেও ভুল নাম আকিজ হওয়ায় আটকে দেওয়া হয় ওই হাজতিকে। কিন্তু গেটের দায়িত্বে থাকা কারারক্ষিকে ৫০০ টাকা দিলে ‘আকিজ’ আবার ‘আজিজ’ হয়ে যায়। কিন্তু কেউ টাকা দিতে না পারলে জামিন আদেশের পরেও তাকে একদিন অতিরিক্ত জেলহাজতে থাকতে হয়।
টাকা দেওয়ার ব্যাপারেও রয়েছে কঠিন শর্ত। কেউ বাইরে থেকে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে টাকা নিতে পারবেন না। তাকে কারাগারের ভেতর থেকেই টাকা সংগ্রহ করে দিতে হবে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এসব কথা জানিয়েছেন হয়রানির শিকার একাধিক হাজতি।
জামিনে বেরিয়ে আসা একাধিক হাজতি বলেন, কারাগারে প্রবেশের সময় সবার সামনে এক রকম উলঙ্গ করে তল্লাশি করা হয়, যা খুব লজ্জাজনক। কারাগারে প্রবেশ করতেই এমন অপমান অপদস্ত করা হয়। বগুড়া জেলা কারাগারে খাবারের মান খুবই নিম্নমানের বলে জানিয়েছেন একাধিক হাজতি।
তবে কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, বন্দিদের উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হয়।
এ দাবি সঠিক নয় উল্লেখ করে একাধিক হাজতি বলেন, খাবার খুব নিম্নমানের। সকালে রুটির সঙ্গে লাউয়ের পাতলা ঝোল দেওয়া হয়। রুটিও খুব পাতলা। দুপুরে লাউয়ের পাতলা ঝোল, সবজি ও ভাত আর রাতে ছোট আকৃতির এক পিস সিলভার কার্প বা তেলাপিয়া মাছ, ভাত ও মিষ্টি লাউয়ের ঝোল দেওয়া হয়।
একাধিক হাজতি আরো বলেন, কারাগারের অভ্যন্তরে দায়িত্ব পালনকারী ‘জেলবাবু’ নামে পরিচিত। এক শ্রেণির জেলবাবু সরাসরি মাদক সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। কারাগারে মাদক যায় দু’ভাবে। একটি হচ্ছে, কারাগারে কর্মরতদের মাধ্যমে। অন্যটি কারাগারের পশ্চিম পাশের দেয়ালের ওপারে পৌরসভার সামনে থেকে মাদক ছুঁড়ে ভেতরে পাঠানো হয়।
বগুড়া জেলা কারাগারে প্রতি মাসে শুধু মেডিকেল থেকে আয় হয় দেড় থেকে ২ লাখ টাকা। চিকিৎসক নিজেও এর একটি অংশ পান বলে একাধিক বন্দির অভিযোগ।
বন্দির সঙ্গে দেখা করতে আসা আজিজার রহমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, একসঙ্গে একাধিক বন্দি কথা বলে, সে কারণে আমার বন্দির সঙ্গে কথা ভালোভাবে বলা যায় না, শোনাও যায় না। অথচ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে সাক্ষাৎ কক্ষে যাই। কারাগারের খাবার মান এতটাই খারাপ অনেক বন্দি অসুস্থ হয়ে পড়ে। আবার ৫০০ টাকা দিলে গেটে বন্দিদের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেয়।
বগুড়া কারাগারের জেলার মো. ফরিদুর রহমান রুবেল বলেন, বন্দিদের সকালে রুটি ও ডাল, দুপুরে সবজি-ডাল-ভাত এবং রাতে সবজি-ডাল-ভাত-মাছ বা মাংস খেতে দেওয়া হয়।
বগুড়া কারাগারের জেল সুপার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বগুড়া কারাগারে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। টাকা ভাগবাটোয়ারা করার কথাতো প্রশ্নই আসে না।
তিনি আরো বলেন, ৭২০ জন বন্দির ধারণ ক্ষমতার বগুড়া কারাগারে বন্দি থাকছে গড়ে ২ হাজার ২০০ জন। কারাগারের প্রতিটি বন্দিকে রাখা হয় নিবির পর্যবেক্ষণে। কঠোর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে দেখানো হয় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথ।
উল্লেখ্য, বগুড়া জেলা কারাগারটি শহরের মালতীনগর এলাকার করতোয়া নদীর পাড়ে ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল। তখন হতেই বগুড়া জেলা কারাগারের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালু হয়। আধুনিক বিচার ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় খুব গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কারা ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়ে আসছে। বগুড়া জেলা কারাগারের জমির মোট জমির পরিমাণ ১৪ দশমিক ৬৬২৫ একর। সময়ের ব্যবধানে বন্দিদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ধারণ ক্ষমতার চেয়েও বেশি বন্দি থাকে।