ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

‘ভিটাটুকু বিক্রি করো, তবুও আমার জান ভিক্ষা দাও মা’

রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২০:০৭, ২৭ জুন ২০২৪
‘ভিটাটুকু বিক্রি করো, তবুও আমার জান ভিক্ষা দাও মা’
দুপুরে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ভুক্তভোগী পরিবার। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

‘মা তুমি আমাকে তাড়াতাড়ি বের করো। এরা আমাকে মেরে ফেলবে। ১৪ লাখ টাকা চায় এরা। বাড়ির ভিটাটুকু বিক্রি করে হলেও দাও মা। তুমি আমার জান ভিক্ষা দাও মা।’

এভাবেই মায়ের কাছে ভিডিও কলে ফোন দিয়ে বাঁচার আকুতি জানিয়েছেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার ৫ নম্বর ঝালুকা ইউনিয়নের সায়বাড় গ্রামের আব্দুর সাত্তারের ছেলে ওয়াসিম আলী। ছেলের এই আকুতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবার।

ওয়াসিম আলীর মা পেমেলা বিবি ছেলেকে বাঁচাতে প্রশাসনের এই দুয়ার থেকে ওই দুয়ার ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বুধবার (২৬ জুন) বেলা ১১টার দিকে রাজশাহী কোর্টের লিগ্যাল এইড অফিসে সহযোগিতার জন্য যান তিনি। এছাড়া বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনেও আবেগ তাড়িত হয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে সরকারের সহযোগিতা চায় ভুক্তভোগী পরিবার।

Advertisement

এ সময় পেমেলা বিবি বলেন, ‘আমার ছেলে দেড় বছর আগে সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় লিবিয়া গেছে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর কোনো কিছু ঠিকমতো চলছিল না। এর মধ্যে গত পাঁচ মাস আগে লিবিয়ায় অপহরণকারী আমার ছেলেকে বন্দি করে। ছেলের মুক্তিপণ হিসেবে দালাল চাচাতো ভাই ইসমাইলের পরিবারকে ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ওই ইসমাইল আগে থেকেই লিবিয়াতে থাকে। তিনি ওয়াসিম আলীকে ইতালিতে পাঠানো এবং সেখানে অনেক টাকা উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে সেখানে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিয়েছেন।’

লিবিয়ায় জিম্মি ওয়াসিমের মা পেমেলা বিবি জানান, এ ঘটনার আগে একদিন মুঠোফোনে ইসমাইল বলেছিলেন, ‘ছোট মা আমরা যদি ওয়াসিমকে ইতালি পার করে দেই, তাহলে ভালো। আপনারা গরিব মানুষ। আপনারা ভালো খাবেন, দেখে আমাদের ভালো লাগবে।’ আমি (জিম্মি ওয়াসিমের মা) ইসমাইলকে বলি, ‘বাবা আমারতো টাকা-পয়সা নাই। টাকা পয়সা লাগলে কোথা থেকে দেব? তখন ইসমাইল বলে- চাচি টাকা পয়সা অতো লাগবে না। আপনার কাছে যে টাকা আছে সেগুলোই দিয়েন। ওয়াসিমকে আমি পার করে দেব ইতালিতে। আপনারা চিন্তা করেন না।’

পেমেলা বিবি বলেন, ‘ছেলে বলেছে টাকা পাঠাও না হলে এরা আমাকে মেরে ফেলবে। এরপরে আমি লাভের উপরে টাকা (সুদে টাকা) নিই। ছেলে বারবার বলে মা আমি তোমার থেকে জান ভিক্ষা চাই। তুমি টাকা পাঠাও। ৫ মাসের বেশি হয়ে গেল, কিন্তু সেই ছেলেকে আজও আমি মুক্ত করতে পারিনি। ইসমাইলের বাবা-মায়ের হাত পা ধরেছি। কোনো কাজ হয়নি। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, ছেলেকে সরকার সুস্থভাবে আমার বুকে ফিরিয়ে দিক।’

ওয়াসিমের মামা আব্দুল জলিল বলেন, ওয়াসিম আর ইসমাইল সম্পর্কে চাচাতো ভাই। ওয়াসিমকে লিবিয়ার নিয়ে যাওয়ার শুরু থেকে ইসমাইল আছে। তার ভরসায় ওয়াসিম লিবিয়ায় যায়। সেখানে ইসমাইল ও ওয়াসিম একটা হাসপাতালে কাজ করছিল। এমন অবস্থায় ইসমাইল বারবার ওয়াসিমকে ফোন করে বলে তোমাকে লিবিয়ায় থাকতে হবে না। তোমাকে ইতালিতে পাঠাবো। সেখানে ভালো টাকা উপার্জন করতে পারবা। দীর্ঘদিন ধরে ফোন দিয়ে রাজি করায় ওয়াসিমকে। একদিন ওয়াসিমকে নিতে ইসমাইল গাড়ি পাঠায়। সেই গাড়ি যাওয়ার পরে আর যোগাযোগ ছিল না। ১৫ দিন পরে খবর আসে, ওয়াসিমকে মাফিয়ারা জিম্মি করেছে। তাদের হাত থেকে ছাড়াতে টাকা লাগবে। জায়গা জমি বিক্রি ও বন্ধকে রেখে সবমিলে ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয় ব্যাংকের মাধ্যমে।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে জিম্মি করে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে সায়বাড় গ্রামের মোস্তফার ছেলে ইসমাইলের বিরুদ্ধে। এই ইসমাইলের মাধ্যমে এলাকার ও আশেপাশের যারা গিয়েছে তারাও লিবিয়ায় গিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। সর্বশেষ ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে লিবিয়ায় জিম্মিদশা থেকে ফিরেছেন সায়বাড় গ্রামের রহেদ আলীর ছেলে ইসমাইল। তিনি গত ৫ মাস আগে দেশে ফিরেছেন। এছাড়া বাসেরের মোড় এলাকার এক ছেলে লিবিয়ায় গেছে। তার বাবা-মা মোস্তফার ছেলে ইসমাইলের বাড়ি গিয়ে কান্নাকাটি করছে।

এ বিষয়ে জানতে দুর্গাপুর থানার ওসি খাইরুল ইসলাম ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্বীকৃতি প্রামাণিকের মুঠোফোনে কল করা হলেও তারা ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 
ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!