পাবনার ঈশ্বরদীর নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সেবাপ্রত্যাশীরা এমন হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন। এ নিয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তারা।
উপজেলার মুলাডুলি এলাকার এক ভুক্তভোগী রেশমা খাতুন বলেন, ‘এক বছর আগে আমার স্বামীর সঙ্গে আমার ডিভোর্স হয়। তাই জাতীয় পরিচয়পত্রে স্বামীর নামের পরিবর্তে বাবার নাম যুক্ত করতে যান উপজেলা নির্বাচন অফিসে। অফিসে গেলে তারা কোনো গুরুত্বই দেয়নি। দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরির পরেও নাম পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে অফিস সহকারী শওকত আলী ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন উপজেলা নির্বাচন অফিসার আশরাফুল হককে ম্যানেজ করার কথা বলে।’
.png)
রেশমা খাতুন বলেন, ‘২-৪ হাজার টাকা হলে একটা কথা ছিল। কিন্তু ৫০ হাজার টাকা দাবি করে বসেন তারা। এত টাকা তিনি জোগাড় করতে পারেননি। টাকা দিতে পারেননি বলে মাসের পর মাস চলে যাচ্ছে, কোনো কাজ হচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘যারা আমার কাছে টাকা দাবি করলো তারা তো সরকারি চাকরি করেন। তাদের কি সরকার বেতন দেয় না? তারা তো সরকারের বেতন পায়; তাহলে আমাদের কাছে কেন টাকা চায়? এসব অফিসারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এদের কারণে দেশ দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হচ্ছে।’
এদিকে শুধু রেশমা খাতুন নয়, এমন হয়রানির অভিযোগ ঐ এলাকার অনেক মানুষের। তাদের অভিযোগ, টাকা না দিলে কোনো কাজ করেন না ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নতুন ভোটার হওয়া, জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল সংশোধন করাসহ সব কাজেই গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা। এমন অপরাধে সাহায্য করে ঐ অফিসের অফিস সহকারী শওকত আলী। অন্যথায় ঘুরতে হয় বছরের পর বছর।
এদিকে নির্বাচন অফিসে নতুন ভোটার আইডি কার্ড করতে আসা রাজিয়া সুলতানা নামের এক নারী বলেন, ‘আমি আমার একটা চাকরির প্রয়োজনে ভোটার আইডি কার্ড করতে এ বছরের শুরুতে নির্বাচন অফিসে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি একের পর এক টালবাহানা। প্রত্যেকটি কর্মচারী দুর্নীতিবাজ। সাধারণ একটা ছবি তুলতে আমাকে ঘুরতে হয়েছে, না হলেও একমাস। এর মাঝখানে ছবি তুলতে সেখানকার অফিসে কর্মরত কয়েকজন আমার কাছে ৫০০ টাকা দাবি করে। আমি টাকা দেইনি বলে এখন পর্যন্ত আমার এসএমএস আসেনি।’
উপজেলার মাসুদ রানা নামের একজন বলেন, ‘২০১৬ সালে নাম পরিবর্তন করতে উপজেলা নির্বাচন অফিসে কাগজপত্র জমা দেই। এখন পর্যন্ত নাম পরিবর্তন হয়নি।’
ঈশ্বরদী নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তাদের দাবি, পাবনা অফিস, রাজশাহী অফিস এবং ঢাকা অফিসে টাকা দিয়ে এসব নাম পরিবর্তন করে আনা লাগে। এ কারণে আমাদের থেকে টাকা দাবি করেন তারা। টাকা দেইনি, তাই নামও ঠিক হয়নি। এছাড়া ঐ অফিসের কর্মচারীদের মুখ খুবই খারাপ। বাজে ভাষায় কথা বলে।
শাহীন আলম নামের একজন ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমার জন্ম নিবন্ধন কার্ডের সঙ্গে ভোটার আইডি কার্ডের মিল নেই। ভোটার আইডি কার্ডে তিন বছর বেশি দেওয়া রয়েছে। এই তিন বছর ঠিক করতে প্রতিটি বছর বাবদ ১০ হাজার করে টাকা দাবি করেন ঈশ্বরদী অফিসের স্টাফরা।’
রিপন হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, আমি আমার ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন করতে গেলে শওকত আলী নামের একজন কর্মচারী আমার কাছে ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন।
এসব বিষয়ে কথা বলতে বারবার উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আশরাফুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার রায় বলেন, ‘অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। হয়তো অফিসের বাইরের কেউ দুর্নীতি করে অফিসের নামে কুৎসা রটাচ্ছে। আমরা এখনো সঠিক কোনো অভিযোগ পাইনি। সঠিক অভিযোগ পেলে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অভিযোগ অস্বীকার করেন অভিযুক্ত অফিস সহকারী শওকত আলী। তিনি বলেন, আমি কোনো প্রকারের টাকা নেই না। এগুলা সব মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন। কে টাকা নেয় বা না নেয়, সেটা আমি জানি না। এসব বলে কোনো লাভ নেই।
এদিকে ঘুষ নিয়ে যিনি অফিসারদের দেন সেই শওকতের বিষয়ে জানতে জেলা নির্বাচন অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘শওকতের হাই লবিং আছে। তাই শওকতের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করা যায় না।’
এদিকে, জেলা নির্বাচন অফিসের হয়রানি থেকে মুক্তি এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে লিখিত অভিযোগ করেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
তবে লিখিত অভিযোগ পেলেও জেলা নির্বাচন অফিসের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমানের দাবি, ঈশ্বরদী বা পাবনা অফিসের কোনো কর্মকর্তা কর্মচারী কেউ টাকা নেয় না। কেউ যে টাকা নেয় না এটা জানেন কিভাবে- এমন প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারেননি জেলা অফিসের শীর্ষ এ কর্মকর্তা।