দুগ্ধ উৎপাদন প্রধান এলাকা পাবনার ফরিদপুর উপজেলায় এখন সবচেয়ে বেশি নকল দুধের কারবার হচ্ছে। জেলার অন্যান্য স্থানেও কম-বেশি নকল দুধ তৈরি করা হয়। প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জেল-জরিমানা ও নকল দুধ তৈরির সামগ্রী উদ্ধার করেও নকল দুধ তৈরি ঠেকাতে পারছে না। আসন্ন ঈদকে ঘিরে ভেজাল দুধ ব্যবসায়ীরা আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নকল দুধ তৈরি ও সরবরাহ কাজের সঙ্গে জড়িতদের একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে। তারা নকল দুধ তৈরি করে তা সরাসরি কিংবা আসল দুধের সঙ্গে মিশিয়ে পাবনা জেলার হাট-বাজারে ও রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য জেলাগুলোতে সরবরাহ করে। ভেজাল দুধ তৈরি লাভজনক হওয়ায় এর সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা খুব দ্রুত ধনাঢ্য হয়ে উঠছেন।
.png)
এরকম বেশ কিছু ব্যবসায়ীর নামও জানা গেছে। তারা হলেন- ফরিদপুর উপজেলার ডেমড়া বাজারের ভোলা ঘোষ, আব্দুল আলীমসহ ২৫ থেকে ৩০ জন, উপজেলার আরকান্দি বাজারের রেজাউল ও জহুরুল হকসহ ১৩ জন, পারফরিদপুরের সালাম ও শফিকুল, গোপালনগরের শফি ও তার এক ভাই।
তারা এ উপজেলার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নকল দুধ তৈরি করেন। এসব নকল দুধ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্টদের মাধ্যমে সরবরাহ করেন। আবার কিছু দুধ মিল্কভিটার কিছু অসাধু কর্মচারীর মাধ্যমে ও কিছু নিবন্ধিত সমিতির মাধ্যমেও বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এসব অসাধু ব্যবসায়ীর একজন জানান, তার মাসে আয় ৫-৬ লাখ টাকা। ভ্রাম্যমাণ আদালত ২-৩ মাস পর পর ১-২ লাখ টাকা জরিমানা করলে বা মেশিন উদ্ধার করলেও তার তেমন যায় আসে না।
এদিকে উপজেলা প্রশাসন মাঝে মধ্যেই ভেজালবিরোধী অভিযান চালায়। গত ৩ মে ভ্রাম্যমাণ আদালত মৃধাপাড়া গ্রামের সরোয়ার হোসেনকে নকল দুধ তৈরির জন্য এক লাখ টাকা জরিমানা করে। একই সঙ্গে ভেজাল দুধ তৈরির মেশিন উদ্ধার করা হয়। গত ২ এপ্রিল গোপালনগর গ্রামে বাঁধের ওপর গড়ে ওঠা এক কারখানা থেকে নকল দুধ তৈরির অপরাধে শফি প্রামাণিককে দুই লাখ টাকা জরিমানা করে নকল দুধ তৈরির যন্ত্রপাতি উদ্ধার করে। এই শফি প্রামাণিককে এর আগেও চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি ভ্রাম্যমাণ আদালত নকল দুধ তৈরির অপরাধে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। একই সময়ে নকল দুধ তৈরির অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত উপজেলার ডেমড়া বাজারের আব্দুল আলীমকে দেড় লাখ টাকা এবং আরকান্দি বাজারের সাইদুল ইসলামকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে কারখানা সিলগালা করে দেয়। এভাবে প্রতি মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা আদায় ও কারখানা সিলগালা করেও নকল দুধ তৈরি ঠেকানো যাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, দুধের ল্যাকটো ও ঘনত্ব নির্ণয়ে ল্যাকটোমিটার ব্যবহার করে ভেজাল শনাক্ত করা যায় বলে নকল দুধে চিনি, লবণ, হাইড্রোজ ও সয়াবিন তেল ব্যবহার করা হয়। এতে দুধের ঘনত্ব ও ল্যাকটো বেড়ে যায়। ফলে ল্যাকটোমিটার দিয়ে তা ধরা সম্ভব হয় না। দুধ তাজা রাখতে দেওয়া হয় ফরমালিন। বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ফ্যাটের ওপর দুধের মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। এজন্য ওই চক্র সয়াবিন তেল, পামওয়েল ও দুধ বিল্ডার মিশিয়ে দুধে ফ্যাট বাড়ায়।
প্রতারণার কাজ ছেড়ে দেওয়া ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারিগর (কথিত কেমিস্ট) জানান, প্রতি মণ ছানার পানিতে ২ কেজি ননী, লবণ, খাবার সোডা, সামান্য ইউরিয়া, ১ কেজি চিনি ও দুধের কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে ভেজাল দুধ তৈরি করা হয়। এছাড়া এক মণ ফুটন্ত পানিতে ১ কেজি দুধের ননী, আধা কেজি স্কিমড মিল্ক পাউডার, বাটার অয়েল, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, এক ফোঁটা ফরমালিনসহ নানা উপকরণ মিশিয়েও ভেজাল দুধ তৈরি করা হয়।
জানা গেছে, ফরিদপুর উপজেলার পাশেই বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা কারখানা থাকায় পাবনা জেলার সবচেয়ে বেশি দুগ্ধ খামারি রয়েছেন ফরিদপুর উপজেলায়। উপজেলা সমবায় অফিসার কায়সার মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, ফরিদপুর উপজেলায় ১২৭টি নিবন্ধিত দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি রয়েছে।
এদিকে সমিতির বেশিরভাগ বাঘাবাড়ি মিল্কভিটায় দুধ সরবরাহ করে। এছাড়া বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আরো ব্যক্তিগত দুই সহস্রাধিক দুগ্ধ উৎপাদনের খামার রয়েছে। উপজেলায় প্রাণ, আকিজ, ব্র্যাক, ইগলু,আড়ং ও মিল্কভিটার প্রায় ৫৪টি চিলিং সেন্টার বা দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্র রয়েছে। উৎপাদিত দুধের প্রায় ৭০ শতাংশ এসব প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ করে থাকে। অবশিষ্ট ৩০ শতাংশের বেশির দুধ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শীতলীকরণ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিজস্ব এজেন্টদের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকেন। এসব স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগ সয়াবিন তেলের সঙ্গে কষ্টিক সোডা, চিনি, লবণ এবং আরো কিছু রাসায়নিক ও পানি মিশিয়ে দুধ তৈরি করে থাকেন। এসব নকল দুধ অল্প কিছু আসল দুধের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারজাত করে থাকেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।
এদিকে স্থানীয় জনসাধারণ জানান, ‘ঘোষ’ নামে পরিচিত দুধ সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করে তাদের প্রতিটি কারখানা ও বাড়িতে অভিযান চালিয়েই কেবলমাত্র এ ভেজাল দুধ তৈরি বন্ধ করা সম্ভব।
পাবনা জেলা দুগ্ধ খামারি অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খামারি সাইফুল ইসলাম বলেন, ফরিদপুরে নকল দুধ তৈরি বেড়েই চলেছে। এতে প্রকৃত দুগ্ধ খামারিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রশাসনের পাশাপাশি সামাজিকভাবেও এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. আকসাদ আল-মাসুর আনন জানান, বিষাক্ত দুধ পান করলে মানব দেহে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। ফরমালিন মেশানোর ফলে লিভার রোগ, কিডনি রোগ, ক্যান্সার, স্কিমড মিল্ক পাউডার খাওয়ার ফলে মানবদেহে হাড়ের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে শরীরের পেছনের অংশে ব্যথা, চর্মরোগ, হজমে সমস্যা, পেটের পীড়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিরিন সুলতানা বলেন, দুধে ভেজাল মেশানো দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর পাবনার সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসার রনি বলেন, নকল দুধ তৈরি ও বাজারাজাত বন্ধে অভিযান চালানো হবে।